বিকল্প শিশুখাদ্য ও শিশুর নিরাপত্তা
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৫৫
বিশ্বব্যাপী শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হইয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলির বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। বেশিরভাগ দেশেই শিশুদের অবস্থা এতোই করুণ— এতোই মর্মস্পর্শী যে, তাহা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। দুঃসহ দারিদ্র্যই যে ইহার প্রধান কারণ তাহাতে সন্দেহ নাই, তবে একমাত্র কারণ অবশ্যই নহে। এই ক্ষেত্রে শিশুদের প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা, উপেক্ষা ও উদাসীনতার অবদানও যে কোনো অংশে কম নহে— তাহা অনস্বীকার্য। বরং ক্ষেত্রবিশেষে তাহা যে দারিদ্র্যের ভয়াবহতাকেও ছাড়াইয়া যাইতে পারে— এমন উদাহরণও ভুরি ভুরি। বাংলাদেশও ইহার ব্যতিক্রম নহে। যেইসব কারণে শিশুর নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হইতে পারে তন্মধ্যে বিকল্প শিশুখাদ্য নিঃসন্দেহে অন্যতম। মায়ের দুধের বিকল্প হিসাবে বিভিন্ন ধরনের শিশুখাদ্যের ব্যবহার যে এখন আর শুধু উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। একদিকে চটকদার বিজ্ঞাপন এবং অন্যদিকে বাস্তবতার চাপে পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত বিশালসংখ্যক শ্রমজীবী মায়েরাও ক্রমবর্ধমান হারে এই ধরনের খাদ্যের উপর নির্ভরশীল হইয়া পড়িতেছে। ফলে বিকল্প শিশুখাদ্যের বাজারও ফুলিয়া-ফাঁপিয়া উঠিতেছে বিশ্বব্যাপী। সেইসাথে বাড়িতেছে নিরাপত্তার ঝুঁকিও। আর তাহা কতোটা বিপজ্জনক হইতে পারে চীনের আলোড়ন সৃষ্টিকারী মেলামাইন কেলেঙ্কারির ঘটনাতেই তাহা স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। কৃত্রিমভাবে ভেজাল দুধের ঘনত্ব বাড়াইবার জন্য তাহাতে মেলামাইন মিশাইয়াছিল অসাধু ব্যবসায়ীরা। আর এই অসাধুতা শত শত শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া দিয়াছিল। বলা বাহুল্য, শিশুদের জীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলার ইহাই একমাত্র উদাহরণ নহে।
সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের শিশুদের ঝুঁকি যে শতগুণ বেশি— তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। প্রাণঘাতী ফরমালিন ও ডিডিটি হইতে শুরু করিয়া বিপজ্জনক সব রাসায়নিক মিশানো হইতেছে দুধসহ বিভিন্ন খাবারে। ব্যাপক শোর-চিত্কার করিয়াও কোনো ফল হইতেছে না। ভেজালের দৌরাত্ম্যে বড়োরাই যেইখানে দিশেহারা হইয়া পড়িয়াছে সেইখানে শিশুরা নিরাপদ থাকিবে কিভাবে? এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হইয়াছে ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য এবং উহা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) বিল ২০১৩’। বিলটির তাত্পর্যপূর্ণ দিক হইল, এই বিলে বিকল্প শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপনই শুধু নিষিদ্ধ করা হয় নাই, একই সাথে এই ধরনের খাদ্য মায়ের দুধের বিকল্প— এমন ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সকল কর্মসূচির উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হইয়াছে। সর্বোপরি, বিকল্প শিশুখাদ্য এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদিত শিশুখাদ্য গ্রহণজনিত মৃত্যু, অসুস্থতা কিংবা স্বাস্থ্যহানির জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হইয়াছে দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। আইনটি যে প্রয়োজনীয় ও জনহিতকর তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে আইন থাকিলেই যে সকল সমস্যার সমাধান হইয়া যাইবে তাহা মনে করিলে ভুল হইবে। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে ‘দ্য ব্রেস্ট মিল্ক সাবস্টিটিউটস (রেগুলেশন অফ মার্কেটিং) অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪’ নামে প্রায় অনুরূপ একটি অধ্যাদেশ আগে হইতেই বলবত্ আছে।
বস্তুত আমাদের সমস্যা ত্রিবিধ। প্রথমত, আইনের সঠিক প্রয়োগ হয় না। দ্বিতীয়ত, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহ আইনের তোয়াক্কা করে না। তৃতীয়ত, ভুক্তভোগী জনগণের মধ্যেও নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাব অত্যন্ত প্রকট। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইন যতো ভালোই হউক, তাহার উদ্দেশ্য সফল হয় না। সমস্যা সমস্যাই থাকিয়া যায়। মনে রাখিতে হইবে যে, আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা মজ্জাগতভাবেই দুর্বল। তদুপরি আছে দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতার মতো গুরুতর সব প্রতিবন্ধকতা। অতএব, শুধু আইনের উপর ভরসা করিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ, ভেজাল, ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নমানের শিশুখাদ্যের আগ্রাসন হইতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করিতে হইলে ভুক্তভোগী জনগণকেও আরও সচেতন ও সোচ্চার হইতে হইবে। বিশ্বব্যাপী ইহা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নাই। সরকারের দায়িত্ব হইল, এই ব্যাপারে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। সর্বোপরি, সদ্য পাস হওয়া আইনটির যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।