নির্বাচন হবে? না হলেই বা কী হবে?

সন্দেহ, সংশয় আর অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলছে দেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যত্। দেশে কি হবে বা কী হতে যাচ্ছে— এ ব্যাপারে বর্তমানে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না। ক্ষমতাসীনরা জোর গলায় বলছেন, যথাসময়ে নির্বাচন হবে, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে, সে নির্বাচনে বিএনপি ঠিকই অংশ নেবে। কোনো কোনো নেতা অবশ্য বলছেন, শেখ হাসিনার অধীনেই আগামী নির্বাচন হবে। সে নির্বাচনে কেউ অংশগ্রহণ না করলেও নির্বাচন হবে। পুরানো ফর্মুলার তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর আসবে না। এদিকে বিএনপির নেতারাও অবিরাম বলে চলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থায় বা বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তারা সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে অচিরেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন বলে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে চলেছেন। প্রধান দুই দলের পরস্পরবিরোধী এই অবস্থানের কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা ক্রমশই ফিকে হয়ে আসছে। নির্বাচন নিয়ে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও কিন্তু দুই দল ঠিকই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে কী করবে, আর কী করবেন না। আওয়ামী লীগের নেতারাও ভোট চাওয়া শুরু করেছেন। আশাবাদীরা অবশ্য বলছেন, আমাদের দেশের রাজনীতিতে এই ঝগড়া নিয়মিত ব্যাপার। রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধ জিইয়ে রাখলেও এক সময় তা মিটিয়েও ফেলে। ব্যতিক্রম শুধু ওয়ান ইলেভেন। ওয়ান ইলেভেন অভিজ্ঞতাটা বাদ দিলে অবশ্য এমন ঝগড়াঝাটির মধ্যে দিয়েই আমাদের দেশের ‘খোঁড়া গণতন্ত্র’ একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে। আগামী দিনগুলোতে কী হয়—তা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ থাকলেও অনেকে আবারও ওয়ান ইলেভেনের তিক্ত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। তাদের ধারণা—রাজনৈতিক দলের ‘ন্যাড়ারা’ এতো শিগগিরই আবার ‘বেলতলায়’ যেতে চাইবেন না। মুখে যতো কথাই বলুক, শেষ পর্যন্ত সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। নেতানেত্রীরা ‘ঠ্যাঙানি’ থেকে বাঁচতে ঠিকই একটা আপস-মীমাংসার পথ খুঁজে বের করবেন। আমরাও তেমনটাই কামনা করি। নেতানেত্রীদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হোক, সব ঝগড়া-বিবাদের অবসান হোক, দায়িত্বশীল নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হোক—তা কে না চায়? কিন্তু সমস্যা হলো, চাইলেও আমরা সব সময় সব কিছু পাই না। আর আমাদের সামষ্টিক যন্ত্রণাটা সেখানেই! সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, বর্তমান সংসদ বহাল রেখেই দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ক্ষমতাসীন দল বলছে, উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাতিল হয়ে গেছে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা। আগামী নির্বাচনে তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২৭ অক্টোবর থেকে তিন মাস সংসদ বহাল থাকবে। এ সময় কোনো অধিবেশন বসবে না। ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মন্ত্রিসভা থাকবে। তবে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে না। এই সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। উল্লেখ্য, সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। সে অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। প্রধানমন্ত্রীর কথার পর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আবারও সংশয় দেখা দিয়েছে। নির্বাচন হলেও প্রধান বিরোধী দল এ নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা না তা নিয়ে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। প্রধান বিরোধী দল ছাড়া কোনো নির্বাচন দেশ ও বিদেশের মাটিতে গ্রহণযোগ্য হবে না। দেখা দেবে সংকট। এ ক্ষেত্রে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে। আর এ জন্য সবার আগে দরকার সংকটের অস্তিত্ব স্বীকার করা। