[ স ম কা লী ন ]

গার্মেন্টসে ন্যূনতম মজুরি কেন ৮ হাজার টাকা চাই

‘শ্রেণী সংগ্রামের দিন এখন শেষ হয়ে গেছে’- এই তত্ত্ব প্রচারে আমাদের দেশেও একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও কথিত ‘সুশীল সমাজের’ একটি অংশ সদা গলদঘর্ম। তাদের এই ‘শ্রেণী সংগ্রামের অবসান’ বিষয়ক তত্ত্ব যে মোটেও সঠিক নয় তা দেশের তৈরি পোশাক শিল্প খাতের প্রতি দৃষ্টি দিলেই স্পষ্ট না হয়ে পারে না। এই খাতকে প্রচলিত ভাষায় গার্মেন্টস খাত বলা হয়। গার্মেন্টস শিল্পে শ্রেণী সংগ্রাম চলছে। সম্প্রতি তা আরো তীব্র হয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে একসময় পাট শিল্পের যে একচ্ছত্র অগ্রণী অবস্থান ছিল, এখন তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান গার্মেন্টস শিল্পের। গার্মেন্টস খাত বর্তমানে দেশের সবচেয়ে ব্যবসা-সফল খাত। দেশের রপ্তানি আয়ের তিন-চতুর্থাংশ আসে এই খাত থেকে (জনশক্তি রপ্তানির হিসাব বাদ দিয়ে)। এই খাতে ৪/৫ হাজার কারখানার ৩ হাজারের বেশি মালিক রয়েছে। কারখানাগুলোতে কাজ করে ৩০ লক্ষাধিক শ্রমিক। তাদের মধ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো নারী শ্রমিক। চলচ্চিত্রকার তানভির মোকাম্মেলের ভাষায় গার্মেন্টস-এর এই ছোট-ছোট নারী শ্রমিকরাই হলো ‘বস্ত্রবালিকা’। এই শিল্পে বয়স্কা নারী শ্রমিক সামান্যই চোখে পড়ে, সবাই বালিকা। রাত-দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমে তাদের জীবনীশক্তি যৌবন শেষ হওয়ার আগেই নিঃশেষ হয়ে যায়। তাদের মাঝে কিডনির রোগ বেশি, কারণ ডিউটির সময় তাদের পানি খাওয়াটা নিরুত্সাহিত করা হয়। কারণ পানি খেলে ঘন-ঘন বাথরুমে যেতে হবে, আর তাতে প্রোডাকশনের ক্ষতি হয়ে মালিকের লাভ কমবে। শহরের পথে সবচেয়ে প্রথম যাদেরকে পায়ে হেঁটে কাজে যেতে দেখা যায় এবং রাতে সবার পরে যাদেরকে কাজ শেষে লাইন বেঁধে বাড়ি ফিরতে দেখা যায়— তারাই গার্মেন্টস-শ্রমিক, অবহেলিত শোষিত আমাদের সেই শান্ত কোমল ‘বস্ত্রবালিকা’। অন্যদিকে, গার্মেন্টস শিল্পের অধিকাংশ মালিকের জীবনযাপনের মান, শান-শওকত ও জৌলুস ক্রমাগত বাড়ছে। তারা অনেকেই ফি বছর এক-দুই বার করে সপরিবারে বিমানের প্রথম শ্রেণীতে ভ্রমণ ও ফাইভ-স্টার হোটেলে অগ্রিম বুকিংসহ বিশ্ব ভ্রমণে বের হয়। কোটি কোটি টাকা বিদেশের ব্যাংকে জমা করে। এভাবে অর্থ ব্যয়ের সময় তাদের মনে সামান্য দ্বিধার জন্ম না হলেও, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার কথা উঠলেই তাদের মুখে সবসময় একই আর্তনাদ (!), ‘এটা করলে শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। ব্যবসা এখন খুব খারাপ’। দুই বছরের ব্যবধানে গার্মেন্টস-এর শ্রমিকদের বাঁচার মতো মজুরির দাবিতে আবার পথে নামতে হয়েছে। