প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ -এর আলোকে দেশে প্রথমবারের মত শিক্ষা আইন ২০১৩-এর খসড়া প্রণয়ন করা হইয়াছে। ইহার মাধ্যমে শিক্ষা খাতে বিরাজমান বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের অবসান হইতে পারে বলিয়া অনেকে মনে করেন। এই সেবা খাতে যেইভাবে বাণিজ্যিক মনোভাবের বিস্তার ঘটিয়াছে তাহাতে জনসাধারণ উদ্বিগ্ন। ফলে অভিভাবক সমাজ প্রস্তাবিত আইনকে ইতিবাচক হিসাবেই দেখিতেছেন। যদিও তাহারা মনে করেন যে, আইনের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেক নীতি ইতোপূর্বে ঘোষণা করিয়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাহা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করিতে পারে নাই। তাহা সত্ত্বেও বলা যায়, নাই মামার চাইতে কানা মামা ভাল। একবার এই সংক্রান্ত আইন-কানুন প্রচলন করা হইলে আশা করা যায় ধীরে ধীরে হইলেও অনেক সমস্যার জট খুলিয়া যাইতে থাকিবে। সুতরাং এই ধরনের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ না জানাইয়া উপায় নাই। মোট ২৫ পৃষ্ঠার এই প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে রহিয়াছে ৬৫টি ধারা। সকল ধারার ব্যাপারে আপত্তি না থাকিলেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করিতে শুরু করিয়াছেন শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধিগণ। সরকারি ও বিরোধী দল সমর্থক শিক্ষক সংগঠনগুলি যেইভাবে এই আইনের বিরুদ্ধে একাট্টা হইয়াছেন তাহাতে কতিপয় ধারা বাতিল বা সংশোধন না করা পর্যন্ত আইনটি চূড়ান্ত করা যাইবে কিনা তাহা সন্দেহ। তাহারা বিশেষত শিক্ষকদের শাস্তির বিধান, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি সরকার কর্তৃক নির্ধারণ ইত্যাদির ব্যাপারে জোর আপত্তি জানাইতেছেন। প্রথমত খসড়া আইনটির ৮(৫) উপধারা অনুযায়ী শ্রেণীকক্ষে বা বিদ্যালয়ে অবস্থানকালীন শিক্ষার্থীদের প্রহার বা মানসিক নির্যাতন বন্ধের জন্য জেল-জরিমানার বিধান রাখা হইয়াছে। এই ব্যাপারে এনজিওগুলি অধিক মাত্রায় সরব এবং অভিভাবকদের মধ্যে রহিয়াছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেক অভিভাবক ছেলে-মেয়েদের মানুষ করিবার স্বার্থে শিক্ষক কর্তৃক প্রয়োজনে শাস্তিদানের পক্ষপাতী। তাহার অর্থ এই নয় যে, বেদম প্রহারে শিক্ষার্থীর জীবন বিপন্ন করিয়া তোলা হইবে। অন্যদিকে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালু এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দান না করিয়া একতরফাভাবে বেতন কর্তন ও সামারি ট্রায়ালে তাহাদের শাস্তির বিধান মানিয়া নেওয়া যায় না। ইহা শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সংক্রান্ত ১৯৬৬ ও ১৯৯৭ সালের ইউনেস্কো-আইএলও সুপরিশমালার পরিপন্থী বিধায় তাহাতে আমাদেরও আপত্তি রহিয়াছে। দ্বিতীয়ত প্রস্তাবিত আইনের ২৩(৩) উপধারা অনুযায়ী ইংরেজি মাধ্যমসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন ও অন্যান্য ফি সরকার বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমমোদন সাপেক্ষে নির্ধারণ করিতে হইবে। ইহার অন্যথায় অর্থ ও কারাদণ্ডের বিধান আছে। ইহাতে আপত্তি জানাইবার কোন কারণ নাই। বর্তমান বিশৃঙ্খলা দূর করিতে এই ব্যাপারে সুচিন্তিত ও যৌক্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। তৃতীয়ত আইনে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানো হইলে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাতিলের বিধান রাখা হইয়াছে। শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ স্বতন্ত্র বেতন-স্কেল দেওয়ার পরই ইহা প্রযোজ্য হইতে পারে। আমাদের মনে রাখা দরকার, একশ্রেণীর বিবেকহীন শিক্ষকদের কর্মকাণ্ডের দরুন গোটা শিক্ষক সমাজের ভাবমূর্তি নষ্ট হইতেছে। যাহারা ক্লাসে পাঠদানে ফাঁকি দেন, মার্কস কম দেওয়াসহ নানা চতুরতায় প্রাইভেট পড়াইতে বাধ্য করেন শিক্ষার্থীদের, তাহাদের প্রতিরোধ করা অন্য শিক্ষকদেরও পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এতদবিষয়ে শুধু বেসরকারি নহে, সরকারি শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও সমান ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান থাকা বাঞ্ছনীয়। যাহা হউক, প্রস্তাবিত আইনে শিক্ষা ও শিক্ষকের মানোন্নয়নের ব্যাপারেও তাগিদ দেওয়া হইয়াছে। অনেক সময় দেখা যাইতেছে, অনিয়মকারী শিক্ষকদের বিত্ত-বৈভব দেখিয়া বিভিন্ন ব্যক্তি স্বতন্ত্র কোচিং ব্যবসা খুলিয়া বসিতেছেন। অথচ শিক্ষাদানে তাহাদের কোন যোগ্যতা ও সদিচ্ছাই নাই। তাহাদের কারণেও শিক্ষকতার পেশাদারিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হইতেছে। অতএব, আইনে নিবন্ধন ছাড়া কাহারও এই পেশায় কোনভাবে সম্পৃক্ততার সুযোগ দেওয়া উচিত হইবে না।