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এ কাজটি করতে চান না। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরা সব সময় এগিয়ে থাকেন। বিরোধী পক্ষের নৈরাজ্যপ্রবণ নীতিও এ জন্য কম দায়ী নয়। একটি গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচন হবে এটাই স্বাভাবিক। যে দলকে জনগণ সমর্থন করবে তারা দেশ পরিচালনা করবে। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতিটা কলুষিত। যখন যে ক্ষমতায় আসে সে সরকারই ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। একারণেই সংকটের সৃষ্টি হয়। আমরা এখনো নিজের পরাজয়টা মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। ক্ষমতায় যাওয়া মানে দেশ আমার কথায় চলবে, দেশের সব সম্পদ লুটে খাওয়ার সার্টিফিকেট পেয়ে গেছি। এমন মানসিকতার কারণেই ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। অন্যদিকে যারা বিরোধীদলে থাকেন তারাও ক্ষমতার ওই স্বাদ গ্রহণের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকেন। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া মানেই ক্ষমতা। আর ক্ষমতা মানেই সম্পদ, এই মানসিকতা থেকে বের হতে না পারলে এ ধরনের সংঘাত চলতেই থাকবে। বাংলাদেশের পশ্চিমা দেশের মতো ভাল গণতন্ত্রের চর্চা না থাকলেও অন্তত ভোটের চর্চা চলছে অনেক বছর ধরেই। ১৯৩৫ সালে গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্টের পর থেকেই এদেশের মানুষ ভোটের চর্চা করে আসছে। সুতরাং ভোটের সুযোগ না দিয়ে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করলে তা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। তার চেয়ে বরং নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান দিলে আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের আগ্রহ আবার ফেরার সম্ভাবনা আছে। অহেতুক রক্তক্ষয়, লোকক্ষয়, উদ্বেগ, উত্তেজনা সৃষ্টি না করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের দিকে আসার জন্য সরকার ও বিরোধী দল উভয়পক্ষকেই উদ্যোগী হতে হবে। না হলে কালাচাঁদের দশায় পড়তে হতে পারে। কালাচাঁদ পরীক্ষায় কেবল ডাব্বা মারতো। সে উপরের ক্লাসে উঠতেও পারে না, আবার নিচের ক্লাসে নামারও জায়গা ছিল না। শ্রেণি শিক্ষক তাকে তিরস্কার করে বলতেন, ওরে তোর আর কী হবে! ভালো ছেলে হতে হলে তেল পোড়াতে হয়, খাটতে হয়, কষ্ট সহ্য করতে হয়। কালাচাঁদ একদিন বাড়ি এসেই দুই সের তেল কিনে আনে। ওই তেলে কাপড় ভিজিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারপর ঘরের চালে দড়ি বেঁধে তাতে প্রাণপণে দুলতে থাকে। সর্বশেষে দড়ি ছিঁড়ে আগুনের উপর খানিকটা দগ্ধ হয়ে অর্ধভগ্ন শরীরে নিষ্কৃতি পায়। যে কয় সপ্তাহ শয্যাগত হয়ে থাকতে হয়েছিল, তার মধ্যে কালাচাঁদ অনেক ভেবে-চিন্তে ঠিক করে যে শিক্ষক সাহেব ভুল বলেছেন। আসলে সবাই বুদ্ধি খাটিয়ে, ধৈর্য ধরে, পরিশ্রম করে সাফল্য অর্জন করতে পারে না! বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো, সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে বিবদমান পক্ষগুলো কী নির্বাচনের দিকে এগুবে? নাকি বৈরিতা চালিয়ে যাবে? আর নির্বাচন যদি না হয় তাহলেই বা কী হবে? নির্বাচন হলে বড়জোর ক্ষমতার পালাবদল হবে। আর নির্বাচন যদি না হয়, তাহলে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোকেই নয়, দেশবাসীকেও কালাচাঁদের দশায় পড়তে হতে পারে। আবারও অরাজনৈতিক শক্তিই দেশের নিয়ন্তা হয়ে দাঁড়াবে। রাজনৈতিক নেতাদের কপালে জুটবে প্যাঁদানি আর জেল। গণতন্ত্রের নামে খেয়োখেয়ি নাকি ডাণ্ডা, ভবিষ্যতে দেশে কী হবে—এটা নির্ভর করছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইতিবাচক আচরণ ও সিদ্ধান্তের উপর।  লেখক : কলামিস্ট