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির প্রশ্নে আর নিশ্চুপ বসে থাকা এখন সরকার ও মালিকদের জন্য তাই অসম্ভব হয়ে উঠেছে। শ্রমিকরা দাবি করেছে যে, কমপক্ষে ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মূল মজুরি (basic wage) স্থির করে, সব স্তরের শ্রমিকের মজুরি আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি করে এবং কাজের আগেই আলোচনাক্রমে সামঞ্জস্যপূর্ণ পিসরেটের হার ঠিক করে নেয়ার ব্যবস্থা রেখে মজুরি কাঠামোর ঘোষণা দিতে হবে। ধর্মঘটসহ বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। মালিকরা অবশ্য বরাবরের মতো চাইছেন যেন, অনেক কম পরিমাণে মজুরি কাঠামো নির্ধারিত হয়। যখনি শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর প্রশ্ন আসে, তখনি তারা প্রচারণার ঢেউ তুলে শোরগোল তোলার চেষ্টা করছে এই কথা বলে যে, মজুরি বাড়ালে গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। শ্রমিক ও মালিক দুই পক্ষের মধ্যে এখন রশি টানাটানি চলে। শিশু পার্কের ‘সি-স’-এর মতো। একদিক নেমে গেলে অন্যদিকটা উঠে যায়। দু’দিককেই একসাথে উঠানো বা নামানো যায় না। মালিকরা চায় কত কম মজুরি দেয়া যায়, শ্রমিকরা চায় মজুরি বাড়িয়ে মানুষের উপযুক্ত জীবনমানের কতটা কাছাকাছি যাওয়া যায়। এটাই শ্রেণী সংগ্রামের একটি স্পষ্ট অভিপ্রকাশ। সরকার প্রধানত কার স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ায়— দেখা যাক! তা দিয়েই প্রমাণ হবে সরকারের শ্রেণী চরিত্র। কত হওয়া উচিত গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি? সরাসরি শ্রেণী স্বার্থের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রশ্নটি বিবেচনা না করেও নানা যুক্তিগ্রাহ্য দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে দেখা যাক। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় আমরা দেখতে পাই যে, নিত্যদিনই বাজারে সব জিনিসের দাম ক্রমাগত বাড়ে। বাড়ে না শুধু ‘মানুষের’ দাম। মানুষের দাম কেবল কমতেই থাকে। সব মানুষের দাম অবশ্য কমে না। কমে শুধু শ্রমজীবী সাধারণ কর্মজীবী মানুষের দাম। ক্রীতদাস আমলে ‘মানুষ’ কেনা-বেচা হতো। এদেরকে বলা হতো ‘দাস’। অন্য দশটি বাজারি পণ্যের মতো দাসরাও ছিল কেনা-বেচার সামগ্রী। শরীর-স্বাস্থ্যের হাল, কাজের দক্ষতা, বয়স, সন্তান ধারণ ক্ষমতা ইত্যাদি গুণাবলী অনুসারে তাদের বাজার দর নির্ধারিত হতো। অনেক দাম দিয়ে দাস-দাসী কিনতে হতো। তাই তাদেরকে খাইয়ে-পরিয়ে সুস্থ সবল অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখার সাথে দাস মালিকদের স্বার্থ সরাসরি জড়িত ছিল। এরপরে সামন্তবাদী যুগে, জমিদারী হস্তান্তরের সাথে সাথে তার অন্তর্গত প্রজারাও (কোনো কোনো দেশে ভূমি দাস বা serf-রাও) হস্তান্তরিত হয়ে যেত। প্রজাকুলকে যদি সামন্তপ্রভুর গোলায় ফসল কিংবা অন্য সম্পদ তুলে দিতে