বাংলাদেশি নাবিকের সনদের মান

সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিকদের জন্য বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও সনদের মান লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা (আইএমও) সমপ্রতি জানাইয়াছে, বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের প্রক্রিয়ায় ‘পদ্ধতিগত মারাত্মক ত্রুটি’ রহিয়াছে। তাহার ফলস্বরূপ ২০০৯ সাল হইতে বাংলাদেশে যেইসব প্রশিক্ষণ পরিচালনা ও সনদ দেওয়া হইয়াছে আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী তাহা অগ্রহণযোগ্য হইতে পারে। নাবিকদের জন্য মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ, যথাযথ সনদ প্রদান প্রভৃতি বিষয়ে আইএমওর আন্তর্জাতিক কনভেনশন (এসটিসিডব্লিউ) রহিয়াছে। কনভেনশন অনুযায়ী নাবিকদের প্রশিক্ষণ পরিচালনা ও সনদ দেওয়া হইতেছে কিনা, তাহা যাচাই করিয়া প্রতি পাঁচ বত্সর অন্তর আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার কাছে একটি স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন পাঠাইতে হয়। সেই কনভেনশন অনুযায়ী সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর চলতি বত্সর একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন পাঠায়, যাহার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের এই চিত্র প্রকাশ পাইয়াছে। অভিযোগ উঠিয়াছে আমাদের নাবিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলির বিভিন্ন দিক লইয়া। প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও সনদ প্রদানের পদ্ধতিতে ধারাবাহিক ত্রুটির পাশাপাশি বাংলাদেশের গাফিলতি এই পর্যায়েও যে, অপ্রাসঙ্গিকভাবে ২০০৯ সালের প্রতিবেদন পাঠানো হইয়াছে ২০১৩ সালে। আইএমও’র এইরূপ সতর্কবার্তা লঘু করিয়া দেখিবার অবকাশ নাই। পত্রিকান্তরে জানা গিয়াছে, মূলত মেরিন একাডেমির বেশ কিছু অনিয়মের কারণে এই সকল অভিযোগ উঠিয়াছে। যথাযথভাবে শর্ত অনুসরণে গাফিলতি থাকায় ইতোমধ্যে দুইটি বেসরকারি নাবিক ইনস্টিটিউটের নিবন্ধন বাতিল করাও হইয়াছে। কিন্তু এমন পদক্ষেপই শেষ সমাধান নহে। আইএমও’র এই পত্র বাংলাদেশের জন্য স্পর্শকাতর সতর্কবার্তা এই কারণে যে, আইএমও যদি সতর্কবার্তা মর্মে কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহা হইলে এই সংক্রান্ত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সাদা তালিকা’ হইতে বাদ পড়িবে বাংলাদেশ। তাহা ঘটিলে বাংলাদেশি নাবিকদের জন্য সংকুচিত হইয়া পড়িবে বিদেশি জাহাজে চাকরির বাজার। আবার দেশি নাবিক নিয়োগের কারণে বিদেশের বন্দরে সমস্যায় পড়িবে বাংলাদেশি জাহাজ। অর্থাত্ সব মিলিয়া বাংলাদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাবিকের পেশাগত জীবন একঅর্থে অকূল পাথারে নিমজ্জিত হইবে। তাহাদের সনদ হইবে কেজি দরে কাগজ বিক্রয় করিবার তামাদিপত্র মাত্র। বাংলাদেশের জন্য তাহা লজ্জারও বটে। আমাদের অনিয়ম, দুর্নীতি, অসততা ও সীমাহীন অব্যবস্থাপনার চিত্রই প্রকট হইয়াছে এমন সতর্কবার্তায়। আশার কথা হইল, বাংলাদেশকে আরও একটিবার সুযোগ দিতে চায় আইএমও। সুতরাং তাহা যে কোনো অর্থে কাজে লাগাইতে হইবে। কর্তৃপক্ষ আশার কথা শুনাইয়াছে যে, নাবিক প্রশিক্ষণসহ নানা বিষয়ে অনিয়মের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হইতেছে, সুতরাং বাংলাদেশি নাবিকদের কোনো সমস্যা হইবে না। কিন্তু তাহার পরও আমরা কি নিশ্চিত বলিতে পারি সব যথাযথভাবে পরিচালিত হইবে এইবার? কিংবা আমরা যদি এইবার আন্তর্জাতিক মান বহাল রাখিবার মর্যাদা টিকাইয়া রাখিতে পারি কোনোভাবে, তাহা কি ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত রাখিতে পারিব? এইজন্য যে কঠোর নিয়মকানুন অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রহিয়াছে, তাহা প্রতিপালনের বোধোদয় আসিবে কি? নাকি ইহার ব্যত্যয়ে আমাদের স্বভাবদোষগত কারণে পাঁচ বত্সর পর পুনরায় সতর্কবার্তা আসিবে? কিংবা আমরা কি পতিত হইব সাদা তালিকা হইতে? এই সকল বিষয়ে সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে, যাহাতে পশ্চাত্পদতার ভূত পেছন হইতে আমাদের টানিয়া ধরিতে না পারে।