সিরিয়ায় সম্ভাব্য হামলা এবং অতঃপর

সবার ধারণা ছিল ইরাকের পর হবে ইরানের পালা। কিন্তু হিসেব নিকেশ কষে ইরান হামলা ফলপ্রসূ হবে না বলেই ধরে নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। তাই বছরের পর বছর হুমকি ধমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানকে কাবু করার পদক্ষেপ নিয়েছে মার্কিন নেতারা। ইরান আক্রমণ এবং আরেকটি বিভীষিকাময় যুদ্ধের উত্কণ্ঠা শেষ হতে না হতেই পালা এসে গেল সিরিয়ার। সিরিয়ার হাতে রাসায়নিক অস্ত্র রয়েছে,আর দেশটির সরকার সেই ভয়ংকর অস্ত্র প্রয়োগ করেছে বিদ্রোহী নাগরিকদের উপর। এই অজু হাতে সিরিয়ার শাসক গোষ্ঠীকে শায়েস্তা করতে উদ্যত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাথে যোগ দিয়েছে পাশ্চাত্য ও মুসলিম দুনিয়ার কয়েকটি দেশ। কিন্তু বাদ সেধেছে রাশিয়া, চীন ও ইরান। রাশিয়ার সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো, সিরিয়ার সরকার যখন বিদ্রোহ দমনে সক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে এবং বিদ্রোহীরা প্রায় নাস্তানাবুদ হতে চলেছে ঠিক এমন সময় সরকারি সেনারা নিজ দেশের মাটিতে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে যাবে কেন? যুক্তির মানদণ্ডে এই অভিযোগ টেকে না। মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনা প্রবাহের দিকে যারা দৃষ্টি রাখেন তাদের অনেকেই মনে করেন,মার্কিন আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুতের উদ্দেশ্যে এই জঘন্য কাজটি বিদ্রোহীরাও করে থাকতে পারে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগে ঘোষণা করেছিলেন, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারকে যুক্তরাষ্ট্র রেডলাইন হিসেবে গণ্য করবে। অবশ্য ইরানের একজন বিশ্লেষক এর পেছনে ইসরাইল ও একটি প্রভাবশালী আরব দেশের গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে বলে দাবি করেছেন। সিরিয়ায় হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা তোড়জোড় শুরু করে আবার হঠাত্ করেই ধীরে চলানীতি কেন গ্রহণ করলো তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে আফগানিস্তান বা ইরাকের সাথে সিরিয়ার বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। ইরাকে বা আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসন কি ভয়াবহ পরিস্থিতি বয়ে এনেছে তা এখন দৃশ্যমান। এ ক্ষেত্রে আগ্রাসী শক্তির চেয়ে আগ্রাসনের শিকার দেশ দুটি অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু সিরিয়া আক্রান্ত হলে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে আগ্রাসী শক্তিই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অনুমান। যুদ্ধবাজ পশ্চিমা নেতারা সিরিয়া হামলার সম্ভাব্য পরিণতির বিষয়ে সম্পূর্ণ পরিজ্ঞাত। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই সিরিয়ার উপর হামলা করে তাহলে পাশ্চাত্যকে নির্ঘাত তিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য তৈরি থাকতে হবে। সিরিয়া আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে হামাস ও হিজবুল্লাহর মত মিলিশিয়া সংগঠনগুলো যুদ্ধকে তাদের লক্ষ্য পূরণের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে। ফলে যুদ্ধের পরিধি লেবানন ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়বে ইসরাইলের কেন্দ্রমূলে। যুদ্ধ শুরু হতে না হতেই এর লক্ষণও পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে আতঙ্কিত ইসরাইলের জনগণ প্রতিদিন গ্যাস মাস্ক সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই পাড়ি জমাচ্ছেন পশ্চিমা দেশগুলোতে। ইসরাইলী নাগরিকদের বড় অংশই অভিবাসী। প্রায় ৭০ বছর আগে পাশ্চাত্যের দেশগুলো থেকে ইহুদী ধর্মাবলম্বীদেরকে ফিলিস্তিনে নিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইহুদীদেরকে নিয়ে এসে ইসরাইলে প্রতিষ্ঠিত করার প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে। কাজেই যুদ্ধের লেলিহান শিখা গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে অভিবাসী ইহুদীরা তল্পি-তল্পা নিয়ে পাড়ি জমাবে আদিবাসে। এতে পশ্চিমা দেশগুলোতে দেখা দেবে সামাজিক সঙ্কটসহ নানা সমস্যা । আর এর পরিণতি যে কি হতে পারে সে সম্পর্কে পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা ভালোভাবেই অবহিত রয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পাশ্চাত্যে সংখ্যালঘু ইহুদীদের সাথে সংখ্যাগুরু খ্রিষ্টানদের সামপ্রদায়িক আচরণ এবং এ নিয়ে সামাজিক অরাজকতার ইতিহাস ইউরোপের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। সিরিয়া আক্রমণ বিশ্বের বৃহত্ শক্তিগুলোকে একেবারে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করাবে। ইরাক ও লিবিয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়া ও চীন অপেক্ষাকৃত নমনীয় ভূমিকা পালন করলেও সিরিয়ার ক্ষেত্রে এই দুই বৃহত্ শক্তির মনোভাব ভিন্ন। মস্কো কিছুতেই চাইবে না পশ্চিমা শিবিরের হাতে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র ধরাশায়ী হোক। রাশিয়া ও চীনের সামপ্রতিক অবস্থান থেকে পাশ্চাত্য এরই মধ্যে বিশেষ বার্তা পেয়ে গেছে। এছাড়া শুরু থেকেই সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সরকার বিরোধী শিবিরে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আলকায়দা এবং চরমপন্থি সালাফি গোষ্ঠী। আসাদ পরবর্তী সিরিয়ায় উগ্র এই গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমনিতেই উদ্বিগ্ন। সিরিয়া আক্রমণের ফলে ব্যাপক মাত্রায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে এই গোষ্ঠীগুলো পরিস্থিতিকে তাদের অনুকূলে কাজে লাগাবার চেষ্টা করবে। এমন কি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই উগ্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার শিকার হবে। ফলে এ ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সৃষ্ট সংকটও ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হবে, সিরিয়া আক্রমণকে অজুহাত করে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির যৌক্তিকতা তুলে ধরার সুযোগ পাবে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিবাদের ক্ষেত্রে বরাবরই রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা হচ্ছে ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মত। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে একতরফা ভাবে সিরিয়া আক্রমণ করা হলে রাশিয়া ও চীন ইরানের পরমাণু কর্মসূচির পক্ষে জোরালো অবস্থান নেবে। পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ছয় বিশ্ব শক্তির সাথে ইরানের বৈঠকে রাশিয়া ও চীন নিরপেক্ষ ভূমিকা পরিহার করে ইরানের পক্ষে অবস্থান নিলে তা হবে পাশ্চাত্যের জন্য দারুণ অস্বস্তিকর। ফলে প্রেসিডেন্ট ওবামা আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় মার্কিন কংগ্রেসের অধিবেশনে সিরিয়া আক্রমণের অনুমতি পাবেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে, আর কংগ্রেসের অনুমতি পেলেও শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ওবামা সিরিয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত থেকে কৌশলে সরে আসার চেষ্টা করবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। লেখক : বিশ্লেষক, রেডিও তেহরানের প্রাক্তন পরিচালক