হয়, কিংবা প্রভুর জন্য বেগার খাটুনি দিতে হয়, তাহলে তাকে শারীরিক সক্ষমতাসহ বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেয়াটা সামন্তপ্রভুর স্বার্থেই একান্ত আবশ্যক ছিল। কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদে শ্রমিক হলো স্বাধীন মানুষ। স্বাধীন মানুষকে কেনা-বেচার আওতায় আনা যায় না। তাই পুঁজিবাদে ‘মানুষ’ কেনা-বেচা হয় না, কেনা-বেচা হয় মানুষের (স্বাধীন শ্রমজীবী মানুষের) ‘শ্রমশক্তি’। পুঁজিবাদ একদিকে মানুষকে শারীরিকভাবে মুক্ত করেছে কিন্তু সেই সাথে সাথে শ্রমজীবী মানুষের জন্য বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করার দায় থেকেও মালিক শ্রেণীকে হাত গুটিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। পুঁজিপতির কাছে রহিম, করিম, যদু, মধু—ব্যক্তি মানুষটির কোনো মূল্য নেই। তার কাছে মূল্য হলো শ্রমিকের শ্রমশক্তির—তা সেটা রহিম, করিম, যদু, মধু যারই হোক না কেন। হালের বলদের দেখাশোনা করার জন্যও একজন গৃহস্থ থাকে। সেটাকে সুস্থ-সবল রাখার জন্য গৃহস্থের চেষ্টার অন্ত নেই। তার সামনে ভাতের ফ্যানটা, ঘাস-বিচালি ইত্যাদি তুলে দেয়া, শীতে এক-দুটো চটের ছালা তার গায়ে উঠিয়ে দেয়া— হালের বলদের জন্য কতো যত্নই সে করে থাকে। কারণ একটা বলদ মরলে গৃহস্থকে ১৫/২০ হাজার টাকায় আরেকটা কিনতে হবে। কিন্তু গার্মেন্টস শ্রমিকের অবস্থা হালের বলদের চেয়ে খারাপ। সে বাঁচল কি মরল তা দেখে রাখার জন্য কোনো গৃহস্থ নেই। কারখানার মালিকদের কাছে মালেকা, সালেকা, আনোয়ারা, মনোয়ারা— ব্যক্তি হিসাবে কারোরই কোনো মূল্য নেই। মূল্য শুধু তাদের পরিশ্রম করার ক্ষমতার, তাদের শ্রমশক্তির। এক মনোয়ারা মরলে মাত্র ৭০-৮০ টাকা রোজে আরেকজন আনোয়ারার শ্রমশক্তি সবসময়ই তার নাগালের মধ্যেই রয়েছে। দাস ব্যবস্থা ও সামন্ত ব্যবস্থার চেয়ে পুঁজিবাদের শোষণ প্রক্রিয়া তাই অনেক অমানবিক। পুঁজিবাদ হচ্ছে নতুন আরেকটি অধিকতর অমানবিক দাসত্বের ব্যবস্থা,— যার ভিত্তি হলো শ্রম-দাসত্ব। গার্মেন্টস শ্রমিকের শ্রমশক্তিটিকেই কারখানার মালিক কিনে নেয়। শ্রমশক্তিটাই পণ্য, মানুষটি নয়। এই শ্রমশক্তির দাম কত? শ্রমশক্তি উত্পাদন করতে যা খরচ হয়, তার চেয়ে নিশ্চয় কম হতে পারে না সেটার দাম। শ্রমশক্তির উত্পাদন খরচ কত? এটার হিসেব করতে হলে সর্বপ্রথম শ্রমিকের শারীরিক পরিশ্রমের সক্ষমতা (ক্যালরির হিসাবে) অর্জনের জন্য তাকে যে খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করতে হয় তার দাম হিসাব করতে হবে। হিসেব কষে দেখা গেছে যে, বর্তমানে এর পেছনে একজন মানুষের খরচ পড়ে কম করে ধরলেও ন্যূনতম দৈনিক ৯০ টাকা। এর সাথে আছে বাসস্থান, কাপড়-চোপড়, চিকিত্সা, শিক্ষা প্রভৃতির খরচ। শ্রমশক্তিকে উপযুক্ত দক্ষতা সম্পন্ন রূপে থাকার জন্য এসব খরচ অপরিহার্য। হিসাব করে দেখা গেছে