প্রশাসন
শত্রু ভাববেন না
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৬
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সাথে এক সমন্বয় সভায় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা সচিবরা অনেক মারাত্মক কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, এখন মানুষ মনে করে আওয়ামী লীগ উন্নয়নের পাশাপাশি অপকর্মও করেছে, জনগণ এর বিচার চায়। ইতিপূর্বে প্রধানমন্ত্রীর সাথেও সচিবরা সভা করেছেন। সেই সভায় অনেকে নাকি আবেগ আপ্লুত হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, আপনার সান্নিধ্যে এলে বঙ্গবন্ধুর স্পর্শ পাই, আপনার নেতৃত্বে উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভেসে যাচ্ছে ইত্যাদি। এই ঘটনার অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে তারাই কেমন সব সাংঘাতিক মন্তব্য করলেন। আসলে এমনটিই বোধ হয় হবার কথা। কারণ একটি সরকারের নবীন বয়সে অনেকেরই অনেক চাওয়া পাওয়া পূরণের সম্ভাবনা থাকে। আর নানা চড়াই-উত্রাই শেষে সেই সরকারের মেয়াদ যখন ফুরিয়ে আসে তখন তার দোষত্রুটি খুঁজে বের করার লোকেরও অভাব হয় না। গত চার বছরে মাঝে-মধ্যে আমি প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে গিয়েছি। সেখানে কারো সাথে দেখা করার জন্য কখনও কখনও ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। সে অবস্থায় প্রথমদিকে যেসব আমলাকে মন্ত্রী উপদেষ্টা বা সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ দেখেছি, শেষদিকে তাদেরকেই আবার ভিন্নসুরে কথা বলতে শুনেছি। ইতিপূর্বে সেইসব আমলার অনেকেই পদোন্নতি পেয়েছেন। এমন একজনকে তার পদোন্নতি পাওয়ার কথা বলায় তিনি বললেন, এটা আমার প্রাপ্য এবং এই সচিবালয়ে না থাকলেও তিনি তা পেতেন। কথাটি হয়তো ঠিক কিন্তু তিনি কথাটি এমনভাবে বললেন যে, পদোন্নতি যারা দেন তারা যেন নিতান্তই তুচ্ছ। অথচ প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে বসে ঐ ব্যক্তিকে যে কত প্রকার সুপারিশ করতে দেখেছি, তার দেশগ্রাম হতে আগত লোকজনকে সুবিধা পাইয়ে দেবার জন্য কতখানে যে ফোন করতে দেখেছি সে হিসেব কে রাখে? এখন ঐসব সরকারি কর্মকর্তার মুখের বয়ান শুনলে তাজ্জব না হয়ে পারা যায় না। এতোদিন তারা যেসব রাজনৈতিক বসের অধীনে কাজ করে সুবিধা নিয়েছেন, পদোন্নতি পেয়েছেন বর্তমানে তাদের ভুলত্রুটির পোস্টমর্টেম করে সেসব নিয়ে মুখরোচক আলোচনাই যেন ঐসব আমলার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদরে দোষ দিয়েই বা লাভ কি? কারণ স্বাধীনতার পর হতে এমনটিই চলে আসছে। সরকার আসে সরকার যায়, আর আমলারাও ভোল পাল্টায়। তথ্যমন্ত্রীর সাথে আলাপকালে আওয়ামী লীগের অপকর্মের বিচার চাওয়ার বিষয়টি আমলাদের পুরাতন মানসিকতারই প্রতিফলন। এক্ষেত্রে আমি সরকারি আমলাদের উদ্দেশেও একটি কথা বলবো, তা হলোঃ সরকারের অপকর্মের দায়কি, সরকারে যারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন শুধুমাত্র তাদের, নাকি সচিব হতে শুরু করে সহকারি সচিবসহ অন্যান্য আমলা যারা এমপি-মন্ত্রীদের বুদ্ধি পরামর্শ দেন, তাদের সাথে কাজ করেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে ফায়দা লোটেন তাদেরও কোন দায়দায়িত্ব আছে? একথা তো মিথ্যা নয় যে, একশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা দিনরাত তোষামোদ তৈলমর্দনের মাধ্যমে মন্ত্রী, এমপিদের দিয়ে অনেক কাজ বাগিয়ে নেন। যার অন্যতম নিজেদের পদোন্নতি বাগানো। সেদিন কথা প্রসঙ্গে একজন বলছিলেন, দেশের ৬৪টি জেলার জেলা প্রশাসকদের বারান্দায়, কোর্ট-কাচারি, আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর ধরে জনসাধারণ যেভাবে হয়রানির শিকার হন, সরকারি কর্মচারীদের কাছে কাজ পেতে যেভাবে তাদের ঘুষের টাকা গুণতে হয় এতে করেও সরকারের ভীষণ দুর্নাম হয়। জনগণ এসব সরকারি কর্মকর্তারও বিচার চান। একটি সাধারণ ঘটনায় একজন এডিসি সাহেবের দপ্তরে একটি মিস কেস করলে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। এক টুকরো জমি খরিদ করে নামজারি করাতে গেলেই একজন সহকারী সচিবের দপ্তরে ঘুষের টাকা গুণতে হয়। আদালতে বিচার পেতে নিরীহ মানুষকে নায়েব পেশকারের হাতে ঘুষের টাকা তুলে দিতে হয়। আর এসব কারণেও যে জনগণ সরকারের উপর বীতশ্রদ্ধ হয় সে বিষয়সমূহও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আর সরকার পরিচালনায় সচিব সাহেবদেরও যে বিরাট ভূমিকা থাকে, এইসব ঘুষ, দুর্নীতি অনাচার বন্ধের জন্য তাদেরকেও যে দায়িত্ব নিতে হয় সে কথাও সচিব সাহেবদের মনে রাখা দরকার। আশা করি কথাটি স্মরণ করিয়ে দেয়ায় সচিব সাহেবরাও কাউকে শত্রু ভাববেন না।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট