পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও আইসিটি

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বর্তমানে বিশ্বায়নের অন্যতম উপকরণ হিসেবে বিবেচিত । প্রশাসন, অর্থ, বাণিজ্য, যোগাযোগসহ নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমপ্রতি তথ্য প্রযুক্তির প্রয়োগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই হয়তো বর্তমান সরকারের দায়িত্বে নিয়োজিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথ্য প্রযুক্তির প্রসার ঘটাবার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অঙ্গীকার করেছিলো এবং এর প্রেক্ষিতে সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় যুগোপযোগী এবং অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। আওয়ামী লীগের বিগত আমলে (১৯৯৬-২০০১) তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নে প্রণীত হয় “জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা”। আর এই নীতিমালার রূপকল্প ও উদ্দেশ্যসমূহ সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বর্তমান সরকার আগামী ২০২১ সালের মধ্যে তাদের প্রতিশ্রুত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলায় আশাবাদী। শুধু তাই-ই নয় সরকার আইসিটির গুরুত্ব আর তার প্রয়োজনীয় তদারকি অনুভব করে আইসিটি বিষয়ক একটি সতন্ত্র মন্ত্রণালয়ও পরিচালনা করছে। এতকিছুর পরেও কিছু কিছু প্রয়োজনীয় ব্যাপারগুলোর প্রতি যথাযথ দৃষ্টির অভাব হতাশা সৃষ্টি করেছে আর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্পের’ বাস্তবায়নকে করে তুলছে সন্দিহান। প্রণীত জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালাকে প্রধানত দু’টি ধারায় ভাগ করা যায়। যার একটি হচ্ছে দেশের প্রতিটি খাতকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আওতায় এনে গুণগতমান বৃদ্ধিসহ সেবা ত্বরান্বিত করা আর অন্যটি হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরি করা, আর এক্ষেত্রে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ভূমিকা রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের। যেকোন দেশের গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণে সেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার কথা এবং অনেক ক্ষেত্রে করেও থাকে। কেননা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে গড়ে উঠে উদ্ভাবনী ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের ধারা, সকল আশা আর আকাঙ্ক্ষা। সেজন্য প্রতিটি দেশে, প্রতিটি সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব বিশেষভাবে স্বীকৃত। এডোয়ার্ড সাঈদের ভাষায় বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ‘দ্যা লাস্ট রিমেইনিং ইউটোপিয়া’ বা আমাদের সর্বশেষ আশা-ভরসার স্থল। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালগুলোর অবস্থান এর ব্যতিক্রম নয়, কেননা সেই ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এ দেশের জন্ম কিংবা ১৯৯১ আর ২০০৭ এর দেশের সংকটে বিশ্ববিদ্যালগুলোর ভূমিকা ছিলো অনস্বীকার্য। তাই সত্যিকার অর্থে বিপ্লব ঘটিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে অনেক বেশি । ১৯৯৯ সালে প্রণীত জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালার ‘ঙ এর ৪.৯’ অনুচ্ছেদে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বমানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে উত্সাহিত করার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা প্রবর্তন করণীয়কে অধিভুক্ত করে। এরই ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে দেশে বেশ কিছু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (৮টি) প্রতিষ্ঠা লাভ করে ও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইসিটি নামে কিংবা কম্পিউটার সায়েন্স ও আইটি নামে বিভিন্ন বিভাগ খোলা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক গুণগত শিক্ষার পরিবেশ এখনো অধরাই হয়ে আছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিক্ষায় অপ্রতুল বাজেট ও সমন্বয়হীনতাই এর প্রথম ও প্রধান কারন। দেখা যাচ্ছে, কোন কোন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক দশক পূর্ণ করেও প্রয়োজনীয় গবেষণাগার কিংবা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। আবার কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণার পরিবেশ ও প্রণোদনা যথার্থ ও যথেষ্ট নয়। শুধু তাই-ই নয় সমপ্রতি বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক থেকে একটা অনানুষ্ঠানিক অনলাইন জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে দেশের ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০০ সাল পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ (অতি সমপ্রতি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়াল্ড ব্যাংকের অর্থায়নে বিশেষ প্রজেক্টের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড সার্ভিস চালু করা হয়েছে) পুরাতন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারনেট ব্রডব্যান্ড কানেকশন নেই যেখানে তথ্য প্রযুক্তি যুগের সূতিকাগার হিসাবে ইন্টারনেটকে গণ্য করা হয়! পুরাতন জেনারেল (সাধারণ) ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয়সহ নতুন কিছু একই ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিটি কিংবা কম্পিউটার শিক্ষা বিভাগের বরাদ্দটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য নন-টেকনিকাল বিভাগ যেমন, বাংলা কিংবা ইংরেজি বিভাগের মতই হয়। নিসন্দেহে আইসিটি কিংবা কম্পিউটারের মত যন্ত্রনির্ভর বিভাগের সাপোর্ট অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে বেশি হওয়াই কাম্য। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীণ পরিকল্পনার কারণে বিভাগগুলো অপ্রতুলতার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে আর মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা হচ্ছে অনেকাংশেই প্রবঞ্চিত। এই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি কিংবা কম্পিউটার বিভাগের শিক্ষকেরা পড়াশুনার অপরিহার্য কম্পিউটার কর্মক্ষত্রে ব্যবহারের জন্য অফিস থেকে পায় না কেননা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রচলিত রীতি অনুযায়ী অন্যান্য বিভাগের শিক্ষকেরও তাহলে সমভাবে দাবীদার আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সংগতকরণেই সবাইকে কর্মক্ষেত্রে কম্পিউটার দেয়া সম্ভবও না। অথচ এই অপরিহার্য মেশিন ছাড়া একজন শিক্ষকের প্রোগ্রামিং কিংবা আইসিটি-র মূল বিষয়গুলো পড়ানো এক কথায় অসম্ভব। দেখা গেছে, কোন কোন শিক্ষকরা তাদের নিজেদের কম্পিউটার ব্যবহার করে শিক্ষা প্রদান করে কিন্তু এমন আগ্রহ কত দিন থাকবে সেটা প্রশ্নবিদ্ধ। ঠিক একইভাবে অন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোও (যেমন, গ্রন্থাগারে প্রয়োজনীয় বই, গবেষণাগার কিংবা দক্ষ গবেষণাগার সহকারী ইত্যাদি) অবহেলার স্বীকার হচ্ছে। সরকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে সল্পমেয়াদী কোর্স চালু করে সাধারণ মানুষের কিংবা ননটেকনিক্যাল স্টুডেন্টদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দীক্ষায় দীক্ষিত করার চেষ্টা করছে কিন্তু আইসিটির মত এমন গতিশীল আর সর্বদা পরিবর্তনীয় এই শিক্ষায় কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে স্কীল গ্রহণ করলেই হবে না বরং কিছু জনশক্তি তৈরি করতে হবে যারা পরিবর্তনের ধারায় নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়ে নীতি-নির্ধারণ ও আইসিটি সেক্টরকে পরিচালিত করবে। আর নিঃসন্দেহে চার বছর মেয়াদে খুবই যুগোপযোগী কারিকুলাম অধ্যয়ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাই পারবে এই ধারা পরস্ফুিটিত করে অব্যাহত রাখতে। অতি সমপ্রতি আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার দৈন্যদশার চিত্র ফুটে উঠেছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের জনক টিম বার্নাস লি এর প্রণোদিত ডিজিটালাইজেশোন সূচকের মাধ্যমে, যেখানে দেখানো হয়েছে ইন্টারনেটকে অবলম্বন করে বিভিন্ন দেশের এগিয়ে যাবার সক্ষমতা, সমাজ আর রাজনীতিতে তার প্রভাব। আর সেই সূচকে মোট ৬১ দেশের মধ্যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শ্লোগান রূপি বাংলাদেশ ৫৫তম। যেখানে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে নেপালের মত দেশও আমাদের ছাড়িয়ে গেছে (৫২তম), ছাড়িয়ে গেছে পাকিস্তান (৪৪তম), ভারত (৩৩তম) আর এশিয়-প্রশান্ত মহাসগরীয় অঞ্চলে আমারই সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশ। এমতাবস্থায় তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশ গড়তে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিটি বা কম্পিউটার বিষয়ক বিভাগগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর বিশেষ নজর দিতে হবে। এটাই শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চাওয়া। লেখক:সহকারী অধাপক, আইসিটি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়