স্মরণ

বিদায় বাংলা চলচ্চিত্রের শেষ নবাব

নবাব সিরাজউদদৌলাকে চোখে দেখিনি আমরা, বাংলাদেশে অভূতপূর্ব জনপ্রিয় ও দেশপ্রেমের নাম্বার ওয়ান প্রতীক তিনি। বাস্তবে উর্দুভাষা, মেজাজি বা যাই হোক না কেন, বাঙালি তাকেই দেশপ্রেমিক বলে মেনে নিয়েছে। সিরাজউদদৌলার জন্য চোখের পানি পড়েনি এমন বাঙালি বিরল। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথা উঠলেই সিরাজউদদৌলাকে মনে পড়ে আমাদের। তিনি ও তাঁর সঙ্গীরাই এখনো বীরত্ব শৌর্য আর প্রগতির প্রতীক। অপরদিকে ঘাতক মোহম্মদী বেগ আর বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর বাঙালির চিরশত্রু। এমনই প্রভাব এ দেশে লাখো শিশু সন্তানের নাম সিরাজউদদৌলা বা সিরাজ হলেও একজনও মীর জাফর নেই। হবেও না কোনদিন। ইতিহাসের চেয়ে বাস্তবতার চেয়ে অনেক গুণ বড় আর বিশাল হয়ে উঠেছে শিল্প সংস্কৃতি। বিশেষত নাটক, যাত্রা ও সিনেমার এই সিরাজউদদৌলা। চোখে না দেখলেও পলাশী প্রান্তরে বাংলার সূর্য অস্তমিত হবার আবেগপ্রবণ ডায়লগ বা উচ্চারণে মোহিত করে রাখা সিরাজউদদৌলাকে আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের ব্যক্তিত্বে। খান আতার কালজয়ী এই ছবিটি সিনেমার মানদণ্ড বা ধ্রুপদী বিশ্লেষণে যাই হোক না কেন এর আবেগী মূল্য ঐতিহাসিক। বাংলাদেশের মানুষের মনে সিরাজউদদৌলার ছবি মানেই আনোয়ার হোসেন। এই ছবির পর থেকে তাকে ঐ উপমা বা চরিত্র থেকে কখনো পৃথক করা যায়নি। প্রত্যেক শিল্পীর জীবনে বিশেষত বড় অভিনেতা-অভিনেত্রীর জীবনে এমন একটি মাইল ফলক থাকে যা তারা ইহজীবনে আর কখনো টপকে যেতে পারেন না। আনোয়ার হোসেনের বেলায়ও তাই ঘটেছিল। যদিও ‘জীবন থেকে নেয়ার’ মত ছবিতে তাকে আমরা আবারো দেশপ্রেমী চরিত্রে দেখতে পাই। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি লগ্নে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশের স্বপ্ন জাগানো জহির রায়হানের এই অমর সৃষ্টিতেও আনোয়ার হোসেন ছিলেন মুক্তির প্রতীক। ছিলেন ‘আলোর মিছিল’ জাতীয় চলচ্চিত্রেও। তারপরও সিরাজউদদৌলার ইমেজ ভাঙেনি। সে ইমেজকে অক্ষুণ্ন রেখেই বৃত্ত ভেঙে এগিয়ে চলেছিলেন তিনি। আমাদের চলচ্চিত্রের আজকের দুর্দশা বা ভগ্নদশা দেখে বোঝার উপায় নেই আনোয়ার হোসেনের জনপ্রিয়তা, সুনাম ও যশ কতটা সর্বগ্রাসী বা ব্যাপক ছিল। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের হাঁটি হাঁটি পা অবস্থা থেকে বাংলাদেশে যদ্দিন না হিন্দী ছবির ব্যর্থ অনুকরণে আমরা পাগল না হয়ে উঠেছি আনোয়ার হোসেন এবং তাদের ছায়াছবিগুলো ছিল বিনোদনের সোনালী উত্সমুখ। তাদের ছবির টিকেট কালোবাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো মানুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে টিকেট কেটে সিনেমা দেখার কালে আনোয়ার হোসেনের মত অভিনেতারাই ছিলেন ছবির প্রাণ। রাজ্জাক, কবরী, ববিতা, উজ্জ্বল, শবনম বা জাফর ইকবালের মত নায়ক-নায়িকা খুঁজে পাওয়া গেলেও রোজী-আনোয়ার হোসেন কিংবা আনোয়ারা-আনোয়ার হোসেনের জুটি পাওয়া যাবে না। বড় ভাই, চাচা, বাবা, চাকর থেকে নায়ক- প্রায় সব চরিত্রে এমন অপূর্ব প্রকৃতিজাত অভিনেতা বিরল। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক সমস্যার দেশে যা হয়, কেউ কাউকে খুব বেশি দিন মনে রাখে না। রাখলেও সম্মান ও গুরুত্ব দিতে পারে না। সে যত বড় বা ছোটই হোক না কেন। অবহেলা, বিস্মৃতি বা বিস্মরণের মেঘ এসে ঢেকে দিয়ে যায়। বয়সকালে আনোয়ার হোসেনের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিছুদিন থেকে মিডিয়ায় তার অসুস্থতা ও বিদেশে প্রেরণের আবেদনজনিত খবর দেখে মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। অন্ধকার অপশক্তি আর অপবিনোদনের এই কালে প্রযুক্তি সর্বস্ব মানুষের ভিড়ে আনোয়ার হোসেন কি আর যোগ্য মর্যাদা পাবেন? সে হিসেব নিকেশ চুকিয়ে তিনি এখন দূর আকাশের তারায় তারায়। জীবদ্দশায় যাকে আমরা স্টার বা তারা মনে করে ভালোবাসি জীবনের ওপারে তিনিই তারা হয়ে আমাদের দেখেন। অবলোকন করেন। ফেলে রেখে যাওয়া জীবন ও মানুষদের দেখে তৃপ্তি লাভ করেন। আমাদের চলচ্চিত্র জগতের শেষ নবাব বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নৃপতি আনোয়ার হোসেনকে শেষ বিদায়। চিরঞ্জীব হে বাংলার সিরাজউদদৌলা আমরা তোমায় ভুলবো না। সিডনী থেকে