দায়িত্বহীন মন্তব্য প্রত্যাশিত নহে
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৪
সমপ্রতি একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা জনসম্মুখে মন্তব্য করিয়াছেন, ‘ আমি ভোট চাইতে আসিনি। অবৈধ ভোট রুখতে এসেছি।’ সেই সঙ্গে তিনি তাহার ভাষায় ‘আগামীর পাতানো নির্বাচন’ প্রতিরোধের সর্বাত্মক আহব্বান জানাইয়াছেন। কিন্তু যে ভাষায় তিনি রুখিয়া দেওয়ার কথা বলিয়াছেন তাহাতে শেষপর্যন্ত রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ও শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করিবার শামিল। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যকার পার্থক্য আমরা বুঝিলেও রাষ্ট্র কোন ব্যক্তি নহে। রাষ্ট্র পরিচালনায় কোন না কোন ধরনের সরকারের দরকার পড়ে। আর সরকার মানে ব্যক্তির অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং যখন নির্বাচন প্রতিরোধের প্রশ্ন আসে, তখন একই সঙ্গে এই রাষ্ট্রীয় শক্তিকেও চ্যালেঞ্জ জানানো হয়। কিন্তু আমাদের জানা উচিত শেষপর্যন্ত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কেহ লড়াই করিয়া জয়ী হইতে পারেন না। যদি বিভক্ত জনমত থাকে, তাহা হইলে তো তাহা আরও অসম্ভব। তাই রাষ্ট্রের শক্তি সম্পর্কে সকলের সচেতন হওয়া দরকার। সত্তর দশকে সিরাজ শিকদার কার্যত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার শেষ পরিণতি ভাল হয় নাই। এইজন্য আমরা মনে করি, আমি বা আমরা নির্বাচনে যাইব না এই কথা বলা যত সহজ, আমি বা আমরা নির্বাচন হইতে দেব না ইহা বলা তত সহজ নহে। তাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্র-পশ্চাত্ বিবেচনা করিয়াই কথা বলা উচিত।
অন্যদিকে যিনি বলিতেছেন যে আগামীর সাধারণ নির্বাচন বিদ্যমান সংবিধানের আলোকেই হইবে, তাহার কথার যৌক্তিকতা নিয়াও ভাবিয়া দেখা দরকার। কোন শক্তি বলে বা যাদুমন্ত্রে তিনি ইহার পক্ষে অনড় অবস্থান গ্রহণ করিয়াছেন তাহাও গভীরভাবে চিন্তা করিয়া দেখা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নির্বাচন করিয়াছেন ১৯৭৯ সালে। তিনি বিরোধী দলের সহিত সব ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করিয়া নির্বাচন করেন নাই। যদিও সেই সময় আব্দুল মালেক উকিল ও মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন উভয় আওয়ামী লীগই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করেন ১৯৮৬ সালে। তিনিও সবার কথা চিন্তা করিয়া নির্বাচন করেন নাই। তাহার আমলে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করিলেও সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়া যায়। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফ্রেব্রুয়ারি বিএনপি রাজনৈতিক আন্দোলনের ডামাডোলের মধ্যেও জাতীয় সংসদের নির্বাচন আয়োজন করে। এই সময় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও সবার কথা শুনিয়া নির্বাচন করেন নাই। এই নির্বাচন বিতর্কিত হইলেও আওয়ামী লীগ তাহা প্রতিহত করিতে পারে নাই। তাই এখন যাহারা ক্ষমতাসীন তাহারা যদি বিরোধী দলের সহিত সবকিছু আলাপ-আলোচনা করিয়া নির্বাচন আযোজন না করেন, তাহা হইলে তাহা রুখিয়া দেওয়া কি সম্ভব হইবে?
তবে বর্তমান সরকার এখনকার মনোভাব অনুযায়ী প্রধান বিরোধী দলকে বাদ দিয়া নির্বাচন করিলেও তাহা কতদিন টিকিবে তাহাও বিবেচ্য বিষয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পর মেয়াদের শেষপ্রান্তে আসিয়া এরশাদ সরকারের শোচনীয় পতন হয় গণআন্দোলনের মুখে। আর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাত্র ১৫ দিরে মাথায় নূতন সরকার ভাঙিয়া দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে সবকিছুই নির্ভর করে জনমতের উপর। আর এখনকার সরকারের দৃঢ় মনোভাবের প্রাণভোমরা কোথায় তাহাও চিহ্নিত করিতে হইবে। অতএব, রুখিয়া দেওয়ার ন্যায় শব্দ উচ্চারণ না করাই বাঞ্ছনীয়। তাহাছাড়া ইদানিং জোর গলায় এই কথাও বলা হইতেছে যে, সংবিধান সংশোধন করিয়া তত্ত্বাবধায়ক বিল পাস করা না হইলে পালানোর পথ খুঁজিয়া পাইবে না সরকারি দল। আমাদের প্রশ্ন হইল, এইভাবে বলা হইতেছে কেন? শুধু জনসমর্থন আদায়ের জন্য না হতাশা হইতে এইরূপ কথাবার্তা এমনিতেই জবানে চলিয়া আসিতেছে? একই সঙ্গে এই কথাও বলা হইতেছে যে, তাহারা ক্ষমতায় গেলে কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করিবেন না। ইহা পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক মন্তব্য নয় কি? সরকারের সহিত কে বা কাহারা আছেন তাহা বড় কথা নহে। আবার বিরোধীরা কোন পরশ পাথরের দেখা পাইয়াছেন তাহাও বিবেচ্য নহে। কথা হইল, পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা যত কম বলা যায়, ততই উত্তম।
আমাদের বক্তব্য হইল, এমন কথাবার্তা বলা সংগত নয় এবং এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা উচিত নয় যাহাতে তাহারা ক্ষমতাসীন হইলে বা ক্ষমতাহারা হইলে আবার ঐ একই পরিবেশ-পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অতএব, ভাষা প্রয়োগের ব্যাপারে সকলেরই সচেতন থাকা উচিত। বিশেষত যাহারা দায়িত্বশীল পদে আসীন তাহাদের কথা-বার্তা, চাল-চলন এমনকি আচার-আচরণে মাত্রাজ্ঞান থাকা আবশ্যক। কেননা তাহাতে অনেক লোকের ভাল-মন্দ জড়িত থাকে।