সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ উত্তাপ ছড়াচ্ছে সিডনীর শহরতলীতে

বহুজাতিক অভিবাসীদের শহর হল সিডনী। এই শহরের কোনো কোনো এলাকায় একটি বিশেষ জাতিভিত্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাধিক্য লক্ষ্য করা যায়। সিডনীর উত্তর-দক্ষিণ এলাকায় মূলত মুসলিম আরব অষ্ট্রেলিয়ানদের বসবাস। যেমন ব্যাঙ্কসটাউন, অবার্ন এলাকায় তুর্কি ও সিরিয়ান কম্যুনিটি, ল্যাকেম্বায় লেবানীজ কম্যুনিটি ইত্যাদি। মসজিদকে ঘিরেই বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম জনবসতি গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে লিভারপুল এলাকায় থাকেন ভিয়েতনামীজরা এবং সিডনী ডাউন-টাউন অর্থাত্ হে-মার্কেট এলাকায় রয়েছে চায়না টাউন। বাঙালিরা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও ল্যাকেম্বা, মিন্টো, হিলসেডল, ব্ল্যাকটাউন, রুটিহিল সন্নিহিত এলাকায় অধিকাংশ বাঙালি বসত গেড়েছেন। অনেক অষ্ট্রেলিয়ান এটা ভালো চোখে দেখেন না এবং এসব এলাকাগুলোকে তাচ্ছিল্য করে Ghetto বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। তাদের মতে এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরবরা নিজেদের কম্যুনিটি ছেড়ে বাইরে আসতে চান না, অষ্ট্রেলিয়ার মূল ধারার সংস্কৃতি ও জীবনধারার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে তারা আগ্রহী নন। এটা পুরোপুরি ঠিক নয়। নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে যখন একজন অভিবাসী অষ্ট্রেলিয়ায় আসেন, তখন নতুন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য স্বাভাবিক কারণেই পরিচিত কোনো বন্ধুর কাছাকাছি কিংবা এমন কোনো এলাকায় থাকতে চান যেখানে দেশী মানুষের দেখা মিলবে। সম্প্রতি সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ নিয়ে সিডনীর আরব মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে যা ঘটছে তা পুরো মুসলিম কম্যুনিটির ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করছে। সিরিয়ায় হাজারো নিরীহ নাগরিকের মৃত্যু নিয়ে সিরিয়া বংশোদ্ভূত অষ্ট্রেলিয়ান নাগরিকদের উদ্বেগ হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সিরিয়ায় আলাউইয়া শিয়া ও সুন্নী মুসলিমদের মধ্যে যে লড়াই চলছে; সেই সংঘাত, বিদ্বেষ ও ঘৃণার উত্তাপ সিডনী শহরেও অনুভূত হচ্ছে। সিডনীর আরব বংশোদ্ভূত শিয়া ও সুন্নী কম্যুনিটির মানুষ একে অন্যের বাসায় অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিয়ে টেলিফোনে ম্যাসেজ দিচ্ছেন, এমনকি হত্যারও হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে পুলিশের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট আসছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের আদলে অবার্ন, ল্যাকেম্বা ও ব্যাঙ্কসটাউন এলাকায় জাতিগত সংঘাতের লাইন টানা হচ্ছে। দুঃখজনক হল, আরব মুসলিমদের এ ধরনের মারমুখী এবং বুনো আচরণের জন্য সিডনীর পুরো মুসলিম কম্যুনিটিকে দুর্নামের ভাগী হতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক অষ্ট্রেলিয়ান আরব যাদের অধিকাংশ হলেন লেবানীজ, গৃহযুদ্ধে অংশ নিতে সিরিয়া পাড়ি দিয়েছেন। সিডনীর আরব এলাকায় সহিংসতার ঘটনা বেড়েই চলেছে। রাস্তায় হাতাহাতি, বাড়িতে ফায়ারবম্ব নিক্ষেপ, এমনকি প্রতিপক্ষকে অপহরণের মত ভয়ঙ্কর ঘটনাও ঘটছে। সিডনীর পাঞ্চবাওল এলাকার একজন শিয়া মুসলিম ফেসবুকে প্রেসিডেন্ট আসাদের পক্ষে মন্তব্য করার আধঘন্টার মধ্যে নিজ বাড়িতেই আক্রান্ত হয়েছেন। বাড়ির দরোজার সামনেই সুন্নী প্রতিপক্ষের দুর্বৃত্তরা তার পায়ে গুলি করেছে দু দু’বার। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা ভেবে এখন অনেকে পুলিশের কাছেও মুখ খুলছেন না। অবার্ন এলাকার প্রধান সড়কের দু’পাশ জুড়ে রয়েছে সারিসারি সুস্বাদু কাবাবের দোকান। কাবাবের স্বাদ নিতে আমি নিয়মিত সপরিবারে ওই সব দোকানে যাই। কিন্তু সহিংসতার ফাঁদে আটকে পড়ার ভয়ে এখন কাবাবের দোকানে যাওয়াটাও নিরাপদ মনে হয় না। শিয়াদের কাফির ফতোয়া দিয়ে অনলাইনে জোর প্রচারাভিযান চালাচ্ছে সুন্নীরা। শিয়া মালিকানাধীন দোকান-পাট ও ব্যবসা বর্জনেরও ডাক দিয়েছে সুন্নী গোষ্ঠী। দুঃখ হয়, যেসব এলাকায় শিয়া, সুন্নী কম্যুনিটি শান্তিপূর্ণভাবে দিনের পর দিন বসবাস করছিলেন, আজ সেখানেই জ্বলছে জাতি বিদ্বেষের আগুন। আরব অষ্ট্রেলিয়ানদের এ ধরনের সহিংস আচরণ, মূলধারার শ্বেতকায় অষ্ট্রেলিয়ানদের মুসলিম কম্যুনিটির বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে। সম্প্রতি অষ্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পার্লামেন্টে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম সাংসদ বসনিয়া বংশোদ্ভূত এড হিউসিকের শপথ গ্রহণ নিয়ে যা ঘটে গেল তা মুসলিমদের ভেবে দেখা উচিত। গভর্নর জেনারেলের কাছে হিউসিক কোরান হাতে নিয়ে শপথ নেবার পর ফেসবুক, ব্লগ ও মিডিয়াতে রীতিমত হৈ-চৈ পড়ে যায়। বহু অস্ট্রেলিয়ানরা এটাকে মোটেই ভালো চোখে দেখেননি। এড হিউসিকের ফেসবুকের পাতায় কটূক্তি করে এসেছে অসংখ্য মুসলিম বিদ্বেষী বার্তা। পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমরা নিয়মিত বর্ণ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, এটা সত্য। ৯/১১-এর পর এর মাত্রাও বেড়েছে অনেক। তবে আমি মনে করি এজন্য কেবল একতরফাভাবে অন্যদের উপর দোষ না চাপিয়ে নিজেদের কথাও একটু ভাবা উচিত। আজ বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের যে ইমেজ সঙ্কট চলছে, তার জন্য কিছুটা হলেও মুসলিমরাও কি দায়ী নয়? সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ নিয়ে সিডনীর বিভিন্ন আরব মহল্লায় এখন যা ঘটছে সেটার দায় কি মুসলিম কম্যুনিটি এড়াতে পারে? রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির বিবেচনায় অষ্ট্রেলিয়া একটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ দেশ। নিরাপত্তা এবং উন্নত জীবনের সন্ধানেই অধিকাংশ অধিবাসী এই দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। নিজ নিজ দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জাতিগত কলহ এখানে টেনে আনাটা কারো জন্যই শুভকর হবে না। লেখক :সিডনী প্রবাসী প্রকৌশলী