বড়োদের দেখিয়া মাঝারিরাও কি উত্সাহিত হইবে না

প্রধানমন্ত্রী বরাবরই বলিয়া আসিতেছেন যে, সংবিধানসম্মতভাবেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। সর্বশেষ গত সোমবার সচিবদের সহিত অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি তাহার অবস্থান আরও স্পষ্ট করিয়াছেন। কিন্তু তাহাতেও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন লইয়া দীর্ঘদিন যাবত্ চলিয়া আসা বিতর্কের অবসান হয় নাই। একাধিক সংবিধানবিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ আইনজ্ঞ ইত্তেফাককে বলিয়াছেন যে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সংবিধানসম্মত, তবে বাস্তবধর্মী নহে। সংবিধান রচনার সহিত সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট একজন আইনজ্ঞ মনে করেন যে শুধু সংবিধানের দোহাই দিয়া কিছু করা হইলে তাহাতে দেশে শান্তি আসিবে না। গত মঙ্গলবার ১৮ দলীয় জোটের মহাসচিব পর্যায়ের এক বৈঠক শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্টভাবে জানাইয়া দিয়াছেন যে, বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাইবে না। মহাজোটের অন্যতম শরিক জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদই বা পিছাইয়া থাকিবেন কেন! রংপুরে দলীয় এক সভায় তিনি বলিয়াছেন যে, বিএনপি নির্বাচনে না গেলে জাপাও যাইবে না। ইতঃপূর্বে তিনি বলিয়াছিলেন যে জাপা আর মহাজোটে নাই। কোনো পাতানো নির্বাচনে তিনি অংশ নেবেন না। অন্যদিকে আসন ভাগাভাগি লইয়া দুই জোটের সাথে দরকষাকষিও চালাইয়া যাইতেছেন। সেই সাথে একেক সময়ে একেক ধরনের কথা বলিয়া যাইতেছেন স্বভাবসুলভভাবে। রাজনীতির নামে কী ধরনের কাণ্ডকারখানা চলিতেছে— তাহা অশীতিপর বৃদ্ধ সাবেক এই স্বৈরশাসককে দেখিয়া অনেকটাই অনুমান করা যায়। এই যেইখানে রাজনীতির মান ও বাস্তবতা সেইখানে নির্বাচন যেইভাবে বা যাহার অধীনেই অনুষ্ঠিত হউক না কেন— দেশে যে সহসা শান্তি আসিবে না এবং রাজনৈতিক এই অস্থিতিশীলতা যে আরও অনেকদিন অব্যাহত থাকিবে তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই বলিলেই চলে। আর ইহার প্রভাব যে আমাদের ভৌগলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকিবে না তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রসঙ্গত বর্তমান বিশ্ববাস্তবতার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যাইতে পারে। লক্ষণীয় যে আটলান্টিক ও প্যাসিফিকের মতো দুইটি মহাসমুদ্র পরিবেষ্টিত বিশ্বের একনম্বর পরাশক্তি আমেরিকার নিরাপত্তা প্রাকৃতিকভাবেই সুরক্ষিত। তাহা সত্ত্বেও নিজেদের নিরাপত্তা লইয়া দেশটির শীর্ষব্যক্তিদের উদ্বেগের অন্ত নাই। এই মুহূর্তে তাহারা সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া ও ইরান লইয়া উদ্বিগ্ন। কিছুদিন আগেও তাহাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার অবস্থান। আর ইসরাইলের নিরাপত্তা লইয়া তাহাদের উদ্বেগ তো দীর্ঘদিনের। অপর পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ধসিয়া পড়িয়াছে— তাহাতে কী! রাশিয়ার উদ্বেগও কোনো অংশে কম নহে। সেই দেশটিও তাহার দোরগোড়ায় কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা সহ্য করিতে রাজি নহে। বাস্তবতা হইল, পরাশক্তি, মাঝারি শক্তি নির্বিশেষে সকলেই নিজ নিজ নিরাপত্তা লইয়া উদ্বিগ্ন। যাহার শক্তি যতো বেশি, তাহার নিরাপত্তা বলয়ও ততো বিস্তৃত। একইভাবে উদ্বেগের মাত্রাও অধিক। আমেরিকা এখন সিরিয়া আক্রমণের প্রস্তুতি লইয়া ব্যস্ত। সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করিলে তাহা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকেই বিশৃঙ্খল করিয়া তুলিতে পারে— বিশেষজ্ঞদের এই সতর্কবার্তা এবং জনমতের প্রবল চাপ সত্ত্বেও আমেরিকা হস্তক্ষেপের পথেই হাঁটিতেছে। যুক্তি একটাই— নিজেদের নিরাপত্তা। এমতাবস্থায়, পরাশক্তিগুলি নিজেদের নিরাপত্তার অজুহাতে ভিন্ন মহাদেশে আসিয়া একের পর এক যেই অশুভ দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়া চলিয়াছে তাহাতে মাঝারি শক্তি বা উদীয়মান পরাশক্তিগুলিও যে উত্সাহিত হইবে না তাহার নিশ্চয়তা কোথায়? অতএব, সাধু সাবধান।