[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

বারাক ওবামা ও রুহানির টেলি-আলোচনা এবং ইরান- আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক

ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রুহানির সাথে এই প্রথমবারের মতো টেলি-আলোচনা করলো বিশ্বের একমাত্র পরাক্রমশালী রাষ্ট্র আমেরিকা। গত ৩৪ বছরের ইতিহাসে ইরান-মার্কিন টেলি-আলোচনার ফল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কতটুকু ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে তা-ই এখন দেখার বিষয়। ধারণা করা যায় যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলাপচারিতার এরূপ বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক তথা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে। ১৯৭৯ সাল হতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোন ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও সাম্প্রতিককালে দুই প্রেসিডেন্টের এরূপ আলোচনা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ পশ্চিমাদের বিষয়ে অনেকটা কঠোর থাকলেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট রুহানি হলেন ঠিক তার উল্টো। আর রুহানির এরূপ নমনীয়তার প্রমাণ পাওয়া যায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া ভাষণের মধ্য দিয়ে। জাতিসংঘের মহাসচিবের দেয়া ভোজসভায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে রুহানির কুশল বিনিময় হবে বলে ধারণা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। কিন্তু রুহানি নিউইয়র্ক ত্যাগের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করলে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা তাঁদের মধ্যে টেলিফোন সংযোগ করিয়ে দেন। এই দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে ১৫ মিনিট কথা হয়। ২০০৩ সালে আমেরিকা কর্তৃক ইরাক আক্রমণের পর থেকে যদিও ইরান পশ্চিমা শক্তি তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্র আক্রমণাত্মক ছিল কিন্তু সাম্প্রতিককালে ইরানের দুর্বল কৌশলগত অবস্থান দেশটিকে হয়তো নমনীয় পররাষ্ট্রনীতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮০-৮৯ সাল থেকে ইরান-ইরাকের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক চলে আসছিল তা ২০০৩ সালে মার্কিনী কর্তৃক সাদ্দাম হোসেনের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ধারণা করা যায়, ইরাকের সাদ্দাম শাসনের পতন একদিকে যেমন ইরানের জন্য রাজনৈতিক সুখবর ছিল তেমনি আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক আক্রমণের পর থেকেই ইরান নিজ দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে ধীরে ধীরে শঙ্কিত হতে থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯৯০ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর হতে ইরাক ছিল ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র হুমকিস্বরূপ। আর তাই ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার এরূপ হুমকি দূর করার জন্য ইরাকে একটা প্রো-ইরানীয়ান সরকার ব্যবস্থা খুবই জরুরী ছিল। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকে যে নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দিয়েছে তা আজও আমেরিকা পূরণ করতে পারেনি। আর এই ব্যাপারটা ইরান ২০০৩ সালের আগেই ধারণা করতে পেরেছিল। ২০০৩ সালে ঘটে যাওয়া ইরাক যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই ইরান ইরাকের শিয়া সম্প্রদায়কে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে শক্তিশালী করতে থাকে। ফলে ২০০৩ সালে যখন আমেরিকা সুন্নী ইরাকীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তখন থেকেই ইরাকের শিয়া সম্প্রদায় ইরানের সহযোগিতায় ইরাকে সুন্নীদের অবস্থান নিয়ে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করতে থাকে। ২০০৩ সালের পর একটা পর্যায়ে এসে আমেরিকা বুঝতে পারে যে, ইরাকে অভিযান সফল করতে হলে শিয়া এবং সুন্নী এই দুটি সম্প্রদায়কেই দমন করতে হবে। কিন্তু আমেরিকা ইরাকে আত্মঘাতী সুন্নীদের প্রতিহত করতে পারলেও শিয়াদের প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়ে যায়। ২০০৯ সালে বারাক ওবামা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করলে ইরাকী শিয়ারা দেশটিতে একমাত্র নেতৃত্বদানকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে নেয়। বলাবাহুল্য ইরানের মদদপুষ্ট এ সকল শিয়া সম্প্রদায়ের জনগণ ইরাকের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কৌশলগত দিক হতে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা অনেকটা সুদৃঢ় হয় এবং প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর হতে এটাই ইরাকের বিরুদ্ধে ইরানের প্রথম কৌশলগত বিজয়। ধারণা করা যায়, ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অবস্থান পূর্বের তুলনায় আরো বেশি সুদৃঢ় হয়ে যায়। ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আহমেদিনেজাদের লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দেশটির একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা। আর এক্ষেত্রে সিরিয়া হচ্ছে ইরানের মিত্র রাষ্ট্র। শুরুর দিকে সিরিয়া-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিরিয়ার কোন রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত না থাকলেও সাম্প্রতিককালের আরব বসন্ত এবং সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের বিরুদ্ধে যে জনবিক্ষোভ শুরু হয়েছে তা স্বাভাবিকভাবে সিরিয়াকে ইরানের সাহায্য নিতে বাধ্য করে। অর্থাত্ সিরিয়া এখন তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করার জন্য ইরানের সহযোগিতা চাচ্ছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য প্রশমিত করার ক্ষেত্রে রাশিয়াও ইরানের উত্থানকে সমর্থন করে যাচ্ছে। পারমাণবিক ইস্যুসহ অন্যান্য আরো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তাই ইরান আর আমেরিকার মধ্যে আনুমানিক ১৯৭৯ সাল থেকেই স্নায়ুযুদ্ধ চলে আসছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামেও তারা একে অপরের বিরোধিতা ও নিন্দা করে আসছে। বিগত প্রেসিডেন্টের শাসনামলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এতটাই বৈরী ছিল যে, আমেরিকা ইরানের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকেও সন্দেহের চোখে দেখতো। এই প্রেক্ষাপটে শত্রুভাবাপন্ন এরূপ দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সংগঠিত হয়ে যাওয়া আলোচনা তাদের মধ্যে বিরাজমান বৈরী সম্পর্কের পরিধিতে কিছুটা হলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ফিলিস্তিন-ইসরাইল বিরোধ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচী এবং সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক রাজনীতির তাত্পর্যপূর্ণ তিনটি ইস্যু। ইতোমধ্যে সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে যে যুদ্ধের আশঙ্কা ছিল তা কিছুটা কাটানো সম্ভব হলেও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে সিরিয়া প্রসঙ্গকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সিরিয়া আক্রমণের প্রস্তুতিকালে রাশিয়া এবং ইরান আমেরিকার বিরোধিতা করা সত্ত্বেও ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো দুই নেতার মধ্যে টেলি-আলোচনা সম্ভব হলো যা সত্যিই কৌতূহলের বিষয়। আমেরিকা কি তাহলে তার ইরান নীতিতে কিছুটা নমনীয় হতে যাচ্ছে, না-কি সিরিয়ায় নিজের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে ইরানের সাথে সম্পর্ক তৈরী করতে চাচ্ছে তা-ই এখন দেখার বিষয়। অন্যদিকে ফিলিস্তিন-ইসরাইল সমস্যার মূলে তেল আবিবের আগ্রাসী নীতি আমেরিকা কখনোই স্বীকার করে না। এতদিন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ছিল আক্রমণকারী এবং আক্রান্তকে সমান দৃষ্টিতে দেখা। ওবামা প্রথম মেয়াদে ফিলিস্তিন-ইসরাইল সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সে সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক কূটনৈতিক তত্পরতা চালিয়েও সফল হননি। তারপর জন কেরি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর ফের মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার সমাধানে কূটনৈতিক প্রয়াস শুরু হয়। আর তাই বলা যায়, ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রুহানির সাথে বারাক ওবামার সাম্প্রতিক টেলি-বৈঠক এরই একটি অংশ বিশেষ। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার আর তা হচ্ছে সিরিয়া প্রসঙ্গ। আমেরিকা হয়তো সিরিয়ার ব্যাপারে ইরানের সমর্থন লাভের জন্যই এরূপ হটলাইন কূটনীতির আশ্রয় নিয়েছে। একটা বিষয় আমাদের কাছে অত্যন্ত পরিষ্কার, এরূপ ফোনালাপের ফলে দুই দেশের সম্পর্ক যদি স্বাভাবিক হয় তাহলে তার সুফল সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের উপরেই পড়বে। তেহরান-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচী। আমেরিকা অনেক আগে থেকেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে কঠোর দমনমূলক নীতি অবলম্বন করে আসছে। তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচীকে শান্তিপূর্ণ দাবি করে আসলেও পশ্চিমা দেশগুলো এরূপ পারমাণবিক কর্মসূচীকে দেখছে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম অন্তরায় হিসেবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, স্নায়ুযুদ্ধকালীন নিরস্ত্রীকরণ নীতির সফল প্রয়োগ আমরা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে লক্ষ্য করলেও সাম্প্রতিককালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীতে নিরস্ত্রীকরণের ধারণা তেমন কোন ফল বয়ে আনতে পারছে না। কেননা ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচীর ইস্যুতে অনড়। তাই যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশ ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা এ অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি। এরূপ পরিস্থিতিতে ওবামা ও রুহানির টেলিফোন সংলাপ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিরসনে অনেকটাই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়। বারাক ওবামার সাম্প্রতিক মার্কিন নীতিতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সিরিয়ার যুদ্ধ এড়ানো, সিরিয়া প্রশ্নে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ঐকমত্য এবং ইরাকের ব্যাপারে ওবামা প্রশাসনের লক্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন রূপকেই ইঙ্গিত করে। যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক অবরোধ কোনটার মাধ্যমেই শান্তি অর্জন করা সম্ভব নয়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওবামা হয়তো বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছেন। আর তাই হয়তো আলোচনাকেই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ হিসেবে শনাক্ত করলেন। ওবামা-রুহানির টেলিফোন আলোচনা তাই-ই প্রমাণ করলো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়তো আমেরিকাকে নতুন করে আরেকটি যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষেত্রে ভাবিয়ে তুলেছে। তাছাড়া ২০০৮ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক মন্দা দেশটি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এরূপ পরিস্থিতিতে যুদ্ধে না জড়িয়ে বরং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা ও সংকট সমাধানের পথকেই অধিক অগ্রাধিকার দিচ্ছে আমেরিকা। ওবামা এবং রুহানির এরূপ হটলাইন কূটনীতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে যথেষ্ট প্রশংসনীয় হয়েছে। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিডো ভেস্টারভেলের মতে, “এই সপ্তাহটিতে সুযোগের জানালা খুলে গেল”। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিক আলোচনাকে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও কার্যকর বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ইরানের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার কথা বলেছেন। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়