যে, আহারের পেছনে ৪৫% খরচ হলে, এসবের জন্য খরচ হয় অবশিষ্ট ৫৫%। অর্থাত্ সাকুল্যে খরচ পড়ে ১৮০-১৯০ টাকা। তারপরে আছে শ্রমশক্তিকে বংশ পরম্পরায় অব্যাহত রাখার প্রয়োজনে পরিবার রক্ষা ও ভরণ-পোষণের খরচ। ৪ জনের একটি শ্রমিক পরিবারের জন্য সেই হিসাবে খরচ দাঁড়ায় দৈনিক ৭৫০ টাকার মতো। পরিবারের দুইজনকে কর্মক্ষম ধরলে, এই খরচ বহনের জন্য একেক জনের আয় করতে হবে দৈনিক ৩৭৫ টাকা, অর্থাত্ প্রতি মাসে ১১ হাজার ২৫০ টাকা। এটাই একজন মানুষের শ্রমশক্তি পুনরুত্পাদনের প্রকৃত মূল্য। এটাই হওয়া উচিত গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির হার (পুঁজিবাদী বাজার তত্ত্বের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে)। মানুষের শ্রমশক্তির বৈশিষ্ট্য হলো, তার যা উত্পাদন মূল্য, ব্যবহূত হওয়ার মাধ্যমে সে তার চেয়ে বেশি মূল্য সৃষ্টি করতে সক্ষম। এই অতিরিক্ত মূল্য মালিকরা তাদের ‘মুনাফা’ হিসেবে আত্মসাত্ করে। সেটাই পুঁজিবাদী শোষণ। সমাজতন্ত্রীরা এই ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ যেন মালিকের বদলে তার স্রষ্টা শ্রমিকরা পায় তা নিশ্চিত করার দাবি করে থাকে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা তাদের সৃষ্ট ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ পাওয়া তো দূরের কথা, তাদের শ্রমশক্তির মূল্যই মজুরি হিসাবে পায় না। স্বাভাবিক পুঁজিবাদী শোষণের বাইরে তাদের ওপর চলে মহা-শোষণ (super-exploitation)। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পর পাকিস্তানের সামরিক সরকার বাধ্য হয়েছিল ১২৫ টাকা জাতীয় ন্যূনতম গ্রস মজুরি রূপে ঘোষণা করতে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার তা বাড়িয়ে করেছিল বেসিক ১৫৫ টাকা। ১৯৯৪ সালে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয়েছিল ৯৩০ টাকা। ১৯৭৩-৭৪ সালের তুলনায় গত ৪০ বছরে পারিবারিক ব্যয় সূচক (Household Expenditure Index) কিংবা আপেক্ষিক গুরুত্বানুযায়ী সাধারণ সূচক (Weighted General Index) প্রায় ৪০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই হিসেবে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত ৬ হাজার ২০০ টাকার ওপরে। আধুনিক গার্মেন্টস শিল্পের কাজ আধা-দক্ষ ধরনের। তাই গার্মেন্টস-এ ন্যূনতম মজুরি জাতীয় ন্যূনতম মজুরির চেয়ে বেশি, অর্থাত্ ৮ হাজার টাকার বেশি হওয়াই যুক্তিসঙ্গত। ১৯৯৪ সালের তুলনায় বর্তমানে পারিবারিক ব্যয় সূচক ৬/৭ গুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই হিসেবে ১৯৯৪ সালে গার্মেন্টেসের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম মুজরি (৯৩০ টাকা) এখন এমনিতেই ৬ হাজার টাকার বেশি হওয়া উচিত। ২০০৬ সালে বিশেষজ্ঞরা হিসেব করে ৩ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বিশ্ব