রাষ্ট্রীয় টাকায় দলীয়পোষণ চলিতে পারে না

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার রাস্তা-ঘাটের অবস্থা খুবই করুণ। সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক খবরে বলা হইয়াছে যে, সারাদেশের জেলা সড়কগুলির ৭০৬০ কিলোমিটার জরাজীর্ণ অবস্থায় রহিয়াছে। ইহাছাড়া আঞ্চলিক হাইওয়ের ৩৩৩৪ কিলোমিটার এবং জাতীয় মহাসড়কের ২৮০১ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা শোচনীয়। যোগাযোগমন্ত্রী গত জানুয়ারি মাসে বলিয়াছিলেন যে, বর্ষা মৌসুমের আগেই বেহাল সড়কগুলি মেরামত করা হইবে। দুশ্চিন্তার কোন কারণ নাই। কিন্তু এখন পত্র-পত্রিকায় যেইসব খবর প্রকাশিত হইতেছে তাহাতে বিপরীত চিত্রই পাওয়া যাইতেছে। আমরা রাস্তা মেইনটেন্সের খবরা-খবর খুঁজিতে গিয়া যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়া দেখি সেখানে লিখা রহিয়াছে-Contents are not available due to maintenance. তাই দেশের বহু রাস্তা-ব্রিজ-কালভার্ট কেন ভগ্ন অবস্থায় উপনীত হইয়াছে তাহা বুঝিতে অসুবিধা হয় না। বিভিন্ন সংযোগ সড়ক, আন্তঃজেলা সড়ক, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের রাস্তার অবস্থাও আশানুরূপ নহে। কোন কোন রাস্তা ৮/১০ বত্সর ধরিয়া সংস্কারের কোন নাম নাই। নদী ভাঙন, প্রবল বৃষ্টিপাত বা ভারি যানবাহন চলাচলের কারণে রাস্তা নষ্ট হইতেছে প্রতিনিয়ত। পিচ উঠিয়া অনেক রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু সেইদিকে কাহারও কোন ভ্রূক্ষেপ নাই। ইহাতে বত্সরের পর বত্সর জনগণকে ভোগান্তি পোহাইতে হইতেছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের রাস্তা ছাড়াও অনেক রাস্তা আছে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের। সেইগুলির অবস্থা আরো সঙ্গীন। নূতন নূতন রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হইলেও পুরাতন রাস্তাগুলি সংস্কারে গুরুত্ব দেওয়া হইতেছে না বলিলেই চলে। এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন না হইয়া পারা যায় না। সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তাগুলি সংস্কারের জন্য আলাদাভাবে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হইয়া থাকে। অন্যদিকে এলজিআরডির অধিকাংশ রাস্তা বিদেশি প্রকল্পের অর্থে নির্মিত হয়। এইসব রাস্তা দেখভাল করিবার জন্য নির্দিষ্ট জনবল কাঠামো আছে। বিভিন্ন পর্যায়ে রহিয়াছে বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাহাদের বেতন-ভাতা ট্যাক্সপেয়ারদের টাকায় পরিশোধ করা হইয়া থাকে। তাহা হইলে প্রশ্ন হইল, রাস্তাগুলি দিনের পর দিন মেরামত করা হইবে না কেন? নিয়মমাফিক কাজ না হইলে এই ধরনের বিভাগ রাখিবারইবা কি প্রয়োজন? আবার যেই সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করেন না, তাহাদের চাকুরিতে থাকিবার কী যুক্তি থাকিতে পারে? রাস্তাঘাট নির্মাণ বা মেরামতের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরির ঠিকাদার থাকেন। তাহাদের এনলিস্টমেন্ট বা তালিকা থাকে। তাহাদের মধ্য হইতেই ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়ার কথা। কিন্তু অধিকাংশ সময় দেখা যায়, এই ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনাই মুখ্য হইয়া দাঁড়ায়। তাহাদের অধিকাংশই আবার নিজেরা কাজ করেন না। তাহারা অগ্রিম টাকার বিনিময়ে কাজটা বিক্রি করিয়া দেন অন্যের নিকট। দেখা যায়, এই পর্যায়ে যাহারা কাজ পান, তাহারাও আদৌ ঠিকাদার নহে। তাহারাও অন্যকে দিয়া কাজ করান। ঠিকমত রাস্তা-ঘাট নির্মাণ বা সংস্কার না হইবার ইহাও অন্যতম কারণ। তাই সর্বাগ্রে এই সাব-কন্টাক্ট দেওয়ার রীতি বন্ধ করিতে হইবে। কাজ শুরু হইবার আগে এইভাবে সরকারি অর্থ নয়ছয় হওয়ায় জনগণ প্রকৃত সুফল পাইতেছে না। ঠিকাদারির বেচাকেনা বা বারবার হাতবদল জনস্বার্থেই বন্ধ করিবার সময় আসিয়াছে। নব্বইয়ের পর গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে যোগাযোগ খাতে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে। মেনটেন্যান্স বা রক্ষণাবেক্ষণ খাতেও বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে অঢেল অর্থ। এখনও ইহার পরিমাণ কম নহে। কিন্তু আশির দশকে এই সংকান্ত বাজেট কম থাকিলেও লোকেরা মনে করেন যোগাযোগ খাতে সেই সময় কাজ হইয়াছে বেশি। তাহার কারণ সেই সময় জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দলীয় লোকদের লালন-পালনের প্রশ্ন ছিল না। ফলে বাজেটের অর্থ ঠিকমত ব্যয় করা হইত। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে দলীয়পোষণ বৃদ্ধি পাইয়াছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। এইভাবে রাষ্ট্রের টাকায় দলীয়পোষণ আর চলিতে পারে না। চলতি অর্থ বত্সরে রাস্তাঘাট সংস্কারের জন্য বাজেটে ৫৫৫১ কোটি ৮৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে। যদি নিয়ম মানিয়া কাজ করা হয়, তাহা হইলে এই পরিমাণ বরাদ্দে এমনিতেই বরকত আসিবে। জনগণ প্রকৃতঅর্থে উপকৃত হইবেন। আমাদের সম্পদ সীমিত বিধায় এই ব্যাপারে তীক্ষ নজর রাখিতে হইবে এবং জাতীয় সম্পদের সুষম ও সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করিতে হইবে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে যোগাযোগ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হইয়াছে। ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এখন সেই রাস্তাগুলি যথাযথভাবে সংস্কারের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখিতে হইবে।