দুর্ঘটনার এই দানবকে কে রুখিবে

দুর্ঘটনার দানব কাড়িয়া লইয়াছে আরও দুইটি তাজা প্রাণ। ঢাকায় ৫ বত্সর বয়সী মেয়ের নির্বাক চোখের সামনে বাসের চাকায় পিষ্ট হইয়াছে মা। প্রতিদিনের মতো স্কুল ছুটির পর মেয়েকে লইয়া রিকশায় বাসায় ফিরিতেছিলেন তিনি। বেপরোয়া বাস পিছন হইতে রিকশাটিকে ধাক্কা দিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, তাহাকে পিষ্টও করিয়াছে নির্দয়ভাবে। শিশুকন্যাটি ভাগ্যক্রমে রক্ষা পাইলেও যেই দৃশ্য তাহাকে দেখিতে হইয়াছে তাহার ভয়াবহতার কথা ভাবিলে হূদয় বিদীর্ণ হয়। ঘটনাটি গত মঙ্গলবারের। একইদিন সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বাসের চাকায় পিষ্ট হইয়া মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারাইয়াছে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ চতুর্থ বর্ষের ছাত্র নুরুন্নবী রুবেল। হতভাগ্য এই তরুণটি ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। দুইটি দুর্ঘটনা শুধু যে দুইটি মূল্যবান জীবন ছিনাইয়া নিয়াছে তাহাই নহে, একই সাথে তছনছ করিয়া দিয়াছে দুইটি পরিবারকেও। যতো ব্যবস্থাই নেওয়া হউক না কেন, মাতৃহারা অবোধ তিনটি শিশু আর কখনই তাহাদের মমতাময়ী মাকে ফিরিয়া পাইবে না, একইভাবে বাবা-মা ফিরিয়া পাইবেন না তাহাদের প্রাণপ্রিয় পুত্রকে। তবে ইহা বিশাল এক ডুবো পাহাড়ের সামান্য চূড়া মাত্র। সড়ক-মহাসড়কগুলিতে এখন যাহা চলিতেছে তাহাকে মৃত্যুর মহোত্সব ছাড়া আর কীই-বা বলা যাইতে পারে! আর ইহার মূলে রহিয়াছে সর্বব্যাপী এক বিশৃ্ঙ্খলা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, এই বিশৃঙ্খলা থামাইবার কেহ নাই। বরং বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়াই যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হইয়াছে। সাধারণ মানুষ অকারণে আইন নিজের হাতে তুলিয়া নেয় না। মূলত অব্যাহত প্রতিকারহীনতার কারণে তাহারা বাধ্য হয় আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইতে। সীতাকুণ্ডেও ঠিক তাহাই ঘটিয়াছে। নিহত ছাত্রের ক্ষুব্ধ স্বজন ও সহপাঠীরা নামিয়া আসিয়াছে রাস্তায়। ভাঙচুর করিয়াছে অর্ধশতাধিক গাড়ি। ঘটিয়াছে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও। ঘন্টার পর ঘন্টা অবরোধ করিয়া রাখিয়াছে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। ফলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাইতে হইয়াছে নিরপরাধ জনগণকে। বিঘ্ন ঘটিয়াছে মালামাল পরিবহনে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠিক তাহাই ঘটিতেছে। দায়ী ব্যক্তিরা পার পাইয়া যাইতেছে। অন্যদিকে, তাহার মারাত্মক কুফল ভোগ করিতেছে সাধারণ মানুষ। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও অবরোধের মতো নৈরাজ্য কেহই সমর্থন করেন না। আর ইহা কোনো সমাধানও নহে। কিন্তু মাতৃহারা সন্তান, সন্তানহারা বাবা-মা এবং তাহাদের স্বজন ও সতীর্থরা যদি নিশ্চিতভাবে জানেন যে তাহারা কোনো প্রতিকার পাইবেন না, তখন তাহাদের আর কীই-বা করার থাকে! যেইসব দুর্ঘটনা সারাদেশকে আলোড়িত করিয়াছে— সেইসব দুর্ঘটনার কি স্বচ্ছ কোনো বিচার হইয়াছে? আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করিয়া বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই যেইসব চালক প্রতিনিয়ত দেশের সড়ক-মহাসড়ক দাপাইয়া বেড়াইতেছে তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো নজির কি আছে? অতএব, ভুক্তভোগীরা আইন হাতে তুলিয়া লইলে তাহাদেরকে দোষই বা আমরা দিব কিভাবে? অনির্দিষ্টকাল ধরিয়া কোনো সভ্য দেশে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য চলিতে পারে না। অবশ্যই শক্ত হাতে ইহার লাগাম টানিয়া ধরিতে হইবে। দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাইতে হইবে অনতিবিলম্বে। নিশ্চিত করিতে হইবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। অন্যথায় শুধু যে অনভিপ্রেত মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হইবে তাহাই নহে, সেই সাথে বৃদ্ধি পাইবে ক্ষুব্ধ অনন্যোপায় মানুষের আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইবার প্রবণতাও।