ট্রেনে পাথর ছোঁড়া :জীবন যখন গতিহীন, দুর্গতি-ই তখন ভরসা!
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:৪২
‘গতিই জীবন, গতির দৈন্যই মৃত্যু’-এই উক্তি সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। গতি বন্দনায় যিনি লিখেছেন -‘জীবনে অনন্তকে চিনতে হবে...গতির মধ্যে দিয়ে অনন্তের স্বরূপ চোখে ধরা দেবে। হে জীবন পথের পথিক পথের ধারে ঘুমিয়ে পড়ো না।’ কিন্তু দেশে আজ বিভূতিবাবুর গতি বন্দনার উল্টা সুর। আজ গতি-ই দেশে ডেকে আনছে দুর্গতি। দেশের রেলপথে প্রায়ই চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে যাত্রীদের আহত করার দুর্ঘটনা ঘটছে। চলন্ত ট্রেনের জানলায় পাথর ছুঁড়ে মারার ঘটনায় অনেকেই উদ্বিগ্ন। এক নারী প্রকৌশলী নিহত ও এক ড্রাইভার আহত হওয়ায় এই পাথর ছুঁড়ে মারার প্রবণতাটি বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
‘ট্রেনযাত্রীদের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা’ শীর্ষক গত ১৯ সেপ্টেম্বর ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় থেকে জানা গেল- ‘তুলনামূলকভাবে ট্রেনকে নিরাপদ গণপরিবহন বলিয়া বিবেচনা করা হয় সারা বিশ্বব্যাপী। কিন্তু আমাদের দেশে ট্রেনযাত্রীদের নিরাপত্তা কতোখানি নাজুক তাহা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। বাস্তবতা হইল, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে শত শত কিলোমিটার ট্রেন লাইনের প্রায় পুরোটাই অরক্ষিত ও অনিরাপদ। দেশের প্রায় সর্বত্রই ট্রেন লাইনের পাশ ঘেঁষিয়া শুধু যে বিপজ্জনকভাবে অসংখ্য বস্তি গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাই নহে, লাইনের উপর নিয়মিত হাটবাজারও বসিতেছে। গরু-ছাগল চরিতেছে। খেলা করিতেছে শিশু-কিশোরের দল। আর ট্রেনলাইনের উপর দিয়া যত্রতত্র পথচারী ও যানবাহন পারাপারের ঘটনা তো আছেই।’
এই যখন পরিস্থিতি, তখন কিছু কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে। এক নারী প্রকৌশলীর করুণ মৃত্যুর পর কিছু ট্রেন স্টেশনে মাইকিং, লিফলেট বিলি এবং জনমত গঠনের চেষ্টা চলছে। সমপ্রতি বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে- ‘‘রাতের বেলা রেল লাইনের আশেপাশে থাকা নেশাগ্রস্ত এবং দিনের বেলা শিশু-কিশোররা এই কাণ্ড করে বলে রেল কর্মকর্তাদের ‘ধারণা’।’’ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নথি অনুযায়ী প্রতিবেদক জানাচ্ছেন- ‘চলতি বছর দৌলতগঞ্জ, ফাতেমানগর, গেণ্ডারিয়া, মানিকখালি, কসবা, ফৌজদারহাট, সোনাইমুড়ি, লালমাই ও ভাটিয়ারি এলাকায় পাথর ছোঁড়ার নয়টি ঘটনা ঘটে। এর বাইরেও হর-হামেশা এ ধরনের ঘটনা ঘটে বলে রেলযাত্রী ও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।’ বিডিনিউজে প্রকাশিত সংবাদে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. তাফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘‘রাতের বেলায় কারা, কেন ঢিল ছুঁড়ে মারে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা নেই। কারণ ঢিল মেরে ডাকাতি বা ছিনতাই কিছুই হচ্ছে না। হতে পারে কেউ ‘মজা’ করার জন্য পাথর ছুঁড়ে মারে।’’ চলন্ত ট্রেনে মজা লুটতে গিয়ে পাথর ছুঁড়ে মারার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শৈশবের একটি নীতিগল্পের। যেখানে খেলাচ্ছলে ব্যাঙকে পাথর ছুঁড়ে মারে অবোধ শিশুর দল। যেখানে একপক্ষের বিনোদন, অনপক্ষে ডেকে আনে প্রাণসংহার।
