মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সিনেট নির্বাচন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলাদেশের নয় বিশ্বের অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। কেবল পাঠদান নয়, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম এক সূতিকাগার হওয়ার কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটি একটু আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তার আগে এবং পরের নানা ঘটনায় সমৃদ্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। স্বভাবতই এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সবার কাছেই এক বিস্তৃত অহংকার, মর্যাদা এবং প্রতিবাদের এক নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা লেখাপড়া করেছেন তাদের গর্ব এবং গৌরবও সীমাহীন। অনেকের মতো আমিও সেই গর্ব এবং অনন্য গৌরবের অধিকারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময় থেকেই অনেকের মতো আমারও দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম, মর্যাদাকে আরো এগিয়ে নিতে সবসময় সচেষ্ট থাকবো। দেশে যখন রাজনৈতিক উত্তাপ প্রবাহমান তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচন শুরু হয়েছে। সিনেটে মোট ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটস’ প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে সরাসরি ভোটে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের মোট ৪৩টি কেন্দ্রে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। সিনেটে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৪,৫৪৫ জন। জাতীয়তাবাদী পরিষদ, গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট এবং সম্মিলিত পরিষদ এই তিনটি প্যানেল থেকে মোট ৭২ জন প্রার্থী এবারের সিনেট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট দেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত যেটি বিশেষভাবে মর্যাদাপূর্ণ। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী সংস্থা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক ভাবমূর্তি আরো উচ্চতরো অবস্থানে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এবারের নির্বাচনে প্রবীণ শিক্ষক থেকে শুরু করে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ আইনজীবী, চিকিত্সক, মানবাধিকার কর্মী, শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যাংকার ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাবেক ছাত্রনেতারা অংশগ্রহণ করেছেন। নির্বাচনকে ঘিরে প্রচার প্রচারণাও জমে উঠে। কিন্তু এই নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কিছু অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত সবাইকে হতাশ না করে পারেনি। ফলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে শঙ্কার শেষ নেই। ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিক ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। ঐদিন চট্টগ্রাম, রংপুর, লক্ষ্মীপুর, যশোর, বরিশাল, সাতক্ষীরা, খুলনা, বরগুনা, ভোলা, কুষ্টিয়া, চাঁদপুরসহ মোট ২৭টি কেন্দ্রে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাইরে আরো ১৩টি কেন্দ্রে এবং ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার কেন্দ্রসমূহে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বর ভোট গ্রহণের প্রথম দিনেই দেখা গেছে নানা অনিয়মের ছড়াছড়ি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, বরিশাল, রাজশাহীসহ ঢাকার বাইরের প্রায় সব কটি ভোট কেন্দ্রে ভোটার কার্ড না পেয়ে ভোট দিতে না পারায় রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। লক্ষ্মীপুর সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভোটারদের কারোরই কার্ড না থাকায় কোনো রেজিস্ট্রার্ড গ্র্যাজুয়েটই ভোট দিতে পারেনি। ফলে ঐ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ না করে স্থগিত করা হয়। ঐদিন এরকম আরো নানান ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে। আসলে সিনেটে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট প্রদান প্রক্রিয়ার পুরো ব্যবস্থাটাই বিতর্কিত করেছে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ফলে ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম দিনে ঢাকার বাইরের কেন্দ্রের নির্বাচনে প্রায় ৫০ ভাগ ভোটার ভোট দিতে পারেননি। ঐদিন ২৭টি কেন্দ্রে মোট আট হাজার ভোটের মধ্যে মাত্র সাড়ে তিন হাজার ভোট কাস্ট হয়। চট্টগ্রাম কলেজ ভোট কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেখা যায় রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট মো. খায়রুল ইসলাম খান (রেজি নং ০৮৫৪০), মো. একে ফজলুল হক ( রেজি নং ৬৮৬৪), অ্যাডভোকেট মীর্জা (রেজি নং ২৩৪৪), জাকির আহমেদ (রেজি নং ২৫৪৩৮), ড. মো. নুরুল বাশার (রেজি নং ১৮৫৫২), ফয়সাল মাহমুদ মোসাদ্দেক (রেজি নং ৭০৬৯), অ্যাডভোকেট আহমেদ সাগির (রেজি নং ১৯১১), মেহেদী হাসান মৃধা (রেজি নং ১৬৭৯৭), ডা. এটিএম এমদাদ হোসেন (রেজি নং ৮২৭) অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান-এরকম অনেক ভোটারই ভোটার কার্ড না পাওয়ায় সিনেটে ভোট দিতে পারেননি। তারা সবাই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে ভোটারদের ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেয়া ভোটার কার্ডটিই ভোট প্রদানের একমাত্র দলিল হিসেবে বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই কার্ডের বাইরে ভোট প্রদানের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ভোটার কার্ড সঠিকভাবে বিতরণ করা হয়নি এরকম অভিযোগ অনেকেই করেছেন। আবার এও জানা গেছে কেবল সরকারি প্যানেলের সমর্থিত ভোটাররাই বেশি ভোটার কার্ড পেয়েছেন। ভোটার কার্ডের জন্যে এখনও অনেক গ্র্যাজুয়েট অপেক্ষা করছেন, কিন্তু তারা কার্ড পাচ্ছেন না। এই সমস্যার সমাধানও করা হচ্ছে না। অথচ শুরু থেকে দাবি ছিল সিনেটে ভোটারদের আলাদা কার্ডের সাথে রেজিস্ট্রেশন নাম্বারও দেয়া হোক যেখানে একজন ভোটার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোট দিতে পারবেন। যেহেতু বিকল্প কোনো অপশন রাখা হয়নি সেহেতু সিনেটে ভোট প্রয়োগের ক্ষেত্রে একজন নিবন্ধিত রেজিস্টারের ভোটার কার্ড প্রাপ্তি ন্যায্য অধিকার। অথচ কার্ড প্রেরণে স্বচ্ছতা পালন করা হয়নি। আমরা দেখছি যে প্রক্রিয়ায় কার্ড প্রেরণ করা হয়েছে সেখানে ইচ্ছে করে সুকৌশলে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। এদিকে ঢাকার বাইরে কেন্দ্র বৃদ্ধির বিষয়ে আগে থেকেই সাধারণ ভোটারদের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও সে দাবিও উপেক্ষা করা হয়েছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ভোটার এবং নিবাচনী কেন্দ্রের অনুপাত মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক গ্র্যাজুয়েটকে একটি ভোট প্রদানের জন্য অনেক পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এই কারণেই দাবি ছিল ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো যাতে করে ভোটাররা নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে নিরাপত্তার সাথে কম সময়ের মধ্যে নিজ নিজ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। আমরা মনে করি এখনও সময় আছে অন্তত ঢাকার বিশ হাজার ভোটারদের কথা মাথায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাইরে আরো নতুন কয়েকটি ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা। এটি করা হলে ভোটারদের ভোগান্তি অনেকাংশেই কমে আসবে এবং নিরাপদে ভোট প্রয়োগ করতে পারবে। কেননা ঢাকা শহরের যানজট ঠেলে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানো খুবই কঠিন কাজ। সিনেট নির্বাচনের প্রাক্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন হলে সমস্ত দলমতের শিক্ষার্থীদের সহাবস্থান নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল প্রশাসনের। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ-ই গ্রহণ করেনি। সহাবস্থান না থাকার কারণে প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবে ভিন্ন মতের অনেক ভোটারই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত ৩টি ভোট কেন্দ্রে ভোট প্রয়োগে ভয়ভীতির সম্মুখীন হবেন বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচন অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে সব গ্র্যাজুয়েটরা সিনেটে নির্বাচিত হয়ে আসেন তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো মর্যাদাপূর্ণ আসনে নিতে জোরালো ভূমিকা রাখেন। কিন্তু নানা কারণে বারবারই তার ব্যত্যয় ঘটেছে। আমি মনে করি আমাদের মতো অনেক তরুণ আছেন যারা নিবেদিত হূদয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করতে চান। আমাদের সত্যিই সুযোগ আছে আমাদের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো নতুন আলোয় ভরিয়ে দিতে। আমরা যারা সুন্দরের নিরন্তর স্বপ্ন দেখি, আমরা যারা চারপাশ যুক্তির উত্সবে ভরে দিতে চাই তাদের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের কাছে থেকে যৌক্তিক সহানুভূতি চাওয়া অন্যায় কোনো আবদার নয়। আসুন, আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা দিয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো আলোকিত এবং সুন্দর করি। সবাই মিলে সেই ধারাবাহিকতায় এবারের সিনেট নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীদের বিজয়ী করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও মর্যাদার আসনে নিতে অবদান রাখি। লেখক :চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি kirondebate@gmail.com