ইগো বনাম স্বাস্থ্য, সম্পদ ও ক্ষমতা
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:২৪
আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের নাম আমরা অনেকেই শুনেছি। ৩৩৬ বিসিতে (ইঈ) প্রাচীন গ্রীকের এই সম্রাট মাত্র ২০ বছর বয়সে তাঁর বাবার এসাসিনেশনের পর উত্তরাধিকার সূত্রে রাজা বনে যান। তাঁর আগে ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর প্রাইভেট টিউটর ছিলেন বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক ও লজিসিয়ান অ্যারিস্টেটল। ৩০ বছর বয়সে আলেকজান্ডার সে সময় প্রাচীন পৃথিবীর অধিকাংশই জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যুদ্ধ, ক্ষমতা, সম্পদ এসব-ই ছিল তাঁর জীবনের এক একটি অধ্যায়। যেহেতু তিনি বয়সে তরুণ ছিলেন তাই স্বাস্থ্যও যে মন্দ ছিল তা নয়। তবুও যুদ্ধের ক্লান্তি ও জীবনীশক্তির নিঃশেষতা তাঁকে আটকে দেয়। যুদ্ধশেষে তাঁর প্রিয় শহর এথেন্সে (গ্রীস) ফেরার পথে বেবিলন (ইরাক) শহরে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে এই গ্রেটের মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর প্রাণপ্রদীপ নিভু নিভু হওয়ার আগে পৃথিবীর প্রায় সব বড় ডাক্তার তাঁকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। জীবন বাঁচানোর জন্য তাঁরা কোন আশার বাণীই তাঁকে শোনাতে পারেননি। অবশেষে মৃত্যু যখন অবধারিত ও মুখোমুখি, তখন মৃত্যুশয্যায় থেকে তিনি তাঁর জেনারেলদেরকে কাছে ডেকে নিয়ে সমনজারি করলেন। মৃত্যুর পর তাঁর তিনটি শেষ ইচ্ছা যেন পূরণ করা হয়। শেষ ইচ্ছা তিনটি ছিল- ১. সবচেয়ে সেরা ডাক্তাররা যেন তাঁর মরদেহ কফিনে করে সমাধিস্থল পর্যন্ত বহন করে নিয়ে যায়, ২. অর্থ, স্বর্ণ ও অত্যন্ত মহামূল্যবান পাথরসহ বিপুল সম্পদ ভাণ্ডার তিনি এতদিন যা জমা করে রেখেছেন তাঁর সেই সম্পদের সবই যেন রাস্তা থেকে তাঁর সমাধিস্থল পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে দেয়া হয়, ৩. যে কফিনে করে তাঁকে সমাধিস্থলে নিয়ে যাওয়া হবে সেই কফিনের দু’পাশে তাঁর হাত দুটি যেন এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয় যাতে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো সকলেই তাঁর ওই ঝুলন্ত খালি হাত দুটি পরিষ্কারভাবে দেখতে পারে।
তাঁর এই সমনজারি সমাপ্ত হলে জেনারেলদের মধ্য থেকে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জেনারেল অতি আশ্চর্য হলেন আলেকজান্ডারের এই অস্বাভাবিক ও উদ্ভট ধরনের অনুরোধগুলো শুনে। বেচারা জেনারেল কোনভাবেই আলেকজান্ডারের শেষ ইচ্ছাগুলোর কারণ বুঝতে পারলেন না। কান্না ভেজা চোখে তিনি আলেকজান্ডারের হাতে কিস করে বিনীতভাবে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘ম্যাজেসটি, আপনার আদেশ যথাযথ ভাবে পালন করা হবে। কিন্তু আপনি কি আমাদেরকে একটু বুঝিয়ে বলবেন যে কেন আপনার শেষ ইচ্ছা বা উইশগুলো এভাবে পালন করতে বলছেন’? দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেবার পর আলেকজান্ডার বললেন যে, এইগুলো তোমাকে বুঝিয়ে বলার জন্য এখন যতটুকু নিঃশ্বাস থাকা প্রয়োজন আমার শরীরে, তা হয়তো আর নেই আমার। তবে সংক্ষেপে বলি- শোনো। ১. শ্রেষ্ঠ ডাক্তারদের দ্বারা আমার মরদেহ কফিনে করে বহন করতে বলেছি শুধু এইটা বুঝানোর জন্য যে, মানুষ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হয় পৃথিবীর এমন কোনো সেরা চিকিত্সক নেই যে তাঁর সেই মৃত্যুযাত্রাকে আর ঠেকিয়ে দিতে পারে, ২. আমি আমার মহামূল্যবান সম্পদ ভাণ্ডারগুলো রাস্তা থেকে সমাধি পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে বলেছি, কারণ সবাই যেন দেখে এবং অনুধাবন করতে পারে যে পৃথিবীতে যা কিছু সম্পদ অর্জিত হয় তার সবকিছুই পৃথিবীতে রয়ে যায়, ৩. আমি আমার হাত দুটি কফিনের দু’পাশ দিয়ে ঝুলিয়ে রাখতে বলেছি কারণ মানুষ যেন বুঝতে পারে যে, পৃথিবীতে আমরা যেমন খালি হাতে আগমন করি, ঠিক তেমনি খালি হাতেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাই।
ইগো মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। হয়তো আলেকজান্ডারকেও। ক্ষমতার সাধ সে সময় তাঁকে মাতিয়ে তুলেছিল। যুদ্ধ ও দখল করতে করতে তিনি প্রাচীন পৃথিবীর প্রায় সবই তাঁর আওতার মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন। আইওনিয়ান সাগর (বর্তমানে ইতালি ও গ্রীসকে সংযোগ করেছে) থেকে হিমালয় পর্যন্ত সবই তাঁর দখলে ছিল। যদিও সে সময় পৃথিবীর অনেক অংশ অজানা ছিল, যেমন বর্তমান আমেরিকা তখনো আবিষ্কৃত হয়নি। আলেকজান্ডার ইন্ডিয়াতেও প্রবেশ করেছিলেন, তবে ইন্ডিয়া বিজয় (Conquer) করতে পারেননি, বর্ডার থেকে ফিরে এসেছিলেন। শুধু যুদ্ধ, যুদ্ধ আর যুদ্ধ। আরো সম্পদশালী হওয়া, বড় থেকে আরো বড় হওয়া, ক্ষমতা থেকে আরো ক্ষমতাধর হওয়া- এসবের পিছনে ছুটতে ছুটতে এই ৩৩ বছর বয়সে তাঁর সব জীবনীশক্তিই তিনি নিঃশেষিত করেছিলেন। তাই তাঁর ক্লান্তি এসেছিল। যুদ্ধের প্রতি এক সময় তাঁর ঘৃণাও এসেছিল। তিনি বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলেন। তাই যুদ্ধশেষে ফিরছিলেন তাঁর প্রিয় শহর এথেন্সে। সে আশা তাঁর আর পূর্ণ হয়নি। এথেন্স থেকে মাত্র ২৪ ঘণ্টার পথ বাকি থাকতে বেবিলন শহরে এসে তাঁর মৃত্যু হয়। অথচ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই ব্যক্তি আর মাত্র ২৪ ঘণ্টা তাঁর মৃত্যুকে ধরে রাখতে পারেননি। শুধু কি তাই? তিনি তাঁর মায়ের নিকট শপথ করে বলেছিলেন যে, যেদিন সে এই পুরো পৃথিবীকে জয় করতে পারবেন সেদিন গোটা পৃথিবীটাই তাঁর (মায়ের) পায়ের নিকট এনে সমর্পণ করবেন- তাঁর (মা’র) উপহার হিসাবে। তাও আর হয়নি। তিনি বেবিলনে এসে নিজেকে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সাহায্যহীন একজন ব্যক্তি হিসাবে অনুভব করতে লাগলেন। আশেপাশে থাকা সেরা চিকিত্সক, বিপুল সম্পদ, ক্ষমতা- কিছুই তাঁক আর ২৪ ঘণ্টার জন্য বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি। এথেন্সে আর তাঁর পৌঁছা হলো না।
