যেই ট্রাজিডি পাল্টাইয়া দিয়াছে পৃথিবীকে
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৭
আমেরিকার মানুষ যাহা দুঃস্বপ্নেও ভাবে নাই ঠিক তাহাই ঘটিয়াছিল সেইদিন। আকস্মিক হামলার শিকার হইয়া বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিধর রাষ্ট্রটির গর্ব ও শৌর্যের প্রতীক বলিয়া বিবেচিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের আকাশচুম্বী ‘টুইন টাওয়ার’ ধসিয়া পড়িয়াছিল চোখের পলকে। একই সাথে আক্রান্ত হইয়াছিল দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর পেন্টাগনও। হামলার উদ্দেশ্যে ছিনতাইকৃত চতুর্থ বিমানটি মাঝপথে বিধ্বস্ত হওয়ায় ভাগ্যক্রমে রক্ষা পাইয়াছিল হোয়াইট হাউস। নাইন-ইলেভেন নামে খ্যাত সেই ধ্বংসযজ্ঞে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারাইয়াছিল প্রায় তিন হাজার নিরপরাধ মানুষ। তন্মধ্যে ছিনতাইকৃত চারটি যাত্রীবাহী বিমানের ২২৭ জন আরোহীসহ ৯৮ শতাংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। ঘটনার ভয়াবহতা আমেরিকাকে শুধু যে স্তব্ধ ও হতবিহ্বল করিয়া দিয়াছিল তাহাই নহে, বদলাইয়াও দিয়াছিল ব্যাপকভাবে। মারাত্মক ঘা লাগিয়াছিল তাহার অহংবোধে। তাহার প্রতিক্রিয়াও হইয়াছিল ভয়াবহ। ফলে নাইন-ইলেভেনের গর্ভে আহত ব্যাঘ্রের ন্যায় নূতন যেই আমেরিকার জন্ম হইয়াছিল তাহার রুদ্রমূর্তি আমরা আফগানিস্তানে দেখিয়াছি, দেখিয়াছি ইরাকেও। অচিরেই হয়তো সিরিয়ায়ও দেখিতে পাইব। আমেরিকা শুধু যে নিজে বদলাইয়া গিয়াছে তাহাই নহে, সেই সাথে বদলাইয়া গিয়াছে আমাদের পরিচিত পৃথিবীও। নাইন-ইলেভেনের আগের পৃথিবী আর এখনকার পৃথিবী যে এক নহে— তাহা বুঝিবার জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বা পণ্ডিত হইবার প্রয়োজন পড়ে না। একদা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার গৌরবপতাকাবাহী আমেরিকার নিকট এখন সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে তাহার নিজের নিরাপত্তা। আর এই নিরাপত্তার প্রশ্নে যে কোনো সময়ে বিশ্বের যে কোনো স্থানে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে তাহারা যে বিন্দুমাত্র দ্বিধান্বিত নহে— ইতিমধ্যেই তাহা স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে।
প্রতিটি ঘটনারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া অবধারিত। ইহা বিজ্ঞানের কথা। নাইন-ইলেভেন ট্রাজিডির জন্য ওসামা বিন লাদেন এবং তাহার সংগঠন আল-কায়দাকে দায়ী করা হইয়া থাকে। বিন লাদেন প্রথমে এই ঘটনায় তাহার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করিলেও পরবর্তীকালে ইহার দায় নিজের স্কন্ধে তুলিয়া নিয়াছিলেন। হামলার কারণ হিসাবে ইসরাইলের প্রতি আমেরিকার অন্ধ সমর্থন, সৌদি আরবে তাহাদের সামরিক উপস্থিতি এবং ইরাকের উপর অবরোধসহ বিভিন্ন যুক্তিও তুলিয়া ধরিয়াছিলেন তিনি। যুক্তি যতো জোরালোই হউক, মানববিধ্বংসী হামলা যে কখনই তাহার উপযুক্ত সমাধান হইতে পারে না— ইতোমধ্যে তাহা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। একইভাবে ইহাও অনস্বীকার্য যে নাইন-ইলেভেনের প্রতিক্রিয়া হিসাবে আমেরিকা বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যেই যুদ্ধ চালাইয়া যাইতেছে— তাহার অভিজ্ঞতাও কাহারো জন্য সুখকর হয় নাই। নাইন-ইলেভেনপরবর্তী গত একযুগে আফগানিস্তান ও ইরাককে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হইয়াছে। মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া দেওয়া হইয়াছে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে। তন্মধ্যে আমেরিকা ও মিত্র দেশগুলির সৈন্যের সংখ্যাও একেবারে কম নহে। যদি প্রশ্ন করা হয়, এতো মৃত্যুর পরেও কি পৃথিবীতে শান্তি আসিয়াছে? মূলোত্পাটন করা সম্ভব হইয়াছে সন্ত্রাসের? নিশ্চিত হইয়াছে আমেরিকা কিংবা সংশ্লিষ্ট দেশগুলির নিরাপত্তা? উত্তরটি সকলেরই জানা। ইতিমধ্যে আফগানিস্তান ও ইরাক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হইয়াছে। অস্থিতিশীল হইয়া উঠিয়াছে লিবিয়া, সিরিয়া এবং মিসরের পরিস্থিতিও। তবে আমেরিকার নীতিনির্ধারকগণ এই মর্মে আত্মতুষ্টিতে ভুগিতে পারেন যে বিশ্বের অন্যত্র কী হইল বা হইতেছে তাহাতে তাহাদের কী— শুধু আমেরিকা নিরাপদ থাকিলেই হইল! কিন্তু বাস্তবতা হইল, গোটা বিশ্বই যদি সন্ত্রাসের অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়, তাহা হইলে আমেরিকা নিরাপদ থাকিবে কিভাবে?
কোনো অজুহাতেই নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু সমর্থনযোগ্য নহে। বস্তুত ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যেই কাপুরুষোচিত হামলা চালানো হইয়াছিল তাহা আমেরিকাকে শুধু নহে, বরং সমগ্র বিশ্ববিবেককেই ক্ষতবিক্ষত করিয়া দিয়াছিল। ইহা যে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ঘৃণ্য একটি কাজ তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। সেই ট্রাজিডিতে যেইসব নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারাইয়াছিলেন আমরা তাহাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আন্তরিক সমবেদনা জানাই তাহাদের শোকাভিভূত স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি।