সিরিয়ায় মার্কিন আক্রমণ এবং বিশ্বব্যাপী দুশ্চিন্তার ছায়া
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৫৯
সিরিয়ায় আক্রমণ নিয়ে বারাক ওবামা যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলন্দের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু ক্যামেরন পার্লামেন্ট সদস্যদের মত পাননি অতএব একমাত্র ফ্রান্সই সিরিয়ার যৌথ অভিযানে চালানোর ইচ্ছা প্রকাশ করছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিষয়ে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জার্মানীকে বড় ভূমিকা পালনের আহবান জানায় যুক্তরাষ্ট্র। জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়টি নিয়ে ভাবছে । কোথাও সামরিক অভিযানের প্রশ্নে ইউরোপে মতভেদের ঘটনা নতুন কিছু নয়। ইরাকে সামরিক অভিযানের কথা উঠলে তাতে ফ্রান্স ও জার্মানী বিরোধিতা করেছিল। আবার লিবিয়ায় কর্নেল গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে যখন ফ্রান্স ও ব্রিটেন প্রচার চালাচ্ছিল তখন দেখা গেল, জার্মানি জাতিসংঘে এ সংক্রান্ত ভোটাভুটিতে অংশ নেয়নি। মালিতে সামরিক অভিযানের প্রশ্নেও ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। সিরিয়ায় আসাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানায় ফ্রান্স। কিন্তু জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আসাদের ভাগ্য নির্ধারণের কথা বলার আগে সমস্যাগুলো স্পষ্ট করতে হবে। ফরাসী প্রেসিডেন্ট ওলন্দ ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সামরিক হস্তক্ষেপ সমর্থন করবেন। বার্লিন সরকার আসাদের বিরুদ্ধে মূলত গোড়া থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করছে। সামারিক হস্তক্ষেপের আগে তারা শুধু রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণই চায় না, সিরিয়া সরকারই যে এটা চালিয়েছে এবং সরকারের ভিতরকার নির্দেশে এটি হয়েছে তার বিস্তারিত প্রমাণ দাবি করে। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কোল বলেন অস্ত্র ব্যবহার, আন্তর্জাতিক নীতিমালার গুরুতর লঙ্ঘন। এর শাস্তি অবশ্যই পেতে হবে। এর বিচার অবশ্যই হতে হবে। এর দ্বারা এটিও বুঝাচ্ছে যে, বিচার হবে আমেরিকার নেতৃত্বে। রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের যথার্থ সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করা যে অসম্ভব একটি ব্যাপার সেটি স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই স্পষ্ট। যদিও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে নতুন তথ্য-প্রমাণ হাজির করার জন্য এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুমোদন লাভের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান ক্যাথরিন অ্যাশটন স্বীকার করেছেন ২৮টি দেশের এই জোটের পক্ষে বিষয়টিতে ঐকমত্যে পৌঁছানো আসলেই বড় সমস্যা। তার মতে , হস্তক্ষেপ করতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন অত্যন্ত জরুরি।
ইরাকে হামলার আগে তাদের হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে বলা হলেও পরে সেখানে তেমন আলামত পাওয়া যায়নি। তাই সামরিক হস্তক্ষেপের বৈধতা দিতে হলে তা অবশ্যই মানবিক প্রেক্ষাপট কিংবা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার যে অভিযোগই হোক না কেন, তার যথার্থতা প্রমাণিত হতে হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন জি-২০ সম্মেলনকে সিরিয়ার আড়াই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাশিয়া ও আমেরিকা এ ব্যাপারে দুই মেরুতে অবস্থান করছে। গত মে মাসে মার্কিন ও রাশিয়া সিরিয়ার ব্যাপারে একটি যৌথ শান্তি সম্মেলন আলোচনার উদ্যোগ নেয় কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। ইইউভুক্ত ২৮টি দেশ একমত হওয়ার চেষ্টা করছে মতৈক্য পৌঁছানোর। ফ্রান্স রাজি হয়েছে আমেরিকার সাথে যৌথ হামলা চালানোর ব্যাপারে, ওবামা মার্কিন কংগ্রেসের সমর্থন পেয়ে গেছেন কিন্তু তারপরেও কথা থেকে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সাম্প্রতিক কোন প্রেসিডেন্ট ধার না ধারলেও আইন অনুযায়ী কংগ্রেসের অনুমোদন নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওবামা। সমর্থন পেয়েছেনও। পর্যবেক্ষকগণ সিরিয়া ইস্যুতে কংগ্রেসের অনুমোদন চাওয়াটাকে ওবামার কৌশল হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, কংগ্রেস অধিবেশনে সিরিয়ার বিষয়ে বিতর্ক ও ভোটাভুটির সময় অর্থনীতিসহ মার্কিন অভ্যন্তরীণ সংকট আর দ্বন্দ্বগুলোকে আড়ালে ঠেলে দিতে সক্ষম হবেন তিনি। মূল হামলা চালানোর জন্য একটু সময় পেয়ে ভালোই হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন কারণ ওবামা এই সময়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবেন। বিশ্বের ১৯টি অগ্রসর দেশ ও ইইউভুক্ত দেশগুলোর জোট জি-২০ দুই দিনব্যাপী সেন্ট পিটার্সবার্গে ৬ তারিখ শেষ হয়। সিরিয়া ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া পাল্টাপাল্টি অবস্থান তুলে ধরে। রাশিয়া প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানো হলে তা হবে আন্তর্জাতিক আইনের কফিনের শেষ পেরেক।’