ইতিহাসে এরূপ অনেক ঘটনা রয়েছে যা মনকে নাড়া দেয়। কখনো সেগুলোকে কষ্টের মনে হয়, নিষ্ঠুর মনে হয়। তবে তা পরম সত্য। ইতিহাস শুধু আমরা পড়তে ভালোবাসি, শিক্ষা নেই না, মেনে চলি না। কারণ- আমাদের ইগো। আর এই ইগোর মূলে থাকে অর্থকড়ি, সম্পদ, ক্ষমতা। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা নিকট অতীতে কি দেখতে পাচ্ছি? ইগোর ঠেলাঠেলি, ক্ষমতায় আঁঁকড়ে থাকার মানসিকতা, বিপুল অর্থের বা সম্পদের পাহাড় গড়া। জনগণের যে ভোট দেবার অধিকারটুকু রয়েছে, সেটাকে নিয়েও হয় টানাটানি ও নানান ছলছুঁতো এবং আইনের ফাঁক ফোকরের মধ্যে সেই অধিকারকে গ্যাঁড়াকলে ফেলে দিয়ে হনন করার চেষ্টা। বর্তমানে দেশে সামনে একটি জাতীয় নির্বাচন অপেক্ষা করছে। এই নির্বাচনটিও একটা গ্যাঁড়াকলের মধ্যে আটকা পড়ে অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলছে। যার মূলে রয়েছে ইগো। অতীতেও নির্বাচনের আগে এ ধরনের ইগো আবির্ভূত হয়েছিল যার ফলাফল অবশ্য ভাল হয়নি, বরং ফলাফল ইগো বহনকারীদের বিপক্ষে গিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইগো সমস্যাটি যাদের মধ্যে রয়েছে তাঁদেরকে আমরা মোটামুটিভাবে সবাই কমবেশি জানি ও চিনি। বাংলাদেশের দুর্বল গণতন্ত্রে কারো কারো ইগো সমস্যাটি প্রবল থাকলেও তাঁদেরকে আমরা এখনো সম্মান দিয়ে থাকি। কারণ গণতন্ত্র দুর্বল হলেও যাতে একেবারে নস্যাত্ হয়ে না যায় সে ভয়ে। যা অতীতে দু’একবার হয়েছিল এবং উঁকিও মেরেছিল।
৩৩৬ বিসিতে আলেকজান্ডারের ইগো সমস্যাটি থাকলেও তা অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ তখন প্রাচীন পৃথিবীতে শক্তির মোহরা ছিল। যাঁর যত শক্তি তাঁর তত দখল। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে ইগো সমস্যাটি একেবারেই বেমানান। কারণ বর্তমান পৃথিবীতে সকালের সূর্য যতগুলি দেশের উপরে তার আলোয় উদিত করে তার অধিকাংশই হচ্ছে গণতান্ত্রিক দেশ-যেখানে জনগণই মূলশক্তি। আর যে দেশগুলো এখনো রাজতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিকতার বেড়াজালে ঘুরপাক খাচ্ছে, তারাও যথেষ্ট চাপের মধ্যে রয়েছে। রাজার ছেলে রাজা হবে, দেশ চালাবে, আগের সেই পরিবারতান্ত্রিক কালচার থেকে পৃথিবী অনেকটায় বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে এবং এখনো বের হয়ে আসতে চাইছে। গণতন্ত্রের বিকশিকতার স্বার্থে বাংলাদেশের এ এবং বি দল দুটিরও সেই চিন্তাটি বিবেচনায় রাখতে হবে। এ এবং বি দল দুটি বেশ কিছুকাল যাবত্ যে ইগো সমস্যায় ভুগছেন, তা কাটিয়ে উঠা অত্যন্ত জরুরি। গণতন্ত্র শুধু পরিবারের মধ্যে আটকে থাকা নয়, এটি থাকবে জনগণের মধ্যে। আর জনগণের কথা, গণতন্ত্রের কথা বিবেচনায় নিলে জনগণের ভোট দেবার স্বচ্ছ অধিকারটি সর্বপ্রথমেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ইগোকে যত দূরে রাখা যাবে গণতন্ত্রের সূর্যের আলো তত শোভা পেতে থাকবে।
লেখক :যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত
alamrowshon¦gmail.com