আপসের পথেই যাবে সংঘাতের রাজনীতি

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সরকার পদ্ধতি নিয়ে বর্তমান সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এখনও পর্যন্ত কোন সমঝোতা না হওয়ায় দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন এবং শঙ্কিত বটে। ঈদের পর বিরোধী দল কোন কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়নি। তবে এর আগে মানবতাবিরোধীদের বিচার ও প্রধান বিরোধী দল ও জোটের নেতাকর্মীদের মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে দেয়া কর্মসূচির ফলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। তাদের মুক্তির দাবিতে হরতাল, বিক্ষোভ ও ভাংচুর হয়েছে। পুলিশের এ্যাকশন দেখা গেছে। রেকর্ড সংখ্যক মানুষ মারা গেছে। অনেকে গ্রেফতার হয়েছে। বিজ্ঞজনেরা বলছেন, দেশে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। এর ফলে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ আরও বৃদ্ধি পাবে। অনেকে সতর্ক করেছেন, বড় দুই দল সংলাপে না বসলে এমনটি হওয়ার আশংকা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক উন্নত দেশের পক্ষ থেকেও ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলকে সংলাপে বসার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের ধারণা, উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপ শুরু হলে দূরত্ব কমে আসবে, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে এবং দেশে রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা বন্ধ হবে। সঙ্গত কারণেই এমন আশা করতে পারেন তারা। কারণ বাংলাদেশের সস্তা দামে কেনা পণ্য তাদের প্রয়োজন। আবার বাজার হিসেবেও বাংলাদেশ মন্দ না। অপরদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তাদের একটি ভূমিকা রয়েছে। আন্দোলনরত বিরোধী দলের প্রধান দাবি, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল করা। এব্যাপারে বিএনপি ও ১৮ দলের সিদ্ধান্ত আছে। তবে মাঝে-মধ্যে বিএনপি সরকার পতনের এক দফা দাবিতেও হরতালের ডাক দিয়েছে। অবশ্য এই দাবির প্রতি তাদের দলীয় নেতাকর্মী, শরিক অপর ১৭ দলের নেতাকর্মী ও জনসাধারণের সমর্থন আছে কিনা তা বোঝা যায় না। কারণ শ্রমজীবী মানুষ আর হরতাল মেনে নিতে পারছে না। অপরদিকে হরতালের সময় বিরোধী দলের কোন নেতাকর্মীকে রাজপথে তেমন দেখা যায় না। অবশ্য পুলিশ, র্যাব আর বিজিবি যেভাবে লাঠি, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও বন্দুকের গুলি চালিয়ে অভ্যর্থনা জানায় তাতে রাজপথে নামা তাদের পক্ষে শুধু ঝুঁকিপূর্ণই না অসম্ভব বটে। ধারণা করা যায়, শাপলা চত্বরে গত ৫ মে রাতের অন্ধকারে সরকার যেভাবে ইসলামের হেফাজতকারীদের সিটি করপোরেশনের মশা নিধনের কায়দায় বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছে, তা জেনে শুনে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মনে ভীতির জন্ম হওয়াই স্বাভাবিক। কিছুদিন পূর্বে সরকার ও বিরোধীদলের পক্ষ থেকে সংলাপের প্রস্তাব আসায় মনে হয়েছিল অচিরেই চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসন হয়ে যাবে। কিন্তু সামান্য সময়ের ব্যবধানে উভয়দলের নেতৃবৃন্দের বৈরিতাপূর্ণ বক্তব্যের কারণে সেই গুড়ে বালি পড়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। বিরোধীদল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের শর্ত দিয়ে সংলাপে বসার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু সরকার তা মানতে নারাজ। তাদের সাফ কথা, কোন পূর্ব শর্ত দিয়ে আলোচনা হবে না। এমতাবস্থায় দুই দল সংঘাতের দিকে যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীরা চিন্তিত, উদ্বিগ্ন এবং শংকিত। হরতাল, হাঙ্গামা, ভাংচুর, পুলিশের নির্যাতন, গ্রেফতার, মৃত্যু প্রভৃতি তাদের জন্য সুখকর নয়। এর ফলে পণ্য উত্পাদন ও পরিবহন ব্যাহত হয়। সম্পদের ক্ষতি হয়। ব্যাংকে সুদ বৃদ্ধি পায়। তাদের অভিভাবক ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সভাপতি সঙ্গত কারণেই উদ্বিগ্ন হয়েছেন। তিনি বিরোধী দলকে হরতাল না দেয়ার অনুরোধ করেছেন। তার অনুরোধ বা আহ্বানের একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। কারণ তার সংগঠনের অনেক সদস্য দুই বড় দুই দলের নেতা, দাতা অথবা পৃষ্ঠপোষক। তাদের টাকা ছাড়া দল চলে না। এমনকি সরকারও না। বৈধ-অবৈধভাবে তারাই সবচেয়ে বেশি টাকা দেন। আবার প্রতিশ্রুতি থাকে নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্য প্রার্থীদের মোটা অংকের টাকা দেয়ার। প্রমাণ হয়েছে, এইখাতে বিনিয়োগ বেশ লাভজনক। কিন্তু দেশ যদি সংঘাতের দিকে যায়, তাহলে লোকসানের আশংকা আছে। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বর্তমান সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদকাল শান্তিপূর্ণ রাখা যায় কিভাবে। এরজন্য দেশ-বিদেশ থেকে নানা পরামর্শ আসছে। রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞগণ দিনরাত পরিশ্রম করে লিখছেন। টেলিভিশনে বক্তব্য রাখছেন। দেশের মানুষ তা পড়ছেন ও শুনছেন। তবে এসব বিষয়ের পাঠক ও শ্রোতা খুবই নগণ্য। দিনমজুর, কৃষক, পরিবহন ও কারখানার শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী, এমনকি ছাত্রদের সামান্য অংশই সংবাদপত্র পাঠ করেন। সম্পাদকীয় পাঠকের সংখ্যা আরও কম। পাঠিকার সংখ্যা হাতে গোণা যায়। সুতরাং লেখা ও বক্তব্য যতই মূল্যবান হোক, দেশের সাধারণ মানুষ তা জানতে পারছে না। তাদের কাছে এখন খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাটাই বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, আয় সেভাবে বাড়েনি। বেড়েছে কৃষি উপকরণের মূল্য। এর সাথে আছে বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানি সমস্যা। ফলে মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম হচ্ছে। এর জন্য সরকারকেই দায়ী করছে তারা। তাদের ধারণা, কৃষক-শ্রমিকসহ গরিব মানুষের সমস্যা সমাধানে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা ও টেলিভিশনে প্রচারিত খবর দেখেই মানুষ বুঝতে পারছে দেশ কেমন চলছে। এর জন্য দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন পড়ার প্রয়োজন হয় না। পরিণত বয়সের সকলেই জানেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ কোন সরকারই সাধারণ মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। অথচ বিকল্প না থাকায় জনগণ একজনের ওপর রাগ করে আরেকজনকে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছে। ক্ষমতায় গিয়ে সকলেই দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। প্রমাণ হয়েছে, যার যা স্বভাব-চরিত্র সে তা করবেই। কোন হিতোপদেশ তাকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারবে না। এসব দলের ভেতরে গণতন্ত্র অচল। নেতা-নেত্রীর নির্দেশই বিধান। প্রকাশ্য নির্দেশ যা-ই থাক, অন্তরে থাকে প্রতিপক্ষকে দমন করার নানা কৌশল আর আয়োজন। তারা টাকা রোজগারের জন্য যতটা যত্নবান, জনসন্তুষ্টি অর্জনে ততটাই অবহেলা করেন। অর্থই প্রধান আরাধ্য। কারণ নির্বাচনের সময় মনোনয়ন পেতে প্রয়োজন হয় টাকার। এরপর ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে পানির মত খরচ করতে হয় টাকা। দুই দলের সকল নেতাই বিশ্বাস করেন, যথেষ্ট টাকা না থাকলে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করা সম্ভব না। সে টাকা কালো অথবা সাদা যা-ই হোক। দুই দলের মধ্যে আগামী নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে যাদের মনোনয়ন প্রাপ্তি প্রায় নিশ্চিত, তারা নিজেদের এলাকায় ইতোমধ্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছেন। নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ তত বাড়ছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা সরকারি অর্থে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়াও ব্যক্তিগত টাকা খরচ করছেন। অপরদিকে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতকর্মীরা মনে করছেন, সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, দলীয়করণ, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-নিপীড়ন, জোর করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা প্রভৃতি কারণে আগামী নির্বাচনে তাদের নিশ্চিত পরাজয় হবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। অপরদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের ধারণা, গত সাড়ে চার বছরে তারা নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় শত কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ করেছেন। তিন লাখ ভোটারের একটি এলাকায় লক্ষাধিক মানুষ কোন না কোনওভাবে সরকারি বা দলীয় সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছে। অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা, দুস্থ, বিধবা ও বয়স্করা ভাতা পেয়েছে। ভিজিডি কর্মসূচি চলছে। কাবিখা-কাবিটা প্রকল্প চলছে। কর্মসৃজন প্রকল্পের আওতায় দিন-মজুরেরা উপকৃত হয়েছে। সুতরাং নির্বাচনের সময় এসব উপকারভোগী মানুষ আওয়ামী লীগের কথা অবশ্যই মনে রাখবে। উল্লেখিত আলোচনার পর আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং তাদের শরিকরা নিজেদের বিজয় সম্পর্কে আশাবাদী। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনও বিরোধী দলকে কোন ছাড় দিতে নারাজ। দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব বিএনপি নেতাকে পরাজিত করা কঠিন হবে, তাদেরকে মামলা-হামলা-গুমসহ নানাভাবে নির্বাচন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। এমতাবস্থায় দুই জোট মুখোমুখি অবস্থানে আছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে। সংঘাত-সংঘর্ষ হবে। আরও লাশ পড়তে পারে। কিন্তু শেষ পর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আপস হবে। কারণ দুই দলের কোন নেতাই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংঘাত চায় না। আপস না হলে সেই সুযোগ তৃতীয় পক্ষ নিতে পারে- এই আশংকা সকলেরই রয়েছে। রাজনীতির বাজারে সকলেই কমবেশি বিনিয়োগ করেছেন। সেখান থেকে অতিরিক্ত মুনাফা প্রাপ্তির আশায় দিন গণনা করা হচ্ছে। লেখক:সাংবাদিক