নদী দখল প্রসঙ্গে

নদী দখল করিয়া বাণিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপনা প্রতিষ্ঠার যে ভয়াবহ সংস্কৃতি এই দেশে কিছুসংখ্যক দুর্বৃত্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় চালু করিয়াছে উহার বুঝিবা কোন প্রতিকারই নাই! এই ব্যাপারে বর্তমান সরকারের আমলে পরিবেশবাদীরা তো বটেই এমনকি দেশের বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদেরও কেহ সেই কোর্ট-কাছারির শরণাপন্ন হইয়াছেন। নদীগুলিকে রক্ষার মাধ্যমে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, প্রাণী বৈচিত্র্য সংরক্ষণ আর আন্তঃযোগাযোগের ব্যাপারে বিশেষ ইতিবাচক ব্যবস্থা কার্যকর করার আর্জি পেশের মাধ্যমে তাহারা আদালতের শরণাপন্ন হইলে মাননীয় আদালত রাজধানী ঢাকাকে উহার আশ-পাশের নদীগুলিকে দখলদারদের কবল হইতে মুক্ত রাখার জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশও দেন। আদালতের তরফ হইতে এইরূপ নির্দেশ পাইবার পর কিছুদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খানিক নড়িয়া-চড়িয়া উঠিতে দেখা যায়, কিন্তু কয়েকদিন বাদেই এই ক্ষেত্রে ‘যেই লাউ সেই কদু’ অবস্থাই আবার বিরাজ করিতে থাকে। ইহার অবশ্য দ্বিবিধ কারণ রহিয়াছে, এক: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যেই ভূতের ব্যাপক ছড়াছড়ি থাকায় মূল ভূতগুলিকে তাড়ানো তাহাদের পক্ষে আর সম্ভবই হয় না। দ্বিতীয়ত: যাহারা এই জাতীয় জবরদখল করে তাহারা স্থানীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তিশালী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি। ইহাদের অধিকাংশই আবার রাজনৈতিক দলগুলির এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনের মধ্যকার অনেক কর্তাব্যক্তির যারপরনাই পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করিয়া থাকে। আর সেই ক্ষেত্রে উভয় পক্ষেই ‘গিভ এ্যান্ড টেক’ নীতির আওতায় যে এই অসাধুতা চলে সেই কথাতো বলাই বাহুল্য। নদীকে বলা হয় সভ্যতার সূতিকাগার। বিশ্বের সকল দেশেই যেইখানে নদীকে ঘিরিয়া আয়-উন্নতি, নান্দনিকতা এবং সভ্যতার চলার পথ নির্ণীত হয় সেইখানে নদীমাতৃক বাংলাদেশে আবির্ভূত ইয়াজুজ-ম্যাজুজেরা নদী-নালা-খাল-বিল সব কিছুই গোগ্রাসে গিলিয়া সাবাড় করিয়া দিতেছে! রাজধানী ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত বলিয়া ইহার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। তাহা ছাড়াও, এককালে শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ এই সকল নদীও খরস্রোতা নদী হিসাবে ঢাকাকে ঘিরিয়া প্রবাহিত হইত। কিন্তু দখলদারদের বেপরোয়া লোভ ও উদগ্র লালসার কারণে আজ এইগুলি শুধু ক্ষীণ স্রোতস্বিনীরূপই ধারণ করে নাই, অনেক স্থানে ইহাদের চলার গতিও রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। ফলে ইহাদেরকে আর নদী বলিয়া চিনিবার কোন উপায়ই নাই। এইসব নদীর শাখারূপী খালগুলিও আজ অতীতের স্মৃতি হইয়া গিয়াছে ভূমিদস্যুদের হিংস্র থাবায়। নদী না বাঁচিলে দেশ ও সমাজকে বাঁচানো দায় হয়, অথচ এই সার সত্যটি আমাদের সংশ্লিষ্ট কোন মহলেই অনুভূত হয় বলিয়াতো মনে হয় না। না হইলে নদীর উপর এইভাবে বর্বরতা চলে কি করিয়া! সম্প্রতি আদালতের নির্দেশের প্রতি সম্মান আর জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল হইতে বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী কিছু এলাকাকে জবরদখলকারীদের কব্জামুক্ত করিবার অভিযান শুরু হইয়াছে। ইহা ভাল কথা। কিন্তু ইতোপূর্বেও আমরা এইরূপ অভিযান দেখিয়াছি এবং কিছুদিন বাদেই ‘যাহা পূর্বং তাহা পরং’ অবস্থায় দেখা গিয়াছে। সুতরাং, এই ক্ষেত্রে এই অভিযান যেন অর্থবহ হয় এবং উদ্ধারকৃত এলাকায় সাইড ওয়ার্ক ও বৃক্ষরোপণ ইত্যাদির পরিকল্পনা রহিয়াছে উহা যত্ন ও মমত্বের সহিত করা হয় ইহাই সকলে কামনা করে। গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে অবিশ্যি সর্বদাই এই ধরনের উচ্ছেদ চালানো বা খাল-বিল-নদী-নালা খাস জমিকে দখলমুক্ত রাখা খুব সহজসাধ্য ব্যাপার নহে। স্বৈরাচারী আমলে জোর করিয়া হয়তো এইসব করা যায় কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য এই জাতীয় উদ্যোগে অনেক ক্ষেত্রেই বুমেরাং হইবার ভয় থাকে। তাই গণতান্ত্রিক সরকারের আমলেই যেন জবরদখলের হিড়িক পড়ে। তবে যাহা অন্যায় ও অবৈধ উহা ঠেকানোর জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নাই। আর সেইদিকেই সরকারের যত্নবান হওয়া কর্তব্য। উপরন্তু সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্বরোচিতভাবে নদীবক্ষে যেইভাবে বর্জ্য ফেলিতেছে উহার নিন্দার ভাষা আমাদের জানা নাই। উহাকে অসভ্যতা বলিলেও অনেক কম বলা হয়। এই বর্জ্য পরিষ্কার করা ও নদীর নাব্যতা নিশ্চিত করাও বেদখলকৃত নদীর পাড় উদ্ধারের মতই অতীব প্রয়োজনীয়, এই কথাটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মনে রাখিতে হইবে।