ভূমিকম্পের সংবাদ কী শোনাইতে চাহে
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:০৮
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গত মঙ্গলবার ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যাহা সাড়ে তিন শত মানুষের মৃত্যুর কারণ হইয়াছে। ইহাতে বেলুচিস্তান প্রদেশের আওয়ারান ও খুজদার এলাকায় শতকরা ৯০ ভাগ ঘরবাড়ি ধ্বংস হইয়া গিয়াছে, যাহার ফলে ওই অঞ্চলেই সর্বাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে। ইহার পূর্বে ২০০৫ সালের ৮ অক্টোবরে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও কাশ্মীরে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পের আঘাতে প্রায় ৮০ হাজার লোক প্রাণ হারাইয়াছিল। এইবারের ভূমিকম্পে পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় আরব সাগরের উপকূলে জাগিয়া উঠিয়াছে একাধিক দ্বীপ। আরব সাগরের ওই এলাকায় সমুদ্র তলদেশে থাকা আরব পাত এবং মহাদেশীয় পাতের মধ্যে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা চলিতেছে। ওই দুই পাতের ভিতরে ধাক্কা লাগিবার ফলেই এমন ঘটনা ঘটিয়াছে বলে মনে করিতেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সকল দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুই অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্খিত। তাই এই মৃত্যু আমাদের শোকাহত করে। সেই সঙ্গে স্মরণ করিয়া দেয়, এমন দুর্যোগ আঘাত হানিতে পারে আমাদের ঘরেও। বলা যায়, তাহা বেশ কয়েক দশক ধরিয়া কড়া নাড়িতেছে আমাদের দুয়ারে। এমন দুর্যোগ লইয়া দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতাহীনতায় আমরা যতটুকু চিত্কার চেঁচামেচি করিতেছি, তাহা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রহিয়া যাইতেছে। বিপদের কথা হইল, ভূমিকম্প, সুনামি ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের ক্ষেত্রে বিশ্বে সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশসমূহের ভিতরে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ স্থানে। দুই বত্সর পূর্বে জাতিসংঘের ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান সিকিউরিটি প্রকাশিত বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদন অনুসারে এশিয়ায় ফিলিপাইনের পরই দ্বিতীয় স্থানে রহিয়াছে বাংলাদেশ। দেশি ও আন্তর্জাতিক ভূতত্ত্ববিদ এবং গবেষকরা ভূঅভ্যন্তরের গঠন, ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত এবং কম্পিউটার মডেল বিশ্লেষণ করিয়া ইন্দোনেশিয়া ও চীনের পরই বাংলাদেশে ভয়াবহ ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন। তাহা ছাড়া আশঙ্কা করা হয় যে, বড় ভূমিকম্পগুলি সাধারণত শত বত্সর পর পর একই জায়গায় সংঘটিত হয়। আমাদের এই অঞ্চলে ১৮৯৭ সালে রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার প্রলয়ঙ্কারি ভূকম্পন হয়, যাহা ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ নামে বিখ্যাত। ওই ধরনের কোনো দুর্যোগ এক্ষণে সংঘটিত হইলে আমাদের শুধু লাখ লাখ প্রাণহানিই হইবে না, পুরো দেশ হয়তো ইট-সুরকির তলে চাপা পড়িয়া থাকিবে। শত বত্সর পূর্বে ইমারতের বাড়াবাড়ি না থাকায়, এবং এই অঞ্চল গ্রামভিত্তিক জনপদ হওয়ায় মহাবিপর্যয় তেমনিভাবে করাল থাবা বসাইতে পারে নাই। কিন্তু কিছুদিন পূর্বে সাভারের রানা প্লাজার বিপর্যয় আমাদের বুঝাইয়া দিয়াছে, বড় ভূমিকম্পে আমাদের কী দশা হইতে পারে। কোনো ভূমিকম্প ছাড়াই বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে না মানায় রানা প্লাজায় যে দুর্যোগ নামিয়া আসিয়াছিল, তাহা আমাদের চোখে আঙুল দিয়া এই সত্যও প্রকাশ করিয়া দেয় যে, বড় ভূকম্পনে শত সহস্র ভবন ধসিয়া পড়িলে উদ্ধার-কার্যে আমরা আক্ষরিক অর্থেই অসীম শূন্যে তাকাইয়া থাকা ছাড়া আর কিছু করিতে পারিব না। আমাদের যে বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা রহিয়াছে, তাহার কার্যকর প্রয়োগ করিবার সদিচ্ছা অনেক মালিকপক্ষের ভিতরেও দেখা মেলে না। তাহাছাড়া, রাজধানীর মাটির নিচ দিয়া জালের মতো বিস্তৃত রহিয়াছে যে গ্যাস লাইন, বড় ভূমিকম্পের ফলে তাহাতে অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কাও প্রবল। আর তাহা যদি ঘটে, ইহার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হইতে পারে তাহা কল্পনাতীত। আমরা যে বিল্ডিংয়ে বসিয়া আছি, তাহা অফিস হোক কিংবা বাড়ি—যদি তাহার নির্মাণ-কৌশল ঠিক না থাকে, তবে অন্য যে প্রস্তুতিই গ্রহণ করা হউক না কেন, কোনো কাজেই লাগিবে না। এই নির্মম সত্য বুঝিতে হইবে।
ভারতীয়, ইউরেশীয় ও মায়ানমার টেকটোনিক প্লেটের ভিতরে আটকে আছি আমরা। টাইম বোমার মতো বড় একটি ভূমিকম্প অপেক্ষা করিতেছে বলিয়া বার বার সতর্ক করিতেছে বিশ্বের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ সংস্থা। আশঙ্কা হয়, একটি বড় ভূমিকম্প সবকিছু লণ্ডভণ্ড করিয়া না দেওয়া পর্যন্ত এই বিষয়ে আমাদের টনক নড়িবে না হয়তো।