মন্দার কারণ দেখিয়ে ও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ন্যূনতম মজুরি হিসাবে ১৬৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০০৬-এর অবস্থাটি ছিল একটু ব্যতিক্রম, কারণ তখন শ্রমিকদেরকে অযৌক্তিক আত্মত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। তাই, নতুন করে ন্যূনতম মজুরি হার নির্ধারণ করার জন্য হিসাব কষার ক্ষেত্রে, ২০০৬ সালে যা নির্ধারিত হয়েছিল সেটা নয়, বরঞ্চ ১৯৯৪ সালে ও ১৯৭৩-৭৪ সালে কিংবা ১৯৬৯ সালে তা কত-তে নির্ধারিত হয়েছিল, সেটাকে ভিত্তি ধরে অন্তর্বর্তী সময়কালে মুদ্রাস্ফীতির হার ও প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে গুণ করে হিসাব কষাটাই হবে যুক্তিযুক্ত। গার্মেন্টস-এর মালিকরা হরদম একটি যুক্তি দেয় যে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ালে এই শিল্প প্রতিযোগী দেশের পণ্য মূল্যের কাছে মার খেয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক তৈরি পোশাকের বাজারে আমাদের প্রধান প্রতিযোগী হলো চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ইত্যাদি দেশ। বিশ্ব ব্যাংকের এক হিসেবে দেখা যায় যে, চীনে গার্মেন্টস শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি হলো মাসে ৩০০ ডলার (প্রতি ঘণ্টায় ১.৪৪ ডলার), ভারতে ১০৬ ডলার (ঘণ্টায় ০.৫১ ডলার), ভিয়েতনামে ৯২ ডলার (ঘণ্টায় ০.৪৪ ডলার), পাকিস্তানে ১১৬ ডলার (ঘন্টায় ০.৫৬ ডলার), শ্রীলঙ্কায় ৯২ ডলার (ঘণ্টায় ০.৪৪ ডলার)। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি হলো মাত্র মাসে ২৫ ডলার (ঘণ্টায় ০.২২ ডলার)। যদি শ্রমিকদের দাবি মেনে নেয়া হয় তাহলে তাদের মাসিক নিম্নতম মজুরি হবে ১০২ ডলারেরও কম (ঘণ্টায় ০.৩৪ ডলার)। এটাও হবে উল্লিখিত দেশগুলোতে প্রদত্ত নিম্নতম মজুরির চেয়ে কম। ভিয়েতনাম যদি ৯২ ডলার ন্যূনতম মাসিক মজুরি দিয়ে, ভারত ১০৬ ডলার নিম্নতম মজুরি দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে, বাংলাদেশের গার্মেন্টস মালিকরা তাহলে ন্যূনতম মজুরি তার চেয়ে কম দিয়ে (১০২ ডলার) তা পারবে না কেন? বিআইডিএস-এর এক জরিপে এই তথ্য পাওয়া গেছে যে, বাংলাদেশে পোশাক কারখানায় ১০০ টাকা মূল্যের পণ্য উত্পাদন করা হলে তাতে শ্রমিকদের শ্রমের মাধ্যমে যে মূল্য সংযোজিত হয় তার পরিমাণ ৩১ টাকা। এর মধ্যে মালিক নিয়ে নেয় ২৪ টাকা আর শ্রমিক পায় মাত্র ৭ টাকা। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক সারা বছরে ২৫০০ ডলারের সমপরিমাণ মূল্য সংযোজন করে। অর্থাত্ সে তার শ্রম দ্বারা মালিককে প্রতি বছর এনে দেয় ২৫০০ ডলার। অথচ সে মালিকের কাছ থেকে পায় এর মাঝ থেকে মাত্র ৭০০ ডলার, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন। শ্রমের মাধ্যমে সংযোজিত অবশিষ্ট ১৮০০ ডলার চলে যায় মালিকের পকেটে। এটাই পুঁজিবাদী শোষণ। হিসাব করলে দেখা যায় যে, শ্রমিকের ওপর মালিকের শোষণের মাত্রা হলো ২৫৭%। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের একজন গার্মেন্টস শ্রমিক বছরে ২৫৩৬টি টি-শার্ট তৈরি করে মজুরি পায় মাত্র ২৯০ ডলার। আর এর চেয়ে মাত্র ৫৬টি বেশি টি-শার্ট তৈরি করে ভারতের একজন শ্রমিক সেক্ষেত্রে পায় ৬৬৮ ডলার। সিপিডি-র এক হিসাবে দেখা যায়, ২০০১-০২ অর্থ বছরে গার্মেন্টস শিল্পে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৫৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে শ্রমিকদের দেয়া হয়েছিল মাত্র ২২ কোটি ১০ লক্ষ ডলার— যা মোট আয়ের মাত্র ৫%। অথচ শ্রমিকের শ্রম দ্বারা মোট মূল্যের ৩১% মূল্য সংযোজিত হয়েছিল। শিল্পের স্বার্থেই শ্রমশক্তির পুনরুত্পাদন নিশ্চিত করা দরকার, তাদের জন্য সপরিবারে সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশের লুটেরা পুঁজিবাদের ধারায় গড়ে ওঠা মালিকদের মাথায় এই সহজ কথাটি ঢুকতে চায় না। হাল চাষ করতে হলেও যে সুস্থ সবল গরু প্রয়োজন, তা বোঝানোর জন্যই খনার বচনে বলা হয়েছে, ‘আগে দিও গরুকে ঘাস, তার পরে করিও চাষ’। এটুকুও মালিক করতে নারাজ। গার্মেন্ট শিল্পের স্বার্থের ব্যাপারে তাদের অনেকেরই আসলে কোনো মাথাব্যথাই নেই। গার্মেন্টস শিল্প হলো তার কাছে কেবল লুটপাট করে টাকা বানানোর একটি উত্স মাত্র। অবশ্য অনেক মালিক আছেন যারা প্রকৃতই গার্মেন্টস শিল্পের স্বার্থ রক্ষা করতে চান। মজুরি নিয়ে দর কষাকষি থাকলেও সেসব মালিকদের সাথে শ্রমিকদের একটি বিশেষ স্বার্থের ক্ষেত্রে মিল আছে। তা হলো গার্মেন্টস শিল্পকে রক্ষা করার প্রশ্নে। এই সমস্বার্থবোধের কথা বিবেচনায় নিয়েই এরকম একটি আইনি-বাধ্যবাধকতা কি করা যায় না, যার দ্বারা কারখানার ২৫% শেয়ারের মালিকানা সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিকদের জন্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে? কয়েকদিন আগে আমার শিক্ষক প্রফেসর রহমান সোবহান এরকম একটি আইডিয়ার কথা নিয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করছিলেন। এসব নিয়ে আরো চিন্তা না হয় করা যাবে। তবে এখন বড় প্রশ্ন হলো, কত হবে গার্মেন্টস-এ ন্যূনতম মজুরি? আমি বলব, গার্মেন্টস শিল্পের সামগ্রিক স্বার্থ, যুক্তি গ্রাহ্যতা, মানবিকতা, জাতীয় বিকাশ, অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তা, সামাজিক শান্তি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার প্রতি সম্মান— সব বিবেচনা থেকেই গার্মেন্টস শ্রমিকদেরকে ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি প্রদানে মালিকপক্ষের ও সরকারের রাজি হয়ে যাওয়াটা আবশ্যক। লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি