[ নি র্বা চ ন ]

নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা কাটাতে হবে

বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী। বাঙালির গণতন্ত্র চেতনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। সাত শতক জুড়ে একশ বছরের টানা অরাজকতা অর্থাত্ মাত্স্যন্যায়ে বিপর্যস্ত মানুষ শেষ রক্ষার জন্য গণতন্ত্রের আবিষ্কার করেছিল। আট শতকে বাংলার অভিজাতরা দেশের মুক্তির জন্য নির্বাচন করে সিংহাসনে বসিয়েছিলেন গোপালকে। নির্মোহ মানুষের নির্বাচন ভুল হয় না বলে গোপাল যোগ্যতার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন। শক্ত হাতে শত বছরের অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটাতে পেরেছিলেন। চারশ বছর স্থায়ী প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী পাল রাজবংশের পত্তন করতে পেরেছিলেন। এভাবেই বাঙালির মনোজগতে গণতান্ত্রিক বোধ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ১৯৬৯ এ আইউব বিরোধী আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। এই উত্তপ্ত কড়াইয়ে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতাসীন হন। তিনি বুঝেছিলেন বা তার বুদ্ধিদাতারা বুঝাতে পেরেছিলেন যে বাঙালি গণতন্ত্র প্রিয় মানুষ। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতরে ব্যস্ত করে দিতে পারলে আপাতত আগুনের উত্তাপ থেকে বাঁচা যাবে। তাই ঘোষণা দিয়ে দেয়া হলো সত্তরের নির্বাচনের। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষও ব্যস্ত হয়ে পড়লো নির্বাচন নিয়ে। সংসদীয় গণতন্ত্রের এদেশে গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করানো, এর পরিমার্জনা করার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব রাজনীতিবিদগণের। তাদের ব্যর্থতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ভিত্তি গণতন্ত্র হলেও স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে সঠিক অর্থে গণতন্ত্রকে পরিমার্জনা করতে পারেননি আমাদের ক্ষমতাপ্রিয় রাজনীতিকরা। দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধীশ্বর হতে চাওয়ার প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তি দিতে পারেনি। এই ক্ষরণ প্রতিনিয়তই দৃশ্যমান। আমাদের রাজনীতিকদের গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চার ব্যর্থতা ২০০৭-এ ডেকে এনেছিল এক এগারো। গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ডেকে এদেশের মানুষ কবরের শান্তি খুঁজবে না। শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে গণতান্ত্রিক পথেই। আজ আমরা রাজনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়ে গভীর শঙ্কায় কালাতিপাত করছি। যে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে আমাদের ক্ষমতা প্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোই। তাই সকল তমসার অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রের পথ কুসুমাস্তীর্ণ করার প্রধান দায়িত্ব রাজনীতিকদেরই। আমরা বিগত বিশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা স্মরণ করতে পারি। তখনকার সরকার কখনও নির্বাচন সম্পর্কে জনগণের সামনে কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। শুরু থেকেই বলে এসেছে তারা ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচন সম্পন্ন করবে এবং সবশেষ দেয় ধারণায় ২০০৮-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন। কিন্তু এতসব খোলসা ধারণা দেয়ার পরও প্রথমে রাজনীতিবিদ ও পরে রাজনৈতিক কর্মী ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মনে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে শঙ্কার দোলা দেখা দিচ্ছিল। এই শঙ্কা শুধু যে সরকার বা নির্বাচন কমিশনের আচরণ থেকে জন্ম নিয়েছিল তাই নয়—রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণও মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত করছিল মানুষকে। একথা স্পষ্ট যে, একটি বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেই বিশেষ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। আজ রাজনৈতিক নেতারা যত কথাই বলুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পথ তারাই অনিবার্য করে তুলেছিলেন। বিএনপি নেতৃত্ব থেকে সেসময় বলা হয়েছিল ১১ জানুয়ারির ঘটনা এবং জরুরী অবস্থা জারি ছিল পূর্ব পরিকল্পিত অর্থাত্ এই সরকার গঠনের রূপকারদের পরিকল্পনামাফিকই যাবতীয় পরিপ্রেক্ষিত রচিত হয়েছিল। এই তথ্য সত্য মানলে বলতে হবে ফখরউদ্দিন আহমদদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা এর অন্তরালের চালক যারা তাদের ক্ষমতা, দূরদৃষ্টি আর কুশলী মেধার কাছে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের ডাকসাইটে নেতারা শিশুতুল্য। কারণ এই অধরা অদেখা কুশীলবরা যেন বিএনপিকে গোপনে বুদ্ধি দিয়েছিল ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য তোমাদের লাখ লাখ ভুয়া ভোটার বানাতে হবে। আজ্ঞাবহ পুতুল সাবেক বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বানাতে হবে। মাননীয় রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহাম্মদকে একই সাথে রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানাতে হবে। পাতানো নির্বাচন পরিচালনার জন্য সারাদেশে দলীয় ক্যাডারদের ছড়িয়ে দিতে হবে।—আর সে ফাঁদে পা রেখে কলের পুতুলের মতো এসব অন্যায় করে বিএনপি নিজের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভের পটভূমি তৈরি করেছিল। আবার এই অদেখা শক্তিই আওয়ামী লীগকেও যেন কানে কানে বলে দিয়েছিল বিএনপির ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করার জন্য এবং ক্ষমতার মসনদে বসার পথ নিষ্কণ্টক করার জন্য নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে থাকলে চলবে না। নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে হবে। হরতালে হরতালে অর্থনীতির চাকা থামিয়ে দিতে হবে। লাঠি বৈঠা নিয়ে মাঠে নামার উত্তেজনা ছড়াতে হবে। চর দখলের লাঠিয়ালের মতো বিএনপি আওয়ামী লীগকে রাজপথে মুখোমুখি হতে হবে। বিএনপি নেতাদের আবিষ্কার করা এই ‘অন্তরালের শক্তি’ সময়ের সুবিধা নেয়া জামায়াতের কানে মন্ত্র দিয়ে দিয়েছিল উত্তেজনার মাঝখানে বারুদ ছড়িয়ে দিয়ে বল, ‘বাঁচলে গাজী-মরলে শহীদ’। এভাবে মানবতা বিপন্ন হোক। রক্তাক্ত হোক রাজপথ। তার মধ্যদিয়ে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলে এবং জরুরী অবস্থা জারি করলে তিক্তবিরক্ত মানুষ একে স্বাগত জানাবে। এমন আবিষ্কার সত্য হলে মানতে হবে এভাবে সব দলের রাজনীতিকদের ঘোল খাইয়ে সে সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রকরা সফল হয়েছিল! বর্তমান বাস্তবতায় এসে আমাদের রাজনীতিক দলগুলোর পারস্পরিক অনমনীয় মনোভাব গণতন্ত্রের ভবিষ্যেক আবার তমসাচ্ছন্ন করে তুলছে। বড় দলগুলোর আচরণ অনেককে বিরক্ত ও হতাশ করায় সে াতের শ্যাওলা ধরার মত কেউ কেউ এক এগারোর প্রতিচ্ছবিকে ফিরে পেতে চাচ্ছে মন্দের ভালো হিসেবে। মানুষের এমন মনোভাব রাজনীতিকদের জন্য লজ্জার। গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তিতে রাখতে চাইলে সংসদীয় রীতিতেই ক্ষমতার পালা বদল হতে হবে। অন্যকোনো বিকল্পে নয়। রাজনীতি যেভাবে ক্রমাগত যুক্তিহীন ও অমানবিক হয়ে উঠছে এর থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। রাজনীতিতে টাকার খেলা আর শক্তি প্রয়োগ যেন এখন মুখ্য হয়ে গেছে। এভাবে দুর্নীতির পাহাড় রচনা করার আচরণ দেশের ভবিষ্যেক গাঢ় অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের নামে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের কবর রচনা করছে। একারণে আমরা চাই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বোধদয়। নেতৃত্ব যদি যৌক্তিক আর নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ফিরে আসেন, নিজেদের আচরণের আমূল সংস্কার করে যদি প্রকৃত গণতন্ত্রমুখী হতে পারেন তবে বিপন্ন জাতি নতুন করে আশার ঘর বাঁধতে