রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের উন্নয়নে বাধা
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:৫৮
সুজলা সুফলা বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা আরো তর তর করে এগিয়ে যেতে পারে, যদি এদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে যায়। যদিও আমাদের দেশে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার ১.৪১ (সূত্র).. কিন্তু অভিবাসনের হার বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের জনসংখ্যার বৃদ্ধি ততটা উপলব্ধি করা যায় না। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বৈদেশিক বিনিয়োগ নিতান্তই কমে যায়। যা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং প্রধান বিরোধী দলের পারস্পরিক অসহনীয় আচরণের কারণে দু’দলই উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই ইশতেহার মোতাবেক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দেখা যায় যে, রাজনৈতিক দলগুলো জাতির কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলেও তাদের কোন লজ্জাবোধ হয় না। উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য বিরোধী দলের সংসদে বসে তত্পরতা দেখানো এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকারি দলকে চাপ প্রয়োগ করার কথা ছিল। কিন্তু তারা বছরের পর বছর তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা অনোন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রবাহিত করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করেছেন। অথচ তারা সংসদ সদস্য হিসেবে সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন এটা কি এক ধরনের দুর্নীতি নয়? কোন কোন ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে নারী উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছেন। অথচ একটি জাতি নারী ও পুরুষ সমান তালে অংশগ্রহণ না করলে উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে না।
যেহেতু বাংলাদেশের শতকরা ৫১ ভাগ নারী তাই এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের ধারা থেকে দূরে রেখে জাতির উন্নয়ন ভাবাই যায় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে ও সমাজ উন্নয়নে নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমান তালে অংশীদারিত্ব দরকার অথচ কোন কোন রাজনৈতিক দল ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের ঘরে ফিরিয়ে নিতে চায়। এ সকল অনোন্নয়নশীল দলের পক্ষে বড় দলের সহায়তা নারীর উন্নয়নের পথকে আরো নাজুক করে তোলে। প্রকৃত গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক সংঘাত বন্ধ করা একান্ত জরুরি। দুটি বড় দল যখন সংঘাতে লিপ্ত সে ফাঁকে খাদ্যদ্রব্য তথা অন্যান্য জিনিসের ঊর্ধ্বমুখী অস্বাভাবিক মূল্য জনগণকে একধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানীকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় কতিপয় পণ্যের বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ইত্যাদির অস্বাভাবিক চড়া মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের রেকর্ড পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধি দেশের মানুষকে দিশেহারা করে তুলেছে। অথচ বড় দুটি রাজনৈতিক দলেরই এ নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং সামাজিক অর্থনৈতিক স্থিতি বজায় রাখতে তত্পর অথচ বড় দুটি দলেরই এসব বিষয়ে কাজ করার জন্য শিথিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিদেশি রেমিট্যান্স প্রবাহে ঊর্ধ্বগতির লক্ষ্যে বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য যত বেশি কাজ করার প্রয়োজন তা তো হচ্ছে না বরং এক দল অপর দলকে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির কারণে এ গতিতে মন্থরতা দেখা দিয়েছে। পুঁজি বাজারে গতিশীলতা এবং রপ্তানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে যত বেশি সময় ও কর্মতত্পরতা দেখানো দরকার ঠিক সেভাবে তা হচ্ছে না। জনপ্রশাসনের জবাবদিহিতা নিয়ে উভয় দলেরই তেমন কোন মাথাব্যথা নেই। শিল্পখাতে ঋণ বিতরণ ও ঋণ আদায় পরিস্থিতিতেও নাজুক অবস্থা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুত্ ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নয়ন ঘটলেও গ্যাসের সরবরাহ দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে এতে করে জনগণের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিছু কিছু এলাকায় তিন-চার ঘণ্টার মত গ্যাস সরবরাহ থাকে সে সময়গুলো অনেক ক্ষেত্রে গৃহকর্ত্রী চাকরিরত থাকায় ঘরের বাইরে থাকেন এ জন্য তারা নিজেদের খাবার রান্না করে খেতে পারে না। এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে যাদের সাধ্য আছে আলাদাভাবে বসুন্ধরা এল পি গ্যাস কিনে রান্না করছেন। কিন্তু যাদের সাধ্য নেই তারা তাদের ঘুম নষ্ট করে মধ্যরাতে উঠে দু’এক পদ রান্না করে খাচ্ছে। অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী, যারা বাংলাদেশে কোটি কোটি টাকা উন্নয়ন ও শিল্প খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে তাদের বিনিয়োগ অনেক বেড়ে যেত এবং সমন্বিত শিল্প খাতে ক্রমবর্ধমান উন্নতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিলক্ষিত হত। একই সাথে সমন্বিত সেবা খাতের অবদান বহু গুণ বৃদ্ধি পেত। সামষ্টিকভাবে অর্থনৈতিক কাঠামোগত সামঞ্জস্যতা উন্নয়নের চাবিকাঠি। এ ক্ষেত্রে দ্রুত দারিদ্র্যতা কমিয়ে আনা ও উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বাড়াতে হবে। একই সাথে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন নীতি ও কৌশল সময়ানুুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই দেশের জনগণের গড় আয়, পুষ্টি মান বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়ন, মানবাধিকার, বাস্তবায়ন দুর্নীতি রোধ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সরকার অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশের সরকারি ও বিরোধী দলের কাছে আমার আকুল আবেদন কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি ও সহিংসতা পরিহার করে দেশমাতার উন্নয়নে মনোনিবেশ করুন।
লেখক :নির্বাহী পরিচালক, ইন্টারন্যাশনাল কালচার ইউনিভার্সিটি ঢাকা