আলোকপাত

আমাদের চাওয়া-পাওয়ার খতিয়ান

বার বার যে সত্যটি আমরা অনুভব করি, সেটি হচ্ছে— প্রতিদিনের জীবনের সকল তুচ্ছতার অনেক ঊর্ধ্বে আমাদের জীবন। এ প্রতীতী আমাদের বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন অবাধ, মুক্ত মন নিয়ে আমরা জীবনের যাঞ্চা করি। এটি আমাদের জীবন সচেতনতা, এটি আমাদের সাধনার সম্পদরূপে গণ্য। সমাজ বন্ধনে নিত্যদিন তেল-কালির স্পর্শে আমাদের জীবন ধন্য করতে শিখতে হয়। দুর্ব্যবহার হজম করতে শিখতে হয়। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, অপমান ও অবহেলায় ভেঙে না পড়তে শিখতে হয়। দু’চোখে অনল বর্ষণ করে প্রয়োজনে আমরা পরিস্থিতির মোকাবিলা করবো। কর্মযোগের সাত্বিকতা দিয়ে আমরা নিজেদেরকে তাবত্ সংস্কার, কুসংস্কারের পীড়া থেকে দূরে রাখতে সচেষ্ট থাকবো। নির্মল শুচিন্তায়, সৌন্দর্যে-দীপ্তিতে মানুষের মহিমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবো আমরা। বিনয়, ন্যায়পরায়ণতা এবং সত্য-উপলব্ধির সঙ্গে আমাদের প্রতিদিনের আত্মীয়তা থাকবে। জাগতিক স্থূলতা এবং প্রবঞ্চনা আমাদের পুড়িয়ে, পিটিয়ে নিখাদ সোনা করবে। কর্মের, সেবাব্রতের আদর্শে মন-প্রাণ সমর্পণ করে মুক্তির সন্ধানে সচেষ্ট থাকবো আমরা। দেশের কল্যাণে যে যেভাবে পারি, ভূমিকা রাখতে চাই। সমাজ-সংসার এখন আমাদের অনেকের কাছেই নিরানন্দ, বিমুখ প্রান্তর। এখন প্রয়োজন অস্তিত্বের স্বরূপ আবিষ্কার এবং আত্মউদঘাটনের। এখন চলছে— লঘু-গুরুর অপ্রত্যাশিত মিশ্রণ। কেবলই স্বল্পবুদ্ধি অহমিকা ও স্থূলত্ব, নিজের পলাতক চরিত্র ও কৌতুকের ছলে সমাজ এবং জগতের ওপর এক রকম শোধ নেয়ার চেষ্টা। বাঙালি বীরের জাতি। সাহসে, সংগ্রামে প্রত্যয়ী জাতি। তবুও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আমরা হেরে গেছি অনেকবার। আত্মসমর্পণ করেছি বাইরের শক্তির কাছে। বার বার সাজানো দাবার ছক উল্টে গেছে। আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াবার প্রচেষ্টা বার বার ব্যাহত করার হীন প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্নতর হওয়াই কাম্য ছিলো। এদেশের সমাজনীতি, রাজনীতি, দেশপরিচালনা, কূটনীতি, সংস্কৃতি সব কিছুই স্বাধীন এবং গণবান্ধব হওয়ার কথা ছিল। অথচ তা হয়নি। নিজস্ব জীবনধারা না থাকলে নিজস্ব রাজনীতি, সংস্কৃতি কিছুই থাকে না। সব কিছুতেই অন্যের হস্তক্ষেপ থাকে। স্বাধীন দেশে নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাঁচতে দিতে হবে নিজস্ব ধারায়। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই অন্য দেশের আগ্রাসন মেনে নেয়া যায় না। অন্যদেশের আগ্রাসন থাকলে আমরা নিজস্ব সংস্কৃতির কাঠামো নির্মাণ করতে পারবো না। মনে রাখতে হবে যে, আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ভুঁইফোড় সংস্কৃতি নয়। সংস্কৃতি আমাদের স্বাধীনতা প্রতিম জীবন-প্রত্যয়। সংস্কৃতিকে গন্ডি কেটে ছোট করার প্রচেষ্টা চলেছে বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি। আমরা রুখে দাঁড়িয়েছি বার বার। যা কিছু সুস্থ, স্বাভাবিক এবং গতিশীল— তার যোগফল দিয়েই সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হবে। সংস্কৃতির জন্যে চাই- বেগবান প্রাণবন্যা। এই প্রাণবন্যায় বাইরের চেহারা পরিবর্তিত হলেও চিত্তসত্তা থাকে অম্লান, শুভ্র। আমরা আশা করি, জীবনতৃষ্ণা আমাদের সংস্কৃতিকে অমিত সংগ্রামের প্রেরণা জুগিয়ে যাবে। আত্মপীড়ন ও আত্মনিগ্রহের যাতনা থেকে মুক্ত হয়ে আমরা সত্য ও সুন্দরকে আবিষ্কার করতেই থাকবো। লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট email:gausurrahman2011@yahoo.com