পারে। হিসেবমত জাতীয় সংসদের নির্বাচন আসন্ন। তবুও দুই ক্ষমতাপ্রিয় দল সমঝোতার কথা না বলে পুরোনো কাসার ঘন্টাই বাজাচ্ছে। এতে রাজনীতিকদের গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে না। এটি ঠিক রেওয়াজ তৈরি হয়ে গেছে যে, গণতান্ত্রিক আদর্শ যাইহোক সরকারি দল নির্বাচনের কাঠামো, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া নিজেদের মত সাজাতে থাকে। জনমন রঞ্জনে মনযোগ না থাকায় সকলেই যেন জনআস্থা বোধ করেন না। তাই নির্বাচন সাজাতে নানা কৌশল গ্রহণ করেন। অতীতে বড় দুই দল এমনি অভিন্ন পথে হেঁটেছে। তাই নির্বাচন এলেই দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। নেতৃত্ব এতটাই দুর্বল ও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যে, গত নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন পেয়েও আত্মবিশ্বাসী হতে পারেনি আওয়ামী লীগ। দিনবদলের কথা বলেও শেষে দিনবদলের পথে পা ফেলতে সাহসী হয়নি। গত প্রায় পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উন্নয়নমূলক কাজে সাফল্য দেখিয়েও মানুষের সামনে সবলে দাঁড়াতে পারছে না। এর কারণ না খুঁজে এবং সেইমত আত্মশুদ্ধির পথে না হেঁটে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের পথে নিজের অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে। বিএনপির আদর্শিক জায়গা কখনো স্পষ্ট ছিল না। বারো রকম আদর্শিক মানুষের যূথবদ্ধতা কখনো টেকসই হয় না। তারমধ্যে জামায়াত ও হেফাজতের সুবিধা নিতে গিয়ে নির্বাচনের আগে মৌলবাদী দলগুলোর আশ্রিতই যেন হয়ে পড়েছে বিএনপি। ফলে অনেক হরতাল, অবরোধ আর অরাজকতা উপহার দিয়েও কার্যকর আন্দোলন শানাতে পারেনি। সামনের অক্টোবরে ঘোষিত প্রতিরোধ আন্দোলনে নামলেও জনদুর্ভোগ বাড়ানো ছাড়া সরকারকে খুব বেশি দুর্বল করতে পারবে না বিএনপি। নির্বাচন করার ক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থায় সাংবিধানিক ও আইনগত শক্তি সরকারের পক্ষে রয়েছে। বিএনপি একা এই নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হলে আঠারো দলের বাদবাকীদের নিয়ে ভাববার তেমন কিছু নেই সরকার পক্ষের। কিন্তু গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপির মত অন্যতম প্রধান দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন কখনো স্বস্তি দিতে পারে না। আবার দলীয় সংহতির স্বার্থে বিএনপিরও নির্বাচন করা জরুরী। একারণে অল্প ক’মাস হাতে থাকতে আন্দোলনের নামে সময় নষ্ট করা বিএনপির জন্য কল্যাণের হবে না। শান্তিপ্রিয় মানুষও তা সহজভাবে নেবে না। এমন আত্মঘাতী পথে বিএনপি হাঁটবে না বলেই আমরা বিশ্বাস করতে চাই। দেশের রাজনীতি যতটাই বিপন্ন দশায় যাক না কেন মানুষ গণতন্ত্রের অপমৃত্যু চায় না। তাই তৃতীয় কোনো শক্তি এসে রাজনীতিকদের ব্যর্থতার দায় গ্রহণ বা সুযোগ গ্রহণ করুক তা কেউ চাইবে না। একারণেই এদেশের মুক্তমনের মানুষ মনে করে দলীয় সংহতি রক্ষার জন্য হলেও সকল পক্ষকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনমুখী হতে হবে। উভয়পক্ষের সৃষ্ট অচলায়তন ভাঙ্গতে হবে। ছাড় না দিয়ে সমঝোতা হয় না। দুই নেত্রীর মুখ দেখাদেখি বন্ধ হলেও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে কাছাকাছি আসার বিকল্প নেই। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে তা কাটানোর দায়িত্ব রাজনীতিকদের। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের দলীয় সরকারের ধারণা থেকে যেমন আওয়ামী লীগকে কিছুটা সরে আসতে হবে। বিএনপিরও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় থাকলে চলবে না। দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থের চেয়ে জনগণকে গণতন্ত্র উপহার দেয়া অনেক বড় কর্তব্য রাজনীতিকদের। আমরা আশা করবো সমস্ত অনিশ্চয়তা কাটিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত সমঝোতার উঠোনে এসে নির্বাচনকে নিশ্চিত করবে। লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় shahnawaz7b@gmail.com