নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সমঝোতা আর কতদিন

বর্তমান সরকারের মেয়াদ প্রায়ই শেষ। সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচন হবে এটাই স্বাভাবিক। এজন্যই হয়তো সারাদেশে নির্বাচনী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কখন ভোট হবে- জনগণ এই প্রতীক্ষায় অপেক্ষমান। যদিও নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। সংসদে সরকারি দলের সদস্যরা সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো সুযোগ নেই বলে অভিমত ব্যক্ত করছেন। ১৮ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সম্প্রতি রাজশাহীর জনসভায় বলেছেন, “ভোট চাইছেন, ভোট তো হবে না”। কথাটি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলা হলেও, একই সঙ্গে জনগণকেও বলা হয়েছে। ‘ভোট হবে না’ কথাটি তিনি বললেও এটি কতটুকু গণতন্ত্রসম্মত এবং সংবিধানসম্মত সম্ভবত তিনি খুব একটা ভেবে দেখেননি। তিনি রংপুরের জনসভায় বলেছিলেন, “ভোট চাইতে নয়, রুখতে এসেছি”। তাহলে আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে পরবর্তী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে দেশে নির্বাচন না হয়, অর্থাত্ হতে দেয়া না হয়, তাহলে দেশটা পরিচালিত হবে কাদের কর্তৃত্বে? এ প্রশ্নের উত্তর দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার মাধ্যমে পাঠকের কাছে জানতে চাইলাম। দেশের জনগণ নির্বাচন চায় কিন্তু এ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে, দেশের রাজনীতি এবং নির্বাচন কোন পথে যাচ্ছে। সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের অধিকারী হচ্ছেন জনগণ। সংবিধানের ১১ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, “প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেকোন মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে।” এক্ষেত্রে পরিষ্কার যে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ব্যতীত অন্য যে কেউ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সেটি কোনোভাবেই গণতন্ত্রসম্মত না এবং এতে জনগণের সার্বভৌমত্ব বিলুপ্ত হয়। একই সঙ্গে লঙ্ঘিত হবে সংবিধানও। এমন ধারণা থেকেই মনে করি, যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সবার সহযোগিতা থাকা উচিত। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় এবং জীবন-যাত্রার সংকট ক্রমেই বাড়তে থাকবে। সময়মতো সংসদ নির্বাচন না হলে দেশ শাসনের দায়িত্ব কার হাতে তুলে দেয়া হবে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, এমন কাজটি কেন করতেই হবে? দেশে কেন সংবিধানের যাত্রা হবে না? সাংবিধানিক গণতন্ত্র রক্ষা না করতে পারলে নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করে তোলা কী আদৌ সম্ভব? তাহলে কী রাজনৈতিক দলগুলো চায় আবার কোনো ১/১১ সৃষ্টি হোক। নির্বাচন রুখতে চাইলে এবং সংবিধান না মানলে এমনই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি হতে পারে বলেই ধারণা করা যেতে পারে। কিন্তু দেশের জনসাধারণ এমন কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। বরং দেশের জনগণ অগণতান্ত্রিক শক্তিকেই রুখতে চায়। গণতন্ত্র ও সংবিধান ব্যাহত করার অধিকার কারো নেই। অনির্বাচিত কোনো সমঝোতার সরকার এসে বছরের পর বছর ক্ষমতায় থেকে গণতন্ত্রকে নস্যাত্ করে দিবে এটি কারোই কাম্য নয়। আর তা ঘটলে গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম উপাদান অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান হুমকির মুখে পড়ে যাবে। যদি নির্বাচন নিয়ে টানাপোড়েন খেলায় কোনো সমাধান না হয় তাহলে গণতন্ত্র রক্ষার নামে রাজনৈতিক দলগুলোর যে অঙ্গীকার সেটি কী আদৌ রক্ষা পাবে? আর যদি রক্ষা না পায় তাহলে গণতন্ত্রকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার দায় কে নিবে? এবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে সংসদে এসে সকল সংকট নিরসনের আলোচনা করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। বেগম জিয়া তখন সম্ভবত মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশের সুযোগটাকে কাজে লাগাতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিল। কিন্তু সে হুমকি রাজনৈতিকভাবে বুমেরাং হয়েছিল বলে মনে হয়। এখন অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, সংলাপ দিয়ে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হতে পারে। কিন্তু সংলাপতো ইতিপূর্বেও বিভিন্ন সময় বহুবার হয়েছে। সমাধানের নামে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও ক্ষমতায় এসেছে। ইচ্ছামত দেশ শাসন করেছে। রাজনৈতিক নেতাদের মিথ্যা মামলায় কারাগারে বন্দিও করেছেন। সেগুলোও নিশ্চয়ই গণতন্ত্রসম্মত ছিল না। আবার নতুন করে এমন অনিশ্চিত যাত্রা নিশ্চয়ই কারো কাম্য নয়। স্বাধীনতার পর বিগত প্রায় ৪২ বছরে বাংলাদেশে নয়টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি রাজনৈতিক সরকারের অধীনে, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থটি যথাক্রমে জেনারেল জিয়া ও এরশাদের সামরিক সরকারের অধীনে। ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত খালেদা জিয়া সরকারের অধীনে। পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুুষ্ঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। আর সর্বশেষ নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ভিন্ন মডেলের সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা কখনোই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ওঠেনি। ২০০৬ সালে তৃতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে দেখা দেয় নানা নাটকীয়তা। বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করার জন্য বিচারপতিদের বয়স হঠাত্ দুই বছর বাড়ানো হয়। আওয়ামী লীগ কোনোক্রমেই বিচারপতি হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা মেনে নিতে রাজি হয়নি। ফলে মহাজোট গঠন করে শুরু করে আন্দোলন-সংগ্রাম। পরবর্তীতে সামরিক সমর্থনে ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। অভিযোগ আসে— এ সময়েই সংস্কারের নামে দেশে বিরাজনীতিকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বহু রাজনীতিক-ব্যবসায়ীকে মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ করে। অনেককে দেশ ছাড়তেও বাধ্য করে। বহু অধ্যাদেশ জারির মতো নীতি নির্ধারণী কাজকর্ম হয়। অনেক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য রদবদল করা হয়। এতে লক্ষ্য করা যায় যে, বস্তুত কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারই নিজেদের বির্তকের ঊর্ধ্বে রাখতে সক্ষম হয়নি। কাজেই শুধু সমঝোতা করে কোনো অনির্বাচিত কিংবা অগণতান্ত্রিক সরকার নয়, বরং আসন্ন দশম সংসদ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌঁছাতে রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিবাচক মানসিকতা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মনোভাব সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। নব্বই দশকে দেশে সামরিক শাসনমুক্ত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে, তিন জোটের রূপরেখায় মাত্র তিন টার্মের জন্য সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিশেষ প্রয়োজনে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দলীয় অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা তিন টার্ম অতিক্রম করে চারবার অতিক্রম করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো যে, এমন একটি পদ্ধতি থাকার ফলেই সম্ভবত বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের শেষে নির্বাচন-পূর্ব নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন প্রশ্নে সংকট স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। কারণ হিসেবে মনে হয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে দুর্বল সংযোজন হিসেবে বিবেচিত। এ অবস্থায় গণতন্ত্রকে আঘাত করার সুযোগ পায় অগণতান্ত্রিক শক্তি। এভাবেই ’৯০-পরবর্তী প্রায় প্রতিটি সরকার শেষেই নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে দেশে সংঘাত ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। কখনো সংকট থেকে সুষ্ঠু উত্তরণ ঘটেছে আবার কখনো রাজনৈতিক ঘোলাটে পরিবেশ জাতির জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে এবং মেয়াদ শেষ করে ক্ষমতা থেকে চলে যায়। কিন্তু দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই আনতে পারেনি। রাজনীতিবিদরা তাদের প্রদত্ত গণতন্ত্র কায়েমের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। গণতন্ত্র রক্ষার অঙ্গীকার করা হয় কিন্তু গণতন্ত্র কিংবা গণতান্ত্রিক পরিবেশে কোনোটাই রক্ষিত হয় না। বাংলাদেশে নির্বাচনের উদ্দেশ্য হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পুনঃপ্রবর্তন, কারণ গণতন্ত্র আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। সত্যিকারের গণতন্ত্র তথা গণতান্ত্রিক শাসনের কার্যকারিতা বহুলাংেশ নির্ভর করে নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে বিরোধী দলের দায়িত্বও কম নয়। মনে রাখতে হবে, যে সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক না কেন বর্তমান সময়ে কারচুপি করে নির্বাচনে জয়লাভ করা প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যায়। মিডিয়াকে ফাঁকি দিয়ে কারচুপি করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা আপাতদৃষ্টিতে নেই বললেই চলে। কাজেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমার আহ্বান, নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সমঝোতা এবং পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে পুনরায় ক্ষমতা ধরে রাখার নতুন ফন্দি করতে সচেষ্ট না হয়ে সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিন। আমরা চাই নির্বাচন এবং সত্যিকার গণতন্ত্র। এজন্য শুধু নির্বাচন, নির্বাচনকালীন সরকার নয় বরং নির্বাচন-পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান মেনে চলার ইতিবাচক অঙ্গীকার রক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় E-mail: sultanmahmud.rana@gmail.com