ভ্রমণ

ঢাকার বাইরে পর্যটন স্পট

সব মানুষের মনে কমবেশি ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা থাকে। কেউ ভ্রমণ করে, কেউ করে না। অথচ এই উপমহাদেশ, বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশে অসংখ্য ভ্রমণ স্পট, অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থান, অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন দর্শনীয় স্থান রয়েছে। ইউনিসেফের (UNICEF) উদ্যোগে এইসব স্থান সংরক্ষণের উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের এই সেক্টরে অনেক কিছু করার আছে। ইদানিং বেসরকারি উদ্যোগে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো পর্যটকদের জন্য গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা করছে। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এই সেক্টরে আরো প্রফেশনালিজম বা পেশাদারিত্ব আনতে হবে। বিদেশে দেখেছি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটির অবকাশ হলে ছাত্র-ছাত্রীরা দেশের আনাচে-কানাচে, কখনোবা দেশের বাইরে ভ্রমণে চলে যায়। ভ্রমণতো আসলে একধরনের ব্যবহারিক শিক্ষা। একটি নতুন জনপদে ভ্রমণ করা মানে সেই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, জীবনধারা ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করা। বাংলাদেশে অসংখ্য স্থান রয়েছে যা দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসু এবং পর্যটকদের নিঃসন্দেহে আকর্ষণ করতে সক্ষম। সুন্দরবন এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের খ্যাতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। চট্টগ্রাম, খুলনাতো রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জেলা-উপজেলা রয়েছে। সেখানে ভ্রমণপিপাসুরা আনন্দ খুঁজে পাবে। শুধু আনন্দ নয়, অপরিমেয় শিক্ষার উত্স এই অচেনা অখ্যাত অঞ্চলগুলো। বাংলাদেশ মসজিদ-মাজার-মন্দির-বৌদ্ধবিহারের দেশ। ঢাকা থেকে ৪/৫ ঘন্টার পথ। জায়গাটি শরীয়তপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত। কার্তিকপুর উপজেলার ভেদরগঞ্জের মধুপুর। এই অঞ্চল মসজিদ-মাজার আর মন্দিরের জন্য বিখ্যাত। অবলুপ্তপ্রায় কার্তিকপুর জমিদার বাড়িও দর্শনীয় স্থান। সুরেশ্বরে রয়েছে মাজার ও মন্দির। গত বছর দেড়েক আগে এখানে, এই মধুপুরে, স্থাপিত হয়েছে এক বিশাল রেসিডেন্সিয়াল ইউনিভার্সিটি। বিদেশি ও দেশি স্থাপত্যের এক যুগল মিথস্ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সটার্নাল ও ইনটেরিয়র ডেকোরেশনে। বাংলাদেশ তথা বিশ্বে যে ক’টি স্থাপত্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য তাদের অন্যতম। বিশ্ববিদ্যালয়টি গোলাকার। সামনে পেছনে প্রচুর জায়গা ছেড়ে দেয়া হয়েছে। লন টেনিস কোর্ট, বাস্কেটবল কোর্ট, ব্যাডমিন্টন কোর্টতো রয়েছে, উপরন্তু বিশাল ক্রিকেট ও ফুটবল মাঠও রয়েছে। ভ্রমণপিপাসু এক বন্ধুর সাথে আমি এই অঞ্চলে ছুটির অবকাশে এসেছিলাম। ঢাকা থেকে চার পাঁচ ঘন্টার পথ। বাস এবং লঞ্চ ব্যবহার করেছি আমরা। বেশ আরামদায়ক। মাঝির ঘাটে নেমে আমরা আবার বাসে চড়লাম। দু’ঘন্টার জার্নি। রাস্তা ভীষণ আঁকাবাঁকা ও সরু। অজ পাড়াগাঁ, গাছপালার অরণ্যের ভেতর একমাত্র বিল্ডিং জেড. এইচ. সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। পাশে অধ্যাপকদের কোয়ার্টার, ব্যাংক, ছাত্রাবাস, মসজিদ। বিদ্যুত্ চলে ডাইনামোতে। এখানে ঢাকার মতো বিদ্যুত্ কখনো যায় না। ঢাকার মতো জনাকীর্ণ নয়। মানুষজন বলতে বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অল্পসংখ্যক জনগোষ্ঠী। একমাইল দূরে কার্তিকপুর বাজার। শনিবার সেখানে হাট বসে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশমুখে বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পিতলের একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এটাও একটি দর্শনীয় স্থাপত্য। এখানে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির কোনো তুলনা হয় না। মেয়েদের আলাদা হোস্টেল থাকায় অন্যান্য জেলাশহর থেকে মেয়েরা অধিক সংখ্যায় জড়ো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বাস রয়েছে। ছাত্র-ছাত্রী এবং এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য সমপ্রতি একটি ২৫০ বেডের হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বছর খানেক আগেই বিল্ডিং গড়ে উঠেছিল, এখন অসম্পূর্ণ নির্মাণ কাজের সমাপ্তি হচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে সুরেশ্বর মাজার ও মন্দিরে ভক্তদের আগমন ঘটে বছরের বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে। তখন এখানে মেলা বসে। যাত্রা ও পালাগানের আসর বসে। জনসমাগম হয়। এই এলাকার মানুষের আয়ের উত্স এইসব মেলা ও পার্বন। অবকাশ ও বিশ্রামের জন্য এমন নিরাপদ জায়গা আর নেই। এখানে একবার এলে আর ঢাকা ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না। লেখক :কথা-সাহিত্যিক ও অধ্যাপক ই-মেইল: nurul.nasim@gmail.com