দেওয়াল লিখন ও পোস্টার নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রয়োগ

দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১২-এর ৩ ধারায় বলা হইয়াছে, ‘ধারা ৪ অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোন স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে না’। কিন্তু কে শোনে এই কথা? এখন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানোর হিড়িক পড়িয়া গিয়াছে। এই আইনের ৯ নং ধারা (বিশেষ বিধান) অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচন প্রচারণা সংক্রান্ত দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে। কিন্তু আগামী দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের তফসিল যেহেতু ঘোষণা করা হয় নাই, তাই উপরোক্ত উপায়ে এখনকার প্রচার-প্রচারণার কোন বৈধতা নাই। এই আইনে দেওয়াল লিখন বলিতে বোঝানো হইয়াছে যে, কোন উদ্দেশ্যে, যে কোন রং-এর কালি বা চুন বা কেমিক্যাল দ্বারা, দেওয়াল বা যানবাহনে কোন লিখন, মুদ্রণ, ছাপচিত্র বা চিত্র অংকন করা। আর কাগজ, কাপড়, রেক্সিন বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমসহ যে কোন মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত প্রচারপত্র, প্রচারচিত্র, বিজ্ঞাপনপত্র, বিজ্ঞাপনচিত্র; এবং যে কোন ধরনের ব্যানার ও বিলবোর্ড পোস্টারের অন্তর্ভুক্ত। তাই বর্তমানে আগামীর নির্বাচনকে সামনে রাখিয়া বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে যে সব দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো হইতেছে তাহার কোন আইনগত ভিত্তি নাই। উপরোক্ত আইনের লক্ষ্য হইল বিশেষত নগরীর সৌন্দর্য রক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা বিধান। গত বত্সর ২০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে এই আইনটি পাস হয়। কিন্তু আইনটির কার্যকারিতা না থাকার কারণে এখন পর্যন্ত ইহা ‘কাগুজে আইন’ হইয়াই পড়িয়া আছে। একবারের জন্যও এই আইনটির প্রয়োগ হয় নাই বলিয়া জানা গিয়াছে। ইহা এই আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞার শামিল। এমনকি সরকার নিজেও এই ধরনের আইন অবজ্ঞা করিবার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইয়াছে বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। আসলে সরকার ও বিরোধী দল কেহ এই আইনটি মানিতেছেন না। যদি আইন মান্য না করা হয়, তাহা হইলে শুধু শুধু কষ্ট করিয়া সংসদে আইন প্রণয়নের কি অর্থ হইতে পারে। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার সর্বত্র পোস্টার-ব্যানার ও দেওয়াল লিখন চোখে পড়িতেছে। সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আদালত ভবন, বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন দেওয়াল কোনকিছুই বাদ যাইতেছে না। বিশেষ করিয়া নির্বাচনী ব্যানারে ব্যানারে ছাইয়া গিয়াছে রাজপথের সকল মোড়। যেন নির্বাচন না আসিতেই আসিয়া গিয়াছে নির্বাচন। ইহা হইতে বাদ যায় নাই বিদ্যুতের খুঁটি, লাইটপোস্ট, রাস্তার পার্শ্ববর্তী গাছগুলিও। গাছের উপর পেরেক ঠুকিয়া সাঁটিয়া দেওয়া হইতেছে লোহা ও টিনের বিভিন্ন সাইনবোর্ড। সেই সঙ্গে একজনের লিখা মুছিয়া অন্য পক্ষের লিখা, এক পোস্টারের উপর আরেক পোস্টার সাঁটানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতাও দৃষ্টিগোচর হইতেছে। আইনত ইহাও দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন অমান্যের জন্য ধারা ৬ অনুযায়ী অন্যূন পাঁচ (৫) হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব দশ (১০) হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ, অনাদায়ে অনধিক ১৫ (পনের) দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান আছে। ধারা ৫ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজ খরচে দেওয়াল লিখন বা ক্ষেত্রমতে পোস্টার মুছিয়া ফেলা কিংবা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। উল্লেখ্য, এই আইনের অকার্যকারিতা সম্পর্কে ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রী বলিয়াছেন যে, ইহার বাস্তবায়নে কিছু কারিগরি অসুবিধা রহিয়াছে। বিশেষত ভ্রাম্যমাণ আদালতে জনবল সংকট থাকায় সমস্যা হইতেছে বেশি। এইজন্য আরও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজন। আইনটি কার্যকর করিবার কথা স্থানীয় সরকার ও জেলা প্রশাসনের। তাহাদের এই ব্যাপারে সক্রিয় হইতে হইবে। বস্তুত, যত্রতত্র দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানোর প্রবণতা আমাদের উপমহাদেশের সর্বত্র বিরাজমান। ব্যক্তিমালিকানাধীন অনেক বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানোর ক্ষেত্রে সৌজন্যতা স্বরূপ অনুমতিও নেওয়া হয় না। ইহাতে তাহার বাড়ির বা ভবনের সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হয়, তেমনি তাহা সংস্কার করিতে গিয়া খরচও বাড়িয়া যায়। আমেরিকা-ইউরোপে এই প্রবণতা কদাচিত্ দেখা যায়। তবে ইস্ট লন্ডনে যেহেতু উপমহাদেশের লোকজন অধিক হারে বসবাস করেন, তাই সেখানেও এই নেতিবাচক সংস্কৃতির প্রচলন আছে। আসলে এরূপে যত্রতত্র দেওয়াল লিখন ও পোস্টার সাঁটানোর মাধ্যমে এক ধরনের আত্মপ্রচারের প্রচেষ্টা চলে বেশি। অশিক্ষা ও রুচির অভাবই ইহার মূল কারণ। যাহারা নিজ যোগ্যতা ও কর্মের গুণে মানুষের হূদয় জয় বা দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারেন না, তাহারা এই ধরনের প্রচার-প্রপাগান্ডাকে অধিক গুরুত্ব দিয়া থাকেন। সত্যিকারের বিবেকমান ও সভ্য মানুষ তাহাদের চিনিতে কখনও ভুল করেন না।