ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি ও প্রশ্নপত্র

দেশে প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহী থাকে তার তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন সংখ্যা খুব সামান্য। ফলে আগ্রহী প্রত্যেককেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ করে দেয়া অসম্ভব। তাছাড়া দেশের সকল কর্মক্ষেত্রের লোকের যোগান দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যও নয়। ফলে যেসব ক্ষেত্রের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক বা শিক্ষিত-প্রশিক্ষিত লোক তৈরি করবে সেই ক্ষেত্রগুলোতে অধ্যয়নে আগ্রহী ও অধিকতর যোগ্য শিক্ষার্থীদেরকে সারা দেশ থেকে বেছে বের করে পড়াশুনার সুযোগ করে দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ এবং সে কারণেই ভর্তি পরীক্ষা কিভাবে হবে সেটা ঠিকমতো নির্ধারণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি পাবলিক এর অসুবিধা করছে কিনা তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। কারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় চলে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পরিবার সন্তানদের একই সাথে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতি ও ছুটোছুটির ভোগান্তি সহ্য করছে। ক্ষতি যে শুধু অভিভাবকদেরই হচ্ছে তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক মেধাবীরা যোগ্য জায়গায় যেতে পারছে না। হয়তো চট্টগ্রামের একজন তুখোড় মেধাবী ফোকলোরে বিশেষ আগ্রহী, কিন্তু দূরত্ব, অর্থসঙ্কট ইত্যাদি কারণে অভিভাবকদের নিরুত্সাহে সে রাজশাহীতে (যেখানে সমৃদ্ধ ফোকলোর বিভাগ আছে) পরীক্ষা দিতে যেতে পারছে না। অথবা ঢাবিতে অল্পের জন্য মনোবিজ্ঞান পায়নি এমন শিক্ষার্থী হয়তো চট্টগ্রামে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পেলে সেখানে মনোবিজ্ঞানে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে যেতো। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, রাজশাহী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের জন্য যদি অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা হয় তাহলে প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক বিভাগই আগের তুলনায় অধিকতর মেধাবীদের পাবে। কারণ সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সহজে পরীক্ষা দিতে পারার কারণে একই আসনের জন্য আগের তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী চেষ্টা করবে। ঢাকার বাসিন্দা সুযোগ পাবে, অথচ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পঞ্চগড়ের বাসিন্দা পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে না এমনটি কম ঘটবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একত্রে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করবে এ বিষয়ে যদি ঐকমত্যে পৌঁছা যায় তাহলে তার পরের সমস্যাটি দাঁড়ায় পরীক্ষা অনুষদভিত্তিক, গুচ্ছভিত্তিক নাকি বিষয়ভিত্তিক হবে। ঢাকা ও জগন্নাথে অনুষদভিত্তিক পরীক্ষা হয়। চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে হয় গুচ্ছভিত্তিক অর্থাত্ কয়েকটি কাছাকাছি ধরনের বিষয় নিয়ে একটি গুচ্ছ (cluster) বানিয়ে সে-গুচ্ছের জন্য একটি পরীক্ষা হয়। জাহাঙ্গীরনগরে গত বছর একটি অনুষদে (কলা ও মানবিকী) বিষয়ভিত্তিক অর্থাত্ প্রতিটি বিষয়ের আলাদা ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে। এর কারণ বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষার জন্য এই অনুষদের বিভাগগুলো থেকে শিক্ষকরা জোর দাবি তুলেছেন। এমনিতে লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে এমসিকিউ করার কারণে জাহাঙ্গীরনগরে শিক্ষার্থীদের গড় মানের ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। অনুষদভিত্তিক এমসিকিউ পরীক্ষা হলে বিভাগগুলোতে আগ্রহী ও যোগ্য শিক্ষার্থী আরো অপ্রতুল হয়ে ওঠবে। সবচেয়ে ভালো হয়, প্রতিটি বিভাগের জন্য আলাদা পরীক্ষা নেয়া গেলে। এর আয়োজনে ঝঞ্ঝাট যদি বেশি হয় তাহলে কিছু কিছু বিষয়কে একত্র করে গুচ্ছ বানানো যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন জরুরী। কারণ এমন কিছু বিষয় আছে যেগুলোকে কোনো গুচ্ছে ফেলা মুশকিল (যেমন, চারুকলা, দর্শন)। এ ধরনের বিষয়ের আলাদা ভর্তি পরীক্ষার আয়োজনের ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হবে। তবে ভর্তি পরীক্ষা সংস্কারের সব উদ্যোগই বৃথা যাবে যদি প্রশ্নপত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা না হয়। প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যে ভর্তি পরীক্ষা হয় তা আসলে শিক্ষার্থীদের গাইড মুখস্থ করার দক্ষতার পরীক্ষা। ভর্তি পরীক্ষা এলেই শিক্ষার্থীরা গাইড কেনা, কোচিং সেন্টারে যাওয়া এসব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে দু:জনক ব্যাপার হল, ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো তৈরি হয় নিতান্ত দায়সারাভাবে। কোনো কোনো প্রশ্ন সে ফ বাজারের গাইড বই থেকে হুবহু তুলে দেয়া হয়েছে বলে মনে হয়। অথচ এই প্রশ্নপত্রই হচ্ছে সেই ছাঁকনি যা দিয়ে লক্ষ লক্ষ ছেলে-মেয়েদের মধ্য থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য সবচেয়ে উপযুক্তদের তুলে আনা সম্ভব। আমেরিকার প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্ডারগ্রেডে ভর্তির জন্য আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নেয় না। আমেরিকান বা অ-আমেরিকান যে কোনো শিক্ষার্থী আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাইলে তাকে স্যাট (SAT) পরীক্ষা দিতে হবে। তার মানে এদেশে আমরা প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা ভর্তি পরীক্ষা বাদ দিয়ে সাধারণ যে পরীক্ষার কথা চিন্তা করছি তা নতুন কিছু নয়। ইউরোপের অনেক দেশে অবশ্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে এটা সম্ভব তার কারণ, আমাদের মতো মাদ্রাসা-ইংরেজি মাধ্যক-সাধারণ নিয়ে ত্রিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের নেই এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার গুণগত মান তারা নিশ্চিত করতে পেরেছেন (সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির কারণে কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে যেতে আমাদের আরো সময় লাগবে)। তাছাড়া ওসব দেশে উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহীদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক আসন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আছে। স্যাট, টোফেল, আইইএলটিএস, জিআরই ইত্যাদি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ঘাঁটলে বোঝা যায়, বহু লোকের বহু বছরের গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনা রয়েছে এগুলোর পেছনে। অথচ আমাদের দেশে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয় পরীক্ষার অল্প ক’দিন আগে, খুব তড়িঘড়ি করে এবং যথোপযুক্ত মনোযোগ ও চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই। ভর্তি পরীক্ষার ধরন নিয়ে পরিকল্পনা ও গবেষণা শুধু পরীক্ষার আগের সময়টাতে নয়, সারা বছর ধরেই চলতে হবে। প্রশ্নপত্রের প্রত্যেকটি প্রশ্ন এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন শিক্ষার্থীর বিশেষ কয়েকটি যোগ্যতা যাচাই হয়। এগুলো হচ্ছে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দখল, যৌক্তিক ও বিমূর্ত চিন্তার ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। ভর্তি পরীক্ষার অধিকাংশ প্রশ্নপত্রেই বাংলা-ইংরেজি অংশ থাকে। বাংলা অংশে সাধারণত “কোনটি সংস্কৃত উপসর্গ?” বা “কবি সুধীন্দ্রনাথের জন্মস্থান কোনিট?” এ জাতীয় প্রশ্ন থাকে। কিন্তু এসব মুখস্থনির্ভর, গাইডমুখী প্রশ্নের সাহায্যে বাংলা ভাষায় শিক্ষার্থীর দক্ষতা যাচাই হয় না। তাই ভালো বাংলা বই থেকে অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে কিংবা নতুন অনুচ্ছেদ রচনা করে তার উপর প্রশ্ন তৈরি করতে হবে। ইংরেজি অংশেরও অনেকটা জুড়ে থাকা উচিত এক বা একাধিক অনুচ্ছেদ (passage) ও সেগুলোর উপর প্রশ্ন। এতে শিক্ষার্থীর পঠন দক্ষতা (reading skill) যাচাই হবে চমত্কারভাবে। একজন শিক্ষার্থী গাইড নাকি ভালো বই পড়ে অভ্যস্ত তাও ধরা পড়বে অনুচ্ছেদভিত্তিক প্রশ্নের মাধ্যমে। এছাড়া বাংলা ও ইংরেজি অংশে অসম্পূর্ণ বাক্য সম্পূর্ণকরণ (sentence completion), শুদ্ধ বা অশুদ্ধ বাক্য চিহ্নিতকরণ ইত্যাদি ধরনের প্রশ্ন রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য একসাথে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ তৈরি করা, প্রয়োজন মতো গুচ্ছভিত্তিক ও বিভাগভিত্তিক পরীক্ষা নেয়া এবং প্রশ্নপত্রের উচ্চমান নিশ্চিত করা গেলে আশা করা যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের পাবে। আর এ শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজেদের সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাবে। লেখক :শিক্ষক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়