মানবিক সংকট নিরসনের বিবেচনা থেকে সামরিক অভিযান চালানোর ব্যাপারে একটি আইনি কাঠামো তৈরির একটি কাজ চলছে যা- রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট’ আর টু পি নামে পরিচিত। গত ’৯০ দশকে কসোভো ও রুয়ান্ডায় মানবিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এটি আলোয় আসে। সার্বজনীনভাবে না হলেও ব্যাপকভাবে গৃহীত আর টু পি-র তিনটি আবশ্যিক উপাদান হলো (১) রাষ্ট্র তার জনগণকে অবশ্যই গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ মানবতাবিরোধী অপরাধের কবল থেকে রক্ষা করবে। একই সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাধ্যবাধকতা থাকবে রাষ্ট্রকে ওই ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় সাহায্য করার। দুই, যখন এসব অপরাধের জোরালো তথ্যাদি থাকবে এবং রাষ্ট্র তা বন্ধ করছে না বা করবে না, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তখন শান্তিপূর্ণ উপায়ে ওই নৃশংসতা বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন লাগবে।
আমেরিকার সমর প্রস্তুতি বসে নেই। মার্কিন নৌ-বাহিনীর ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন করা যুদ্ধ জাহাজগুলো নতুন অবস্থানে নিতে শুরু করেছে। জাহাজের ক্ষেপণাস্ত্র যদি না কুলোয় তা হলে বিমান হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে দুটি বিমানবাহী রণতরী। এ ছাড়া প্রয়োজন হলে তুরস্ক ও সাইপ্রাসের সেনাঘাঁটিতে পদাতিক সেনা ব্যবহারের পরিবর্তে আকাশপথে আক্রমণ সমর্থন করছেন। তারা যে সীমিত হামলার শর্ত আরোপ করছে এতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে হামলা চালানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কারণ, ইরাক ও আফগানিস্তান ‘ঢালাও অভিযান’ চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে খেসারত দিয়েছে এক দশক পরও তার জের টানতে হচ্ছে। তাই সিরিয়ায় আক্রমণ তারা কিছুটা চিন্তা-ভাবনা করেই করছে।
মার্কিন বাহিনীর প্রধান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফস চেয়ারম্যান জেনারেল মার্টিন পেম্পস বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ক্ষেপণাস্ত্রের স্থাপনা ও সেনা কমান্ডের প্রধান দপ্তরগুলো। একই সঙ্গে বিমানবিধ্বংসী প্রতিরক্ষা স্থাপনা।পাশাপাশি চলবে বাশারবিরোধী বিদ্রোহীদের সামরিক প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সরবরাহের কাজ। পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে ‘উড্ডয়ন নিষিদ্ধ’ এলাকা তৈরি। এতে বিদ্রোহীদের দমনে বাশারের যুদ্ধবিমান নিজ দেশের আকাশসীমারই কিছু অংশে উড়তে পারবে না। এরপর হয়তো তুরস্ক ও জর্ডানের সীমান্তে বাফার জোন গড়ে তোলা হবে। সেখানে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হামলা জোরালো করতে পারে। সর্বশেষ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ। অবশ্য রাসায়নিক অস্ত্র তারা ধ্বংসের চেয়ে কবজা করার দিকেই নজর দিবে বেশি।
সিরিয়ায় মার্কিন আক্রমণ হলে এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে এই নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ উদ্বিগ্ন। আক্রান্ত হলে সিরিয়া বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ জোরদার করতে পারে। যুদ্ধ ছড়িয়ে যেতে পারে তুরস্ক ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে। জর্ডানের পেছন থেকে হামলা চালাতে পারে কট্টরপন্থী ইসলামী শিয়া গোষ্ঠী হেজবুল্লাহ। ইসরায়েলের সঙ্গে হেজবুল্লাহর পুরনো বিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এদিকে সিরিয়া বলছে যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধলেও দামেস্ক পিছু হটবে না। সিরিয়ার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে ইরান। ইরানের সেনাপ্রধান জেনারেল কাশেম সোলাইমানি বলেছেন, আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করছে তাদের ৯৫ শতাংশই বিদেশি সন্ত্রাসী। সিরিয়াকে এই বিদেশি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য ইরান সিরিয়ার পাশে থাকবে। ইরানের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া মানে ইসরাইলও জড়িয়ে পড়বে। আর তার ফল গোটা মধ্যপ্রাচ্য শুধু নয়, এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপকেও ভোগ করতে হবে। চীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে এই বলে যে, সিরিয়ায় সেনা অভিযান চালানো হলে বিশ্বে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তেলের দাম বাড়বে। পরাশক্তিগুলো সিরিয়া ইস্যু নিয়ে দুইভাগে ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
এতকিছুর পরও আসাদ আছেন খোশ মেজাজে। কারণ তিনি বুঝতে পারছেন এবং তার অনুগতদের বুঝাচ্ছেন যে, আমেরিকা সিরিয়ায় তেমন জোরালো আক্রমণ চালাবে না কারণ বিদ্রোহীদের অধিকাংশই আল কায়েদার কট্টর সদস্য। এখন সময়ই বলে দেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোন্ দিক রক্ষা করবে?
লেখক :আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
ইমেইল: masumbillah65@gmail.com