শিল্প কারখানায় গ্যাস সংকট
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৭
গ্যাসের সরবরাহ অপ্রতুল। ফলে সাভার ও গাজীপুরের কলে-কারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হইতেছে মারাত্মকভাবে। সম্প্রতি এই বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্ট হইতে জানিতে পারা যায় যে, সাভারের শিল্প এলাকায় চাহিদার এক তৃতীয়াংশ গ্যাসও পাওয়া যাইতেছে না। গ্যাসের অভাবে দিনে-রাতে গড়ে ১৭ ঘণ্টাই কলের চাকা বন্ধ। উত্পাদন নাই বলিলেই চলে। গ্যাসের চাপ হ্রাস পাইলে কিংবা একেবারেই না থাকিলে কোনো কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান বাধ্য হইয়া বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে। কিন্তু তাহাতে বোধগম্য কারণেই বাড়িয়া যায় উত্পাদন ব্যয়। এমতাবস্থায় কারখানা চালু রাখিতে কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাইতেছেন। উত্পাদন ব্যাহত হইলেও শিল্প পরিচালনা ব্যয় থামিয়া থাকে না। শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন ভাতা যেমন আছে, তেমনই রহিয়াছে ব্যাংক ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের দায়। জানা যায়, সাভার এলাকায় সব মিলাইয়া প্রতি ঘণ্টায় গ্যাসের চাহিদা ৯৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫৩ ঘনফুট। শিল্প কারখানায় চাহিদা প্রতি ঘণ্টায় ৮২ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ জোনে (ডিইপিজেড) ঘণ্টায় গ্যাসের চাহিদা ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ঘনফুট। বিরাজমান সংকট নিরসনের আশু কোনো সমাধানের সম্ভাবনা নাই বলিয়া জানাইয়াছেন স্থানীয় গ্যাস সরবরাহ কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র। অবশ্য ডিইপিজেডের কলকারখানার জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করিতে সরাসরি পৃথক পাইপ লাইন বসান হইতেছে। ইহাতে ইপিজেডের সমস্যার হয়তোবা সুরাহা হইবে। কিন্তু তাহার বাইরের কলকারখানাসমূহ থাকিয়া যাইবে যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই। বরঞ্চ কেহ কেহ মনে করেন যে,পৃথক পাইপ লাইনের মাধ্যমে ইপিজেডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হইলেও বাইরে সংকট আরও বৃদ্ধি পাইবে। সাভারের ন্যায় গাজীপুরের শিল্প কারখানাগুলিও আরও বেশি সংকটাপন্ন হইবে। উল্লেখ্য, ইপিজেডের বাইরেই কলকারখানার সংখ্যা বেশি।
গ্যাসের এহেন তীব্র সংকট কেন এবং কিভাবে তাহার সহজ উত্তর, গ্যাসের উত্পাদন কম। সারাদেশে আবাসিক-অনাবাসিক ও কলকারখানায় গ্যাসের যত চাহিদা সেই তুলনায় উত্পাদন নাই। তদুপরি বহুদূর হইতে পাইপ লাইনে গ্যাস আসিয়া পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে চাপ কমিয়া যায়। ফলে পাইপের শেষপ্রান্তে গ্রাহকগণ চাহিদামত গ্যাস পান না। পক্ষান্তরে তথ্যানুসন্ধানীরা বলেন, গ্যাসের উত্পাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান আছে সত্য। কিন্তু সেই ব্যবধান এতটা নয়, যাহাতে শিল্প কারখানাসমূহ চাহিদার একতৃতীয়াংশ সরবরাহও নিয়মিত পাইবে না। এক হিসাব হইতে জানা যায়, দেশে ২৩টি ক্ষেত্রের ৮৪টি কূপ হইতে গ্যাস উত্পাদন হয় কমবেশি ২ হাজার ৩১০ মিলিয়ন ঘনফুট। এইসব কূপের উত্পাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ইহার বিপরীতে সারাদেশে সর্বসাকুল্যে গ্যাসের চাহিদা ২৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট কিংবা তার চাইতে সামান্য কিছু বেশি। এই হিসাব হইতে দেখা যায় চাহিদার তুলনায় উত্পাদন ঘাটতি ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, শুধু কম উত্পাদনের জন্য নহে বরং অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণেই গ্যাসের সংকট তীব্র হইয়াছে। দেশের কলকারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হইতেছে অস্বাভাবিক হারে।
ইহা অনস্বীকার্য যে, গ্যাসের মওজুদ ও উহার উত্পাদন অসীম নহে। এই ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বিবেচনা এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনা একান্ত প্রয়োজন। অভিযোগ রহিয়াছে যে, বিভিন্ন গ্যাস সরবরাহ কোম্পানির এক শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে অবৈধ সংযোগ এবং অন্যবিধ পন্থায় বিপুল পরিমাণে গ্যাস পাইপ লাইন হইতে বাহির হইয়া যায়, যাহার কোনো হিসাব নাই। যাহার পরিণতিতে বৈধ সরবরাহ লাইনে চাপ কমিয়া যায়। গ্রাহক চাহিদামত গ্যাস পান না। কর্তৃপক্ষ কোনো কোনো এলাকায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিবার অভিযান চালাইলেও সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ইতরবিশেষ ঘটিবার লক্ষণ নাই। আমাদের বলিবার কথা এই যে, কলকারখানায় অব্যাহত উত্পাদন নিশ্চিত করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে কলকারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হইলে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ইহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িতে বাধ্য। উত্পাদন হ্রাস পাইলে বিনিয়োগকারীগণ ব্যাংকঋণের সুদ ও কিস্তি কিভাবে পরিশোধ করিবেন। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ভাতাইবা আসিবে কোথা হইতে। দেশে নতুন বিনিয়োগই হইবে কেন ও কেমন করিয়া? শিল্প উত্পাদনে বন্ধ্যাত্ব দেখা দিলে, বিনিয়োগ পরিবেশ প্রতিকূল হইয়া গেলে কর্মসংস্থানের পথও সংকীর্ণ হইয়া আসিবে। কাজেই শিল্পে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করিতে পরিকল্পিত ও সুসমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অতীব জরুরি।