পর্যটন

পর্যটন শিল্প বিকাশে গণমাধ্যম

গণমাধ্যম হচ্ছে গণযোগাযোগের বাহন যা কোন পণ্য, সেবা, স্থান বা ঘটনা সম্পর্কে জনসাধারণকে তথ্য সরবরাহ করে থাকে। পর্যটকরা তাদের অবকাশ কাটানো, বিশ্রাম করা এবং বিনোদনের জন্য পর্যটন গন্তব্য পছন্দের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে থাকে। অর্থাত্ গণমাধ্যম থেকে যা কিছু শোনেন, পড়েন অথবা গণমাধ্যমে যা দেখেন তার ভিত্তিতেই পর্যটকরা প্রথমিকভাবে গন্তব্য পছন্দ করেন। এমতাবস্থায়, সম্ভাব্য পর্যটকদেরকে একটি দেশের পর্যটন-গন্তব্যসমূহের পছন্দকে প্রভাবিত করতে এবং সেদেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে গণমাধ্যমই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। গণমাধ্যম শুধু দেশের অভ্যন্তরের নয়, দেশের বাইরের পর্যটকদের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ পর্যটন স্থাপনার প্রচারে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন এবং এ শিল্পের মাধ্যমে প্রচুর আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার সম্ভাবনা অপার। সুতরাং, এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে পরিকল্পিতভাবে মিডিয়া-কৌশল অবলম্বন করে বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্য ও আকর্ষণ স্থলসমূহ বিশ্বের দরবারে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলা অপরিহার্য। এজন্য প্রয়োজন পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন তথ্যচিত্র তৈরি করে সারাবিশ্বের মানুষকে দেখানোর ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন দেশের দৈনিক পত্রিকায় উপ-সম্পাদকীয় লেখা, দৈনিক পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রবন্ধ ছাপানো এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও পর্যটন স্থলসমূহের ছবি উপস্থাপন করা। এজন্য, বাংলাদেশের পর্যটন প্রতিষ্ঠানসমূহকে পর্যটকদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য, কোন্ কোন্ গন্তব্যের প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ রয়েছে এবং সেখানে গিয়ে পর্যটকরা কী কী পেতে চান সে সম্পর্কে ভালভাবে জেনে নিতে হবে। যাতে করে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে বাংলাদেশে আনতে পারে এবং আসার পরে তাদের সর্বাধিক সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে পারে। পর্যটকরা বহুবিধ উত্স থেকে তথ্য পেয়ে থাকেন। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র, সাময়িকী, মুভি, ইন্টারনেট, ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণির দর্শক-শ্রোতাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। নির্দিষ্ট গন্তব্যে ভ্রমণ করানোর ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি মাধ্যমের গুরুত্ব আলাদা। আজকের আধুনিক বৈদ্যুতিক মাধ্যম, যথা-ইন্টারনেট, পর্যটন শিল্পের প্রচারমূলক কার্যক্রমে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বিশেষ করে সাশ্রয়ী সামাজিক মাধ্যম, যেমন, facebook, flickr, youtube, twitter, mobileblogs, RSS feeders ইত্যাদি যোগাযোগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। যেহেতু আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এসব সাশ্রয়ী মাধ্যমে প্রচারকার্যক্রম চালিয়ে পর্যটন খাতের প্রসার ঘটাতে পারে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদেরকে বাংলাদেশ ভ্রমণে উদ্ধুদ্ধ করতে প্রয়োজন ফলপ্রসূ যোগাযোগ এবং দক্ষ মিডিয়া কৌশল। এক্ষেত্রে প্রচার বার্তার শব্দ চয়ন ও ডিজাইন যথার্থ হতে হবে এবং তা সঠিক খদ্দেরদের লক্ষ্য করে প্রচার করে সর্বোচ্চ সংখ্যক দর্শক-শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। সেই সাথে বাংলাদেশের পর্যটন সেবা ও সুবিধাসমূহের মানেরও যথেষ্ট উন্নয়ন সাধন করে ভ্রমণকারীদের পর্যাপ্ত সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। ফলে বাড়ি ফিরে তারা তাদের ভাল লাগার কথা অন্যান্য ভ্রমণকারীদেরকে বলবে। প্রচার বার্তা উন্নয়নের সময় অবশ্যই সম্ভাব্য ভ্রমণকারীদের সাংস্কৃতিক পার্থক্য বিবেচনায় আনতে হবে। নীতিগত বিষয়সমূহও সর্তকতার সাথে বিবেচনায় আনতে হবে। কোনো মিথ্যার আশ্রয় নেয়া অথবা অতিরঞ্জিত করা যাবে না। সরকারের অথবা পর্যটন কর্পোরেশন নিজস্ব ব্যয়ে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে ১০/১২ জন সাংবাদিককে বাংলাদেশে এনে ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে পারে যাতে করে তাঁরা নিজেদের চোখে বাংলাদেশকে দেখে অভিজ্ঞতা অর্জনে সক্ষম হন এবং ওই অভিজ্ঞতার কথা তাঁদের নিজ নিজ দেশের গণমাধ্যমে প্রচার করতে পারে। এতে করে আমাদের দেশের পর্যটন শিল্প প্রচার পাবে এবং এর সমপ্রসারণ ঘটবে। দেশের পর্যটন শিল্পকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য ইতোমধ্যে ২০১০ সালে সরকার বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড গঠন করেছে, পর্যটন সংক্রান্ত বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করেছে এবং ১৯৯২ সালের বাংলাদেশ পর্যটন নীতিমালা যুগোপযোগী করেছে। এখন প্রয়োজন ওই নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশের পর্যটন প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক প্রয়োজনীয় মিডিয়া কৌশল প্রণয়ন করা ও গণমাধ্যমের সাথে মিলে এ শিল্পের সমপ্রসারণ ও প্রচারমূলক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, কোনো অবস্থায়ই যেন সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও প্রচার কার্যক্রম থেমে না থাকে। লেখক :ট্যুরিজম এন্ড হসিপটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়