দক্ষ মালি দরকার প্রশাসন যন্ত্রের আগাছা দূর করিতে

রাজনীতিকরণের ন্যূনতম সীমা বলিয়া বোধ করি কোনো কিছু আর থাকিতেছে না আমাদের দেশে। উদাহরণের শেষ নাই, আমরা এক্ষণে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতে পারি গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত নার্স নিয়োগের অনিয়ম ও তত্সংশ্লিষ্ট দুর্ভোগ লইয়া। চাকরির নিয়োগপত্র পাইয়াও ময়মনসিংহের বিবি হাওয়া নামের এক অভাগী তরুণী সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতির ফাঁসে আটকাইয়া যান। সেই ফাঁস হইতে তাঁহার মুক্তি মেলে নিজের অমূল্য জীবনখানি বিসর্জন দেওয়ার বিনিময়ে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত নিয়োগ কমিটি হইতে গত ১১ সেপ্টেম্বর বিবি হাওয়া নিয়োগপত্র পাইয়া ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যোগদান করিতে যান। উক্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নব সৃষ্টকৃত পদ ১১৮টি হইলেও সেইখানে নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে ১৬৫ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সকে। অর্থাত্ অতিরিক্ত ৪৭ জন সিনিয়র নার্সের নিয়োগ লইয়া ছিনিমিনি খেলা হয়। সেই অনিয়মের ভুক্তভোগী এই বিবি হাওয়া, যিনি ১২ বত্সর বেকার থাকিবার পর সরকারি নিয়োগপত্র পাইয়া আনন্দে আত্মহারা হইয়াছিলেন। কী ট্রাজেডি! যাহা তাহাকে ভালোভাবে বাঁচাইতে পারিত, তাহারই বিপরীতে দুর্ব্যবহার ও অপমানের শিকার হন বিবি হাওয়া। অতঃপর আশাহতের শোকে তাহার করুণ মৃত্যু হয়। জানা গিয়াছে, সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নবসৃষ্ট শূন্য পদে ৪১২৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগ প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু করে সেবা পরিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিয়োগপত্রপ্রাপ্ত নার্সরা গত ৫ সেপ্টেম্বর হইতে কর্মস্থলে যোগদান করিতে গিয়া দেখেন—প্রতিটি হাসপাতালে সৃষ্ট পদসমূহের দ্বিগুণ নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে। পাশাপাশি অভিযোগ উঠিয়াছে, দালাল চক্রের তালিকা অনুযায়ী নিয়োগপত্র স্বাক্ষর করিয়া তাহা জারি করা হয়। দালালরা নার্সদের পছন্দের কর্মস্থল পাওয়াইয়া দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিটি নিয়োগের জন্য ৫০ হাজার হইতে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত উেকাচ লইয়াছে। স্বভাবতই ঘুষ বাণিজ্যের তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হয়। সুতরাং বিশৃঙ্খলা এইক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী হইয়া উঠিয়াছিল। ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, দালাল চক্র মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখে মাত্র। তাহারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গোপন প্রতিনিধি হিসাবে ক্ষমতা পাইয়া থাকে কেবল। প্রকৃত দালালের পাশাপাশি আমরা প্রায়শই ভুয়া দালালেরও বাড়বাড়ন্ত দেখিয়া থাকি। এই শ্রেণির প্রতাপ তখন বৃদ্ধি পায়, যখন একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্র নামক নিয়মনিষ্ঠ সুস্থ ফলদায়ী বৃক্ষের চারিদিকে গজাইয়া ওঠে আগাছার জঞ্জাল। আমরা বিস্মিত না হইয়া থাকিব কিরূপে যখন বুঝিতে পারি—এই সকল আগাছা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান নির্বাহীকেও বিব্রত করিতে দ্বিধাবোধ করে না। নার্সদের এই নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও অসংখ্য বিভাগের অনিয়ম অব্যবস্থাপনার একটি সাধারণ চিত্ররূপ প্রদর্শন করে মাত্র। আমাদের প্রশ্ন হইল, যেইখানে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় রহিয়াছে স্বয়ং প্রধান নির্বাহীর তত্ত্বাবধানে, সেইখানে সৃষ্ট পদসমূহের দ্বিগুণ নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় কি করিয়া? প্রধানমন্ত্রীর গোচরে যাহারা আনিয়াছেন এই শূন্য পদ পূরণের প্রয়োজনের কথা, প্রধানমন্ত্রী যেইখানে স্বয়ং নির্দেশ দিয়াছেন এই নিয়োগ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করিবার, সেইখানে এই সংক্রান্ত অনিয়ম তদন্তের আশু নির্দেশ জরুরি। কেননা ইহা লইয়া যাবতীয় মর্মন্তুদ ঘটনা ও অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিষয়টি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেই অবজ্ঞা করিয়া থাকে। যেই ধরনের সরকার এখন রাষ্ট্র পরিচালনা করিতেছে, এইক্ষেত্রে যদি অন্য ধারার সরকার থাকিত, তাহা হইলে কি এই সকল আগাছা সাহস পাইত রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীকেও এইভাবে বিব্রত করিতে? কিংবা তাহা যদি করিয়াও থাকিত, তখন কি আগাছাদের নিস্তার থাকিত কোনোরূপ? তৃতীয় বিশ্বের কথিত গণতান্ত্রিক সরকারসমূহের চারিদিকে আমরা ক্রমশ আগাছার জঞ্জাল সৃষ্টি হইতে দেখি। এই ধরনের সরকার নামকাওয়াস্তে আগাছা দূর করিবার চেষ্টার বিপরীতে পরোক্ষভাবে তাহাদের প্রতিপালন করে। সেই আগাছা রাষ্ট্রকাঠামোর প্রাণরস শোষণ করিয়া লয়, বিকলাঙ্গ করিতে চেষ্টা করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে। তৃতীয় বিশ্বের কথিত গণতান্ত্রিক দেশসমূহে এই বিপুল জঞ্জাল দূর করিতে না পারিলে দরকার পড়ে দক্ষ মালি’র, যাহার নিষ্ঠুর কাঁচি সকল আগাছাকে নির্মূল করিতে পারে। মুশকিল আসানের এই পদ্ধতি ততদিন জিইয়ে থাকিবে যতদিন কথিত গণতান্ত্রিক সরকারসমূহ নিজ হস্তে কঠোরভাবে আগাছা দূর না করিবে।