মানবিকতাহীন ন্যূনতম মজুরি
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩৯
দেশের গণমাধ্যমের খবরে জানা যায় আন্তর্জাতিক ঋণমাণ সংস্থা মুডি’স-এর রেটিং-এ বাংলাদেশের অর্থনীতি চতুর্থবারের মতো বিএ-থ্রি রেটিং অর্জন করেছে, যা অর্থনীতির সুষ্ঠু ও জোরালো অগ্রগতির জন্য স্বীকৃতি। তাত্ক্ষণিক ঝুঁকি মোকাবেলায় অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের এই সার্বভৌম রেটিং নির্ধারণ করেছে মুডি’স। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ‘ঋণ পর্যালোচনা: বাংলাদেশ’ শীর্ষক মুডি’স-এর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল। চলতি হিসাবের ভারসাম্য (কারেন্ট একাউন্ট ব্যালান্স) উদ্বৃত্তাবস্থায় ফিরে এসেছে। অপরদিকে মূল্যস্ফীতিও কমেছে। এ নিয়ে পরপর চারবার বাংলাদেশ একই রেটিং পেল, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির চলমান অগ্রগতি প্রকাশ করে। তবে শ্রমিক অসন্তোষ এবং ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এপ্রিলের ২৫ তারিখ যখন এই প্রতিবেদন সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত হয় তার একদিন আগেই ঘটে সাভারের ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। যেন জীবন দিয়ে তালিকায় থাকা। যেন প্রাণের বিনিময়ে সূচক ধরে রাখা।
শিল্প-কারখানা দুর্ঘটনার ইতিহাসে ভয়ঙ্করতম রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক খাত নিয়ে দেশে ও বিদেশে নানা ধরনের সমালোচনার তীর থাকে বাঁচার জন্য মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়ে মালিক পক্ষ দায়মুক্তির পথ খুঁজে পায়। ধসের ধূলোর আস্তর কমে যাওয়ার সাথে সাথে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে মালিকপক্ষ থেকে দেয়া মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাবে। এর ভিত্তিতে মালিকরা প্রস্তাব করেছেন, পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ২০ শতাংশ বা ৬০০ টাকার বেশি বাড়াতে পারবেন না।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) মজুরি বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে নিম্নতম মজুরির পরিমাণ দাঁড়ায় তিন হাজার ৬০০ টাকা। এর মধ্যে মূল মজুরি ২৪০০, বাড়ি ভাড়া ৯৬০ ও চিকিত্সা ভাতা ২৪০ টাকা। নিম্নতম মজুরি বোর্ডের পঞ্চম সভায় বিজিএমইএর পক্ষে এই লিখিত প্রস্তাব দেন বোর্ডের সদস্য ও সমিতির পরিচালক প্রতিনিধি আরশাদ জামাল। ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডের এই সভায় সভাপতিত্ব করেন বোর্ডের চেয়ারম্যান এ কে রায়। এদিকে শ্রমিকপক্ষের আট হাজার ১১৪ টাকার প্রস্তাবের বিপরীতে বিজিএমইএ-এর মাত্র তিন হাজার ৬০০ টাকার পাল্টা প্রস্তাবকে অযৌক্তিক বলেছেন মজুরি বোর্ডের দুই সদস্য শ্রমিকনেতা ফজলুল হক ও সিরাজুল ইসলাম। মালিকপক্ষের প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ করেন তাঁরা।
সভা শেষে জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি ফজলুল হক সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে কোনো সুস্থ মানুষ বিজিএমইএ-এর প্রস্তাব মেনে নিতে পারেন না। আর জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, আশা ছিল মালিকপক্ষ ভালো একটি মজুরির প্রস্তাব দেবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা যেটি দিয়েছেন, সেটি অমানবিক। মালিকপক্ষের প্রস্তাবের পক্ষে আরশাদ জামাল বলেন, ‘শ্রমিকদের দাবির যৌক্তিকতা মেনে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার সামর্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে এবং পোশাকশিল্পের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই প্রস্তাবটি দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা শ্রম আইনের ৪১ ধারার উত্পাদন খরচ, উত্পাদিত দ্রব্যের মূল্য ও শিল্পের সামর্থ্য বিবেচনা করব। দুর্জনের যেমন ছলের অভাব হয় না মালিক পক্ষেরও দায় এড়ানোর জন্য শ্রম আইনের ধারা-উপধারার আশ্রয় নেয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা যায় না।
নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সাবেক সভাপতি ইকতেদার আহমেদ বলেন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই মজুরি পুনঃনির্ধারণ করতে হয়। এই কাজের দায়িত্ব মজুরি বোর্ডের। আর মজুরি বোর্ড একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। তবে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি না করলে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এই বোর্ড কাজ করতে পারে না। সময় সময় সরকার বিভিন্ন খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য নির্দেশনা জারি করার পর বোর্ড কাজ করে। সর্বশেষ ২০১০ সালে এই বোর্ড বিভিন্ন খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল তৈরি পোশাক খাত। তিন বছর পর আবার এই খাতের মজুরি পুনঃনির্ধারণের কাজ শুরু হয়েছে। ২০১০ সালে তিন হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি করা হয়েছিল। কিন্তু তখন ওই টাকায় যা কেনা সম্ভব ছিল, এখন তিন হাজার ৬০০ টাকায় কি শ্রমিকদের পক্ষে তা কেনা সম্ভব? কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি। মালিকপক্ষ মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে মিলিয়ন মজুরি বাড়ানোর যুক্তি দিচ্ছে। অথচ ২০১০ সালে আমরা যখন প্রস্তাব করেছিলাম যে প্রতিবছরই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে মজুরি বাড়াতে হবে, তখন পোশাকশিল্পের মালিকরা তা মেনে নেননি। আবার সরকার মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) যে নতুন হিসাব প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায় যে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪৪ ডলার। তার মানে এখনকার বাজারদরে ৮০ হাজার টাকার মতো। সে হিসাবে মাসে সাড়ে ছয় হাজার টাকার বেশি। এ বিবেচনায়ও মালিকদের প্রস্তাব অত্যন্ত কম।
ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের আয়োজনে প্রতি চার বছর পরপর পৃথিবীর সব দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার একটি ফোরাম। জেনেভায় জাতিসংঘ দপ্তরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জুনে যে পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, তাতে সাভারের ভবন ধসের ঘটনায় এগারশোর বেশি পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টিকে বৈশ্বিক জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়। সেইসাথে মানবাধিকার সচেতন পশ্চিমা দেশের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সরকার ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোকে সস্তা শ্রমের কারণে বাংলাদেশের পোশাক কেনার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে। দুনিয়ার নামী-দামী ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে আসার একমাত্র কারণ সস্তা শ্রম। যেখানে পাশের দেশ শ্রীলঙ্কায় একজন শ্রমিককে ঘণ্টায় ৪৫ সেন্ট মজুরি দিতে হয়, সেখানে বাংলাদেশে দিতে হয় ২৫ থেকে ২৭ সেন্ট। এই মজুরি চীনে ৫০ সেন্ট আর পাকিস্তানে ৫৫ থেকে ৬০ সেন্ট। ভারতে ঘণ্টায় ৭০ সেন্টের নিচে কোনো শ্রমিক পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশে একজন তৈরি পোশাক শ্রমিক মাসে গড়ে সর্বনিম্ন ৩৫ ডলার আর সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৮০ ডলার আয় করে। তাই ক্রেতারা এখানে ছুটে আসেন। আর এর নীতিহীন সুবিধাটা নিয়ে থাকে মালিকপক্ষ। ব্যবসাতে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ মালিক অস্বাভাবিকভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চান সর্বনিম্ন মজুরি দিয়ে শিল্প চালানোর মাধ্যমে। ন্যূনতম মজুরির ন্যায্যতা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অন্যতম রক্ষাকবচ। মজুরি বাড়ানোর প্রসঙ্গ উঠলেই মালিকরা একটি কথাই বলেন, ‘সব খরচ দিয়ে তো আমরা তাহলে ব্যবসা চালাতে পারবো না। ব্যবসাটা তাহলে অন্য দেশে চলে যাবে’। প্রতিবেশী দেশ ভারতে সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে রুপির দরপতনের বিষয়টিও তারা আজকাল উদাহরণ হিসেবে ব্যাপক টানছেন। কিন্ু্ত যে বিষয়টি মালিকেরা স্বীকার না করলেও সবাই জানে তা হলো স্বল্প মজুরির এই ‘গার্মেন্টস কর্মীরা’ই ‘মালিক’দের শান-শওকতের আহ্বায়ক। তাদের ভীষণ সস্তা এক ফোঁটা দুই ফোঁটা ঘামই ব্যালেন্স বাড়ায় মালিকপক্ষের অভিজাত জীবনে। তাই বিষয়টা যদি এতই লোকসানের হবে তাহলে বলুন তো এত এত ছোট-বড় গার্মেন্টস কারখানা গড়ে উঠছে কোন ভরসায়?
লেখক :আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
Khaliik@yahoo.com