খাদ্যের অপচয় বনাম ক্ষুধার রাজ্যে গদ্যময় পৃথিবী

ক্ষুধার প্রশ্নে এই বিশ্বের বিপ্রতীপ চিত্র আমাদের মর্মে পীড়া দেয় বটে। আমরা দেখিতেছি, মুদ্রার এক পৃষ্ঠে ফি বত্সর বিশ্বে উত্পাদিত খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশের অপচয় হইতেছে, অন্যপিঠে ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়! শুধু তাহাই নহে, ইহাতে বিশ্বের একুনে অর্থনৈতিক ক্ষতি হইতেছে ৭৫ হাজার কোটি ডলার—যাহা আমাদের মুদ্রায় প্রায় ৬০ লাখ কোটি টাকা! জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সমপ্রতি এইরূপ তথ্যই প্রকাশ করিয়াছে। সংস্থাটি জানাইয়াছে, প্রতি বত্সর বিশ্বজুড়ে অপচয় হওয়া খাদ্যের পরিমাণ ১৩০ কোটি টন, যাহা কিনা সাহারা নিম্নবর্তী সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ জুড়িয়া উত্পাদিত খাদ্যের সমান। একদল অতিভোজী এবং অপচায়কারী মানুষ যখন ফেলাইয়া ছড়াইয়া নষ্ট করিতেছে লাখ লাখ টন খাদ্য, তখন আমরা বিমর্ষ হই এই কথা জানিয়া যে—পৃথিবীর প্রতি সাতজনের একজন ঘুমাইতে যায় ক্ষুধার্ত পেটে। ফি বত্সর পাঁচ বত্সরের কমবয়সী বিশ হাজার শিশু জঠরের বহ্নিজ্বালা সহ্য করিতে না পারিয়া বিকশিত হইবার পূর্বেই মায়া ত্যাগ করিতে বাধ্য হয় এই পৃথিবীর; প্রতি দশজন নারীর ভিতরে সাতজনই ভোগেন অপুষ্টিজনিত রক্তাল্পতায়! অর্থাত্, আমরা বাঁচিয়া রহিয়াছি এমন এক প্রাচুর্যময় দুনিয়ায় যেখানে খাদ্য উত্পাদন চাহিদাকে ছাপাইয়া যাওয়া সত্ত্বেও ৮৭ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগিতেছে, শৈশবের বৃদ্ধিহীনতা যেখানে নীরবে সর্বব্যাপী রোগের চেহারা লইতেছে। দেখা গিয়াছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলি খাদ্যগ্রহণের প্রক্রিয়ায় অপচয় করিয়া থাকে। অর্থাত্ বিষয়টি মানসিকগত এক ধরনের অভ্যাস। আর উন্নয়নশীল দেশগুলি ফসলের মাঠেই তাহার একটি অংশ নষ্ট করিয়া আসে। অথচ এই নষ্ট হওয়া খাদ্য উত্পাদন করিতে গিয়া ব্যবহার হয় বিশ্বের কৃষি জমির ৩০ শতাংশ। খাদ্য অপচয়ের নেপথ্যে রহিয়াছে শিল্পোন্নত বাজারনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও। ফসলের বাজারমূল্য পতনের আশঙ্কায় প্রায়শই উত্পাদিত ফসলের একটা বৃহত্ অংশ জমিতেই ফেলিয়া রাখা হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ব্রিটেনে দাম ধরিয়া রাখিতে উত্পাদিত সবজির ৩০ শতাংশ কখনোই জমি হইতে তোলা হয় না। উন্নত বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই এই ব্যবস্থা দৃশ্যমান। মার্কিনমুলুকে খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ ১৯৭৪ সালের নিরিখে বৃদ্ধি ঘটিয়াছে ৫০ শতাংশ। এক গবেষণায় জানা গিয়াছে, সারা বত্সর মার্কিনীরা যে পরিমাণ খাদ্য অপচয় করিয়া থাকে, তাহা দিয়া ২০০ কোটি মানুষকে সারা বত্সর ভরপেটে খাওয়ানো সম্ভব। তবে খাদ্য অপচয়ের অন্য চেহারা রহিয়াছে উন্নয়নশীল তৃতীয় দুনিয়ায়। খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও সঞ্চয়ের আধুনিকতর উন্নত প্রযুক্তির অভাবই মূলত তৃতীয় দুনিয়ার খাদ্য অপচয়ের প্রধান কারণ। শুধু এই কারণেই বত্সরে নষ্ট হয় ২০-৩০ শতাংশ ফসল। নষ্ট খাদ্যের আরও একটি ভয়ঙ্কর দিক রহিয়াছে। খাদ্য উত্পাদন প্রক্রিয়ায় নির্গত হয় বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের ৩০ শতাংশ। তাহা ছাড়া পৃথিবীর সামগ্রিক নষ্ট হওয়া খাদ্যের পরিমাণ মোট উত্পাদিত দানাশস্যের অর্ধেকেরও বেশি। প্রতি বত্সর ৩৩০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়, যাহার অবস্থান রহিয়াছে কার্বন নির্গমনে শীর্ষ দুই দেশ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। সুতরাং শিল্পোন্নত দেশের ভোক্তারা অনেক বেশি খাবার ক্রয় করিয়া এবং তাহার বৃহদাংশ না খাইয়া ফেলিয়া দেওয়ার মূল্য শুধু ডলারেই শেষ হইয়া যায় না। পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখিতে আগামী প্রজন্মের কাছে বিশ্বের সকল মানুষের দায়ভার রহিয়াছে। খাদ্যের অপচয় রোধ করিয়াও সেই দায়ভার কিছুটা পালন করা যায়।