গ্যাসের আশা কি ছাড়িতে হইবে

বাংলাদেশে জ্বালানি সমস্যা নিয়া অনেক আলোচনা হইতেছে। কিন্তু সমাধান হইতেছে না। সমাধানের দিকে কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে যাইতেছে না। এই সমস্যার কারণে বিনিয়োগ হইতেছে না। বিনিয়োগ হইলেও শিল্প কারখানা ঠিকমত চলিতেছে না। এইরূপ জ্বালানি সমস্যা তিন দশক আগে ছিল না। নব্বই দশকের আগে কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কাহারও জ্বালানি সমস্যার কথা শোনা যায় নাই। নব্বই-উত্তরকালে ক্রমান্বয়ে এই সমস্যা তীব্র হইতে তীব্রতর হইতে দেখা যায়। যদিও এই সময়ে জ্বালানির ব্যবহারও বাড়িয়াছে অনেকগুণ। যেইভাবে জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়াছে সেইভাবে এর চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় নাই। ফলে সংকট দিন দিন বাড়িতেছে। নিকট ভবিষ্যতে এই সংকট আরও বাড়িবে। কিন্তু সংকট সমাধানের কোন উদ্যোগ দেখা যাইতেছে না। বাংলাদেশে মূল জ্বালানির মধ্যে আছে গ্যাস আর কয়লা। তৈল যাহা ব্যবহূত হয় তাহার পুরোটাই আমদানি-নির্ভর। কয়লা উত্তোলন করা হইতেছে খুবই অল্প পরিমাণে। গ্যাস ব্যবহার হইতেছে দীর্ঘদিন ধরিয়া। কিন্তু গ্যাস অনুসন্ধান ঠিকমত হইতেছে না। ফলে এই নিয়া একেক সময় একেক রকম তথ্য উপস্থাপন করা হইতেছে। ইহাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হইতেছে। কিছুদিন যাইতে না যাইতেই নীতি পরিবর্তন করিতে হইতেছে। কিছুদিন আগে বলা হইতেছিল দেশ গ্যাসে ভাসিতেছে। আর এই কথা বলিয়া সে সময় গ্যাস রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছিল। পরে যানবাহনের জন্য গ্যাস বাধ্যতামূলক করা হইলো। কিন্তু দশ বত্সরের ব্যবধানে এখন বলা হইতেছে যানবাহনে আর গ্যাস দেওয়া হইবে না। মুখে এই কথা বলিলেও সমানতালে তৈল চালিত গাড়ি গ্যাসে রূপান্তর চলিতেছে। অথচ শিল্পে গ্যাস দেওয়া হইতেছে না। গ্যাসের যে মজুদ আছে তাহা যথাযথ সময়ে হালনাগাদ করা হইতেছে না। ফলে কখনও বলা হইতেছে, দেশ গ্যাসে ভাসিতেছে। আবার কখনও বলা হইতেছে, গ্যাস ফুরাইয়া যাইতেছে - গ্যাস ফুরাইয়া যাইতেছে। যথাযথ অনুসন্ধান হইতেছে না বলিয়া এই অবস্থা। বাংলাদেশে যে গ্যাস আছে তাহার বেশিরভাগই নব্বই দশকের আগে আবিষ্কার হওয়া। ইহারপরে আর ছোট ছোট ছাড়া বড় কোন আবিষ্কার নাই। দেশে গ্যাসের মওজুদ ৩৭ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ইহারমধ্যে ২০ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন উত্তোলনযোগ্য। অর্থাত্ নিশ্চিত প্রমাণিত। আর বাকীটা সম্ভাব্য। নিশ্চিত প্রমাণিত গ্যাসের মধ্যে প্রায় ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট ইতিমধ্যে ব্যবহূত হইয়াছে। এখন আছে আর প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। প্রতিবত্সর প্রায় এক ট্রিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাসের ব্যবহার হইতেছে। এখন প্রতিদিন ব্যবহার আরও বাড়িতেছে। সম্ভাব্য গ্যাসকে নিশ্চিত করিতে হইলে খনন করিয়া বুঝিতে হইবে। না হইলে মওজুদ যেইখানে আছে সেইখানেই থাকিবে। যত বেশি খনন করা হইবে ততবেশি নিশ্চিত হওয়া যাইবে যে, সম্ভাব্য যে মওজুদ আছে তাহা উত্তোলন করা যাইবে কিনা। আর উত্তোলনযোগ্য না হইলে তো আর ব্যবহারযোগ্য হইবে না। তাই আরও বেশি বেশি অনুসন্ধান ও খনন করিতে হইবে। কিন্তু সেই কাজ যথাযথ গতিতে হয় নাই বলিয়া এখন দেশে গ্যাস সংকট দেখা দিয়াছে। গ্যাসে ভাসিতেছে না বলিয়া এখন বলা হইতেছে ফুরাইয়া যাইতেছে। শুধু যে গ্যাস অনুসন্ধান করা হয় নাই তাহা নহে। বর্তমানে যে গ্যাস প্রতিদিন উত্তোলন করা হইতেছে তাহাও ইচ্ছামত ব্যবহূত হইতেছে। উত্পাদনশীল খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হইতেছে না। আবার যাহারা বৈধভাবে সংযোগ নিয়াছেন তাহারাও ঠিকমত গ্যাস পাইতেছেন না। অবৈধ গ্রাহকরা কিংবা কিছু বৈধ গ্রাহক অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করিতেছেন। গ্যাস নিয়ে এক অনাসৃষ্টি অবস্থা চলিতেছে। এমতাবস্থায় শিল্প কলকারখানা কি বন্ধ হইয়া যাইবে? না। তাহাতো হইতে পারে না। ইহার জন্য বিকল্প পথে যাইতে হইবে। শিল্পের চাকা সচল রাখিতে বিকল্প উপায় খুঁজিতে হইবে। যদিও সেই বিকল্প পথে চাকা সচল রাখিতে হইলে উত্পাদন খরচ বাড়িয়া যাইবে। তবু বিকল্পের বিকল্প এখন পর্যন্ত দেখা যাইতেছে না।