ঢিল ছুঁড়ে ব্যাঙ মারার মতো ট্রেনে ঢিল ছোঁড়ার মতো পরিস্থিতির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না খোদ বাংলাদেশ রেলওয়ে পরিবারের সদস্যরাও। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা জাকির হোসেন নিজেও চলন্ত ট্রেনে এ ধরনের হামলার মুখোমুখি হয়েছেন। গত ৭ আগস্ট চট্টলা এক্সপ্রেসে করে চট্টগ্রামে আসার পথে তার ট্রেনে ঢিল পড়ে। তার অভিজ্ঞতাটি এরকম- ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনের একটু পরই কয়েকজন কিশোর গুলতি দিয়ে ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকে। তবে কেন তারা এমন করছে তা বলা কঠিন’- সমপ্রতি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদীতে এমনটিই বলেছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদে বলা হচ্ছে-‘রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারা মতে কেউ যদি ট্রেনে পাথর ছোঁড়ে, তাহলে যাবজ্জীবন জেলসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। পাথর নিক্ষেপে যদি কারও মৃত্যু হয় তাহলে ৩০২ ধারা মতে দোষীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে।’
চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে মারার ঘটনায় শাস্তি কার্যকর কিনা তা বোঝা যায় না, এমন ঘটনার নিত্যতা থেকে। আমরা জানি,সারাদেশে প্রায় দুই হাজার নয়শ’ কিলোমিটার রেলপথ আছে। ‘শাস্তি দেয়ার মতো আইন’ কাজীর কেতাবে থাকলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম ও খুলনা-পার্বতীপুর লাইনে প্রতিনিয়তই পাথর ছোঁড়ার ঘটনা ঘটছে। ষোলশহর, ফৌজদারহাট, সীতাকুণ্ড, চৌমুহনীতে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনার স্বাক্ষী বোধহয় ঢাকা-চট্টগ্রামের নিয়মিত ট্রেনযাত্রী সকলেই। গত ১১ আগস্ট চলন্ত ট্রেনে বাইরের থেকে ছোঁড়া পাথরের আঘাতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থী প্রীতি দাশ নিহত হওয়ার পর রেল কর্তৃপক্ষ চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ না করার জন্য সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ট্রলি ক্যাম্পেইন শুরু করে। অবাক হলেও সত্যি, দিনে সচেতনতা শেষ হওয়ার পর রাতে ঐ এলাকায় আবার চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করার ঘটনা ঘটেছে! দৈনিক আজাদীর তথ্যমতে-‘যে ট্রেনে (মহানগর গোধূলি) পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে সেই ট্রেনে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার সুকুমার ভৌমিক। সচেতনতার পরও চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি আজাদীকে জানান, পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় গ্লাস ভেঙ্গে লোকো মাস্টার আবদুল্লাহ হিল বাকির মাথা ফেটে গেছে। এই ট্রেনে করে অফ-ডিউটির আরো দুই চালক ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তাদের একজনকে দিয়ে ট্রেন চালানো হয়েছে।’
টেনের জানালায় পাথর ছুঁড়ে জানালার কাঁচ ভাঙ্গার ফায়দা কার? এমন একটি প্রশ্নের উত্তরে হয়তো অনেক সামাজিক-মনোবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানী উত্তর বেরিয়ে আসবে। বণিকবার্তার বিশেষ প্রতিবেদনে জানা গেছে- ‘কাঁচ সরবরাহকারী দুই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থাই অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড ও নিপা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড এতে জড়িত থাকতে পারে। তাদের নিয়োগ করা লোকজন এ ঘটনা ঘটাচ্ছে।’ বণিকবার্তার আশঙ্কা সত্য হলে ট্রেনে পাথর ছোঁড়ার ঘটনাটি চার্লি চ্যাপলিনের দ্যা কিড সিনেমার ‘বাচ্চা কাঁচ ভাঙ্গবে, বাবা মেরামত করবে’ ধরনের মতোই একটি (অপ) কৌশল।
কিন্তু আশঙ্কা অন্য জায়গায়!
আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের জানালায় কোন কাঁচ নেই। তবুও চট্টগ্রাম নগর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে হরহামেশাই পাথর, গোবর, মল, অর্ধতরল কাদামাটি নিক্ষেপ করার ঘটনা ঘটে। এসব (দু)ঘটনায় শাটল ট্রেনের ‘শিক্ষিত’রা বিব্রত, আহত ও মর্মাহত হই। চলন্ত ট্রেন থেকে চকিত নজরে বুঝে নিই, যারা এসব দ্রব্যাদি চলন্ত ট্রেনে ছুঁড়ে মারছে তারা কেউ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নয়। পোশাক, হাসি আর অঙ্গভঙ্গি দেখে অনুমেয়- এরা ওই এলাকার স্থানীয় শিশু-কিশোর, সুবিধাবঞ্চিত বস্তির শিশু। তাদের রাস্তার ধারে যখন ট্রেন যাবে, তখন হাতের খেলা ফেলে শাটল ট্রেনই হয়ে ওঠে তাদের মনোযোগের কেন্দ্র, বিনোদনও। শাটল ট্রেনের জানলায় যেহেতু কাঁচ নেই, তাই সরবরাহকারী কোন প্রতিষ্ঠানের কারসাজি এখানে খাটে না।
কিন্তু আমাদের ভাববার সময় হয়েছে যে, দুর্বার গতিতে একটি ট্রেন ভোঁ-ভোঁ শব্দে কোন একটি এলাকা অতিক্রম করলে সে এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত, শ্লথ জীবনধারণকারী ধীরগতির মানুষরা কেন চলন্ত ট্রেনে পাথর মারে? এর কারণ যদি হয় হিংসা বা ক্রোধ, তাহলে অবাক হবো না। আমাদের ভাবতে হবে, সমাজের একাংশের মধ্যেই কেবল ‘গতি’ অন্য অংশের মধ্যে ‘স্থিতি’ই কি এই দুর্গতি সৃষ্টি করছে না? সমাজের সর্বাংশে ‘দ্রুতি’ না আসলে এভাবেই আমাদের পাথর খেয়ে মরতে হবে। ভোগবাদ, শোষণ, লুণ্ঠনের সমাজের একটি অংশ গতিশীল থাকবে, আর সারা দেশে দুই হাজার নয়শ’ কিলোমিটার বিস্তৃত রেলপথের দুই পাশের বস্তি, নিম্নবিত্ত ও পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ সমাজের মানুষগুলোকে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির মনে করার কোন কারণ আছে কি?
গতির ধর্ম কী? যখন কোন বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে তাকে গতিশীল বস্তু বলে। আর যে প্রক্রিয়ায় এই পরিবর্তন ঘটে তাকে বলে গতি। বিশ্বজগতের প্রত্যেকটি বস্তুই গতিশীল। কিন্তু আমরা গতির ধর্ম বদলে দিয়েছি। আমরা একদল মানুষকে গতিহীন করে রেখেছি, আমাদের সমাজে, আমাদের চারপাশেই। সমাজের একদল গতিহীন লোক চলন্ত ট্রেনের গতির উপর ক্ষুব্ধ হয়ে এই দুর্গতি ডেকে আনছে। পাথর ছুঁড়ে কারা? সন্দেহের তীর কাঁচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দিকে ছুঁড়লে হয়তো একটা ‘আপাত সমাধান’ মিলবে। কিন্তু, আমরা নিজেরা যারা সমাজের ঘি-মাখন খেয়ে বেড়ে উঠছি, যারা দুর্বার গতির ট্রেনে চড়ে গতিশীল লাইফ লিড করছি, তাদের দিকে তীর ছোঁড়ার সময় বোধহয় সমাগত। যে সমাজে দুই শ্রেণীর জন্য দুই ধরনের গতি, সে সমাজে সুবিধাভোগী হিসেবে আমার-আপনার কপালে দুর্গতিই কি প্রাপ্য নয়? সমাজ থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর না হলে সমাজে কি সার্বিক গতি আসবে? যে গতির চাকায় দুনিয়া দৌড়ে চলছে বাংলাদেশ কি সেই গতি থেকে ছিটকে পড়ছে? রাষ্ট্রের হর্তাকর্তার মতিগতি বোঝা ভার, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই গতি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমার-আপনারও কোন অংশে কম নয়। সমাজের সর্বাংশে ‘দ্রুতগতি’ ফিরলেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উক্তি ‘গতিই জীবন, গতির দৈন্যই মৃত্যু বাস্তব হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে’। সমাজের গতিহীন মানুষগুলোর পেশীতে গতি ফিরিয়ে দিয়ে সমাজে প্রগতি আনতে পারলেই হয়তো এই দুর্গতি দূর হতে পারে!
ঘণ্টায় সত্তর কিলোমিটারের গতি যাদের জীবনে নাই, ট্রেনের গতি এবং এই গতির মধ্যে স্থির যাত্রীদের প্রতি সমাজের ধীরগতির মানুষের হিংসা, রাগ, ক্ষোভ, কৌতূহলমিশ্রিত পাথর পড়লে অবাক হওয়ার কী আছে?
লেখক:শিক্ষক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: rajibndz¦gmail.com