আন্তর্জাতিক
শান্তির ভারসাম্যের পথে পৃথিবী
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১১
মার্কিন জনগণ প্রথা ভেঙে এক তারুণ্যদীপ্ত কৃষ্ণাঙ্গ নেতাকে দেশের প্রেসিডেন্ট পদটি অলংকৃত করার সুযোগ দেয়ায় পৃথিবী যারপরনাই খুশি। নোবেল কমিটি পরীক্ষার খাতা জমা হওয়ার আগেই বারাক ওবামাকে শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট আসনটি বরাদ্দ দেয়ায় পৃথিবী সমানভাবে বিস্মিত। একপর্যায়ে জগতবাসীর অন্তরে সৃষ্টি হয় বিশ্বাসের বীজ, এবার হয়তো সিনাই উপত্যকা সিক্ত হবে শান্তির বরিষণে। ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে শান্তি শব্দটি কতবার যে উচ্চারিত হয়েছে বা হয়ে আসছে তা নির্ণয় করা লেটেস্ট কম্পিউটারটির পক্ষেও দুঃসাধ্য। এই ক্লান্তিহীন ‘শান্তি’ ‘শান্তি’ বাতচিতের প্রতিযোগিতার সার্থকতায় এককভাবে এবং যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ইতিমধ্যে ভূষিত হয়েছেন অনেকেই। কিন্তু শান্তির শান্ত ছেলেটির আজও হয়তো জানা নেই ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডের ঠিকানা।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভূমিকায় সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে তুলে দিয়ে এ যাত্রা যুদ্ধের দামামা থামানো গেলেও বাশার আল আসাদকে পৃথিবী আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। আয়ারল্যান্ড যুদ্ধের বিবাদে পার্লামেন্ট ভবনের মধ্যে এমপিদের তলোয়