ভুলে ভরা পাঠ্যপুস্তক
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:১৭
জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে এই বত্সর মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য একযোগে নূতনভাবে প্রকাশিত ৭০টি বইয়ে এখনও প্রচুর অসংগতি ও ভুলত্রুটি রহিয়া গিয়াছে। এনসিটিবি এখন বলিতেছে, সম্পাদনা সহকারীদের দিয়া বইয়ের মুদ্রণপ্রমাদ ঠিক করিবার উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। কিন্তু পুরাতন তথ্য হালনাগাদ, জটিল বাক্য সহজ করা, বিভ্রান্তিকর তথ্য বাদ দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সব অসংগতি থাকিয়াই যাইবে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখিলে কেবল অবাক নয়, আমাদেরকে হতবাক হইতে হইবে। নবম-দশম শ্রেণীর অর্থনীতি বইয়ে নানা ধরনের ভুল রহিয়াছে কমপক্ষে ২০৫টি, ইতিহাসে ভুল আছে অন্তত ৫৫টি। ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে ৫২টি, হিন্দুধর্মের বইয়ে ২৪টি। একই শ্রেণীর রসায়ন, গণিত ও উচ্চতর গণিতের প্রতিটি বইয়ে ভুলের সংখ্যা ১০০’র কাছাকাছি। উল্লেখ্য, সাধারণ শিক্ষায় প্রথম হইতে নবম শ্রেণী পর্যন্ত মোট পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা ১৩২। এইগুলির মধ্যে মাধ্যমিকের বই ৯৯টি, প্রাথমিকের ৩৩। পৃষ্ঠা উল্টাইলে দেখা যাইবে সব বইয়েই কমবেশি ভুলত্রুটি রহিয়াছে। কিন্তু নূতন পাঠ্যক্রমের ৭০টি বইয়ে যে বিপুল পরিমাণ ভুলভ্রান্তি রহিয়া গিয়াছে তাহা শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতির কারণ হইতে পারে। এমনিতেই, নূতন শিক্ষাক্রমের ভীতি ও সৃজনশীল প্রশ্ন লইয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ ছিল, ভুলত্রুটিগুলি চিহ্নিত হইবার পরে তাহা আরও বাড়িয়া গিয়াছে।
অথচ, প্রতিটি বইয়ের লেখক ও সম্পাদক হিসাবে ৫ হইতে ১২ জনের নাম উল্লেখ আছে। তাহাদের প্রায় সকলেই বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কয়েকজন শিক্ষাবিদও রহিয়াছেন। প্রতিটি বইয়ে সমন্বয়ক হিসাবে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ রহিয়াছে। সবকিছুর পরও আছেন এনসিটিবির সম্পাদনা বিভাগ। দীর্ঘদিন পর নূতন পাঠ্যসূচি অনুযায়ী পুস্তক প্রণয়ন করা হইয়াছে বলিয়াই তাড়াহুড়ায় অনেক ভুলভ্রান্তি ও আপত্তিকর শব্দ থাকিয়া গিয়াছে বলিয়া এনসিটিবি অজুহাত তুলিলেও তাহা ধোপে টিকিবে না। কারণ, যে সময় ও জনবল লইয়া এনসিটিবি স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্প পৃষ্ঠার পাঠ্যপুস্তকগুলি প্রণয়ন করিয়াছে, তাহার চাইতেও কম সময় এবং জনবল লইয়া নির্ভুলভাবে ঢাউস আকারের পুস্তক প্রকাশের হাজারটা নজির আমরা চাহিলেই হাজির করিতে পারিব। সেইহেতু, কারণ অন্যখানে। খোঁজ নিলে জানা যাইবে, এনসিটিবি’তে কর্মরত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই অযোগ্য এবং বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া প্রতিষ্ঠানটি ‘ডাম্পিং প্লেস’ হিসাবে ব্যবহূত হইতেছে। কেবল তাহাই নহে, পুস্তক প্রণয়নের জন্য লেখক ও সম্পাদকদেরকে যে সম্মানী দেওয়া হয় তাহা অত্যন্ত অসম্মানজনক— বলিতে গেলে যাতায়াতের খরচও উঠিয়া আসে না। এই বত্সর কয়েকজন সম্পাদক তাই এনসিটিবির দেওয়া সম্মানী প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। যদি এমন হইত যে এনসিটিবির টাকা নাই তাহা হইলে অন্য কথা ছিল। কিন্তু যেই প্রতিষ্ঠান বত্সরে ৬০০-৭০০ কোটি টাকার কাজ করে, সেই প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যপুস্তক প্রণেতা ও সম্পাদকদের প্রতি এই অবহেলাকে এক কথায় অন্যায়ই বলিতে হইবে। আর এই সকল অবহেলা, অযোগ্যতা ও অমনোযোগ পুঞ্জীভূত হইয়া পাঠ্যপুস্তকে ভুলের পরিমাণ দিন দিন বাড়াইয়া চলিয়াছে।
পরপর তিন বত্সর ধরিয়া শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সকল শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূলে বই পোঁছাইয়া দেওয়ার অসামান্য কৃতিত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল বর্তমান সরকারই দেখাইতে পারিয়াছে। শিক্ষার সর্বজনীন অগ্রগতি সাধনে বর্তমান সরকারের অন্যান্য প্রচেষ্টাও সকলের নজর কাড়িবে এবং উত্সাহ যোগাইবে। কিন্তু, কোমল শিক্ষার্থীদের সম্মুখে মুদ্রণ, তথ্য ও প্রমাণগত হাজারটা ভুলের যে মানচিত্র বিছাইয়া রাখা হইতেছে তাহা জাতি হিসাবে আমাদেরকে কেবল পিছনেই টানিয়া ধরিবে। ভুল জ্ঞান কেবল ক্ষতিকরই নহে, নূতন প্রজন্ম গঠনে তাহা বিপজ্জনকও বটে। অথচ, ইতিহাস জুড়িয়াই, কেবল শিক্ষাক্ষেত্রে নহে, জাতীয় জীবনের সর্বত্রই আমরা অমার্জনীয় সব ভুলের চর্চা করিয়া চলিয়াছি।