নরেন্দ্র মোদী যখন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৫
গত জুনে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদী যখন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রচার সমিতির প্রধান নির্বাচিত হইলেন তখনই দলের প্রবীণ নেতাদের অনেকে বিব্রত বিচলিত বোধ করিতে ছিলেন। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে এই হিন্দুত্ববাদী নেতাই যে বিজেপি’র মধ্যমণি হইয়া উঠিবেন তাহা বেশ বুঝিতে পারা যাইতেছিল। সেই অবস্থায় অভিমান ক্ষুব্ধ প্রবীণ নেতা আদভানি পদত্যাগই করিয়া বসিলেন। পরে অবশ্য দলের কর্মী সমর্থক, বিশেষ করিয়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএমএম) চাপের মুখে তিনি তাহার ইস্তফাপত্র প্রত্যাহার করিয়া নেন। মোদীর উত্থানে ভারতের সুশীল সমাজেরও কেউ কেউ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়াছিলেন। নোবেল লরিয়েট অমর্ত্য সেন প্রকাশ্যেই হতাশা ব্যক্ত করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজেপি নরেন্দ্র মোদীকেই দলের পক্ষ হইতে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়াছে।
বিজেপির তরফ হইতে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে নরেন্দ্র মোদীর নাম ঘোষিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ও বিদেশেও আলোচনা এবং সমালোচনার ঝড় উঠিয়াছে। এইদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর বলিয়াছে যে, ভারত কিংবা অন্যকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে তাহাদের কিছু বলিবার নাই। তবে, নরেন্দ্র মোদীর মার্কিন ভিসা পাইবার ব্যাপারে তাহাদের আগের নীতির কোনো পরিবর্তন হয় নাই বলিয়া জানাইয়াছেন দেশটির পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র ম্যারি হার্ফ। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ও ন্যাশনালিটি এ্যাক্ট অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টিকারী বিদেশী কোনো সরকারি কর্মকর্তা ভিসা পাইতে পারেন না। স্মরণযোগ্য যে ২০০৫ সালে মার্কিন কনস্যুলার বিভাগ মোদীর কূটনৈতিক ভিসার আবেদন নাকচ করিয়া দিয়াছিল। ইহার আগে ২০০২ সালে গুজরাটে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ হারান প্রায় ৩ সহস্র মানুষ। সেই দাঙ্গার জন্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেই দায়ী করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০০৫ সালে মোদীর কূটনৈতিক ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। তবে, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে মুথপত্র এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, মি. মোদি নূতন করিয়া আবেদন করিতে চাহিলে স্বাগতম। কিন্তু, আবেদনের পর তাহাকে নিয়ম অনুযায়ী যাচাই-বাছাইয়ের জন্য অপেক্ষা করিতে হইবে। ভিসা পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হইবে যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বলিবার নাই; এই রকম বাণী দেওয়া হইলেও নরেন্দ্র মোদীর ভিসা প্রসঙ্গে যাহা বলা হইল, তাহাতে বার্তাটি কিন্তু পরিষ্কার। অতঃপর বিজেপির এই নেতার ব্যাপারে ওয়াশিংটনের কোনো রিজার্ভেশন নাই, তাহা বলা যায় না। সে যাহাই হউক, বাস্তবতা হইল রাজনৈতিক সংগ্রাম-সাধনার মধ্যদিয়া তিনি প্রাদপ্রদীপের আলোয় চলিয়া আসিয়াছেন। আগামী সাধারণ নির্বাচনে, ভারতবাসী কোন্ দিকে, কারপক্ষে ম্যান্ডেট দিবেন— তাহা এখনই বলা যায় না। তবে, পর্যবেক্ষকমহল মনে করিতেছেন যে, সেইখানে পরিবর্তনের হাওয়া বহিতে শুরু করিয়াছে। ২০০২ সালে গুজরাটের রক্তকাণ্ডের পর বিজেপির জনপ্রিয়তা হ্রাস পাইয়াছিল দারুণভাবে। কিন্তু এক্ষণে ইউপিএ সরকারের শাসনামলে দুর্নীতি, প্রশাসনিক বিশৃংখলা তথা সুশাসনের অভাব ইত্যাদি প্রশ্ন সামনে চলিয়া আসিয়াছে। পক্ষান্তরে নরেন্দ্র মোদীর মত স্বনির্মিত নেতার ব্যক্তিগত সাধুতা এবং ধর্মানুরাগ জনমতের উপর প্রভাব রাখিয়া যাইতেছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। হতদরিদ্র চা বিক্রেতার ঘরে জন্ম নেওয়া এবং নিজেও সেই কাজ করিয়া যিনি জীবন শুরু করিয়াছেন তিনি আজ দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তিনি সফল বলেই মনে করেন তার সমর্থকরা। গত একদশকে গোটা ভারতের মধ্যে, বলা হইয়া থাকে গুজরাটই সবচাইতে বেশি উন্নতি করিয়াছে। সেই কৃতিত্বের ভাগিদার নরেন্দ্র মোদী তো বটেই। প্রবীণ আদভানি ১৯৯০ সালে পৌরাণিক নায়ক রামচন্দ্রের নামে ভারতের রাজনীতিতে যে ঝড় তুলিয়াছিলেন সেইখানেও সঙ্গে ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। সেই সময়ে আদভানির মত মোদীও চাইতেন হিন্দু ভারত। এখন নাকি তিনি চান সুশাসিত ভারত। তাহার দল বা তিনি কি চান বা না চান, তাহার চাইতে বড় কথা ভারতের ভোটার সাধারণ তাহাকে কিভাবে মূল্যায়ন করিতেছেন বা করিবেন। আর, সেটাই পরীক্ষিত হইবে দেশটির আগামী সাধারণ নির্বাচনে।