অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ :আশাবাদ ও নৈরাশ্য সমান্তরালে

অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণের পথে নানাবিধ আইনী ও প্রণালীবদ্ধ বিধি-নিষেধ সারা পৃথিবী জুড়িয়াই কমিয়া আসিতেছে গত পাঁচ দশক ধরিয়া। অন্যদিকে কিছু কিছু রাষ্ট্র নানাবিধ আইন ও বিধি-নিষেধের জালে জড়াইয়া অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ হইতে নারীকে বিরত করিয়া রাখিতেছে। বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি প্রসঙ্গে একাধারে আশাবাদ ও নৈরাশ্যের চিত্র এইভাবেই ফুটিয়া উঠিয়াছে। মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘উইমেন বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল:রিমুভিং রেস্ট্রিকশানস টু এনহ্যান্স জেন্ডার ইক্যুয়িটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ১৪৩টি দেশে গত দুই বত্সরে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণের জন্য গৃহীত সংস্কার কর্মসূচি এবং ১৯৬০-এর দশক হইতে এই পর্যন্ত সম্পত্তিতে নারীর অধিকার এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রের আইনী অধিকারগুলির উপরে আলোকপাত করা হইয়াছে। দেখা যাইতেছে যে, গত দুই বত্সরে ৪৪টি দেশে আনীত ৪৮টি আইনী পরিবর্তন অর্থনীতিক ক্ষেত্রে নারীর সুযোগ বাড়াইয়া দিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, আইভরি কোস্ট কিংবা মালিতে এখন এমন একটি আইন হইয়াছে যাহার বলে স্বামীপ্রবর অনুমতি না দিলেও স্ত্রী কর্মে যোগদান করিতে পারেন। রাত্রিকালে নারীদের কর্মস্থলে অবস্থানের উপর হইতে বাধা তুলিয়া লওয়া হইয়াছে ফিলিপাইনে। মাতৃত্বকালীন সময়ে নারীকে বাড়তি হারে বেতন দেওয়ার বিধান হইয়াছে স্লোভাক রিপাবলিকে। এইগুলি দেখিয়া নারীর অর্থনীতিক মুক্তি তথা নারীমুক্তি বিষয়ে অনেকখানি আশাবাদ জাগ্রত হয় বৈকি! তবে মুশকিলের বিষয় এই যে, নারীর অর্থনীতিক মুক্তির পদক্ষেপগুলি পৃথিবীর সর্বত্র সমানতালে আসিতেছে না। উদাহরণস্বরূপ, পূর্ব ইউরোপ এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে এখন অবধি কতকগুলি পেশাতে নারীদের যোগদানে আইনী বাধা বলবত্ আছে। উদাহরণস্বরূপ, নারীরা রাশিয়াতে কৃষিখাতের ট্রাক চালনা, বেলারুশে কাঠমিস্ত্রি এবং কাজাখস্তানে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করিতে পারে না! নারীকে নিরাপদে রাখিবার ধারণা হইতে এইসব পেশাতে আইনী বাধা থাকিলেও, ইহার ফলে যে নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়া আসে তাহাতে সন্দেহ নাই। এইসব সীমাবদ্ধতা থাকিলেও পূর্ব ইউরোপ কিংবা মধ্য এশিয়া নহে, বিশ্বব্যাংকের গবেষণা হইতে দেখা যাইতেছে যে, অর্থনীতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচাইতে পিছাইয়া থাকা অঞ্চলগুলি হইতেছে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা। দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা এই অঞ্চলের তুলনায় সামান্য কিছুটা উন্নত বলিয়া প্রতীয়মান হইলেও, তিনটি অঞ্চলেই অগ্রগতি ও পশ্চাত্গতি সমান্তরালে চলিতেছে— এইসব অঞ্চলে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিঘ্ন অপসারণ করা হইয়াছে আবার কিছু নূতন বিঘ্ন সৃষ্টি হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, এই অঞ্চলগুলিতে অতীতের তুলনায় বর্তমানে অধিক সংখ্যক নারী সম্পত্তিতে অধিকার ভোগ ও আইনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করিতে পারে এবং চুক্তির পক্ষ হইতে পারে। কিন্তু এখন অবধি উল্লেখিত অঞ্চলগুলি ও সাব সাহারা, সম্পত্তিতে বিবাহিত নারীর উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা নারীকে পরিবার প্রধানের মর্যাদা প্রদানের দিক হইতে অনেকখানি পিছাইয়া আছে। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক যৌক্তিকতা লইয়া বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ-আলোচনা বহু পূর্বেই সমাপ্ত হইয়াছে। তথাপি দুঃখের বিষয় এই যে, সামাজিক পশ্চাত্পদতার সুযোগ ব্যবহার করিয়া কিছু কিছু রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণী নারীকে নানানভাবে অবরুদ্ধ রাখিবার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করিয়া চলিতেছে, যাহা অর্থনীতিক দিক হইতে ক্ষতিকর, রাজনৈতিকভাবে অশুদ্ধ, মানবাধিকার-সমানাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন; মোটের উপর অগণতান্ত্রিক। এই পরিস্থিতির যত দ্রুত অবসান হয় ততই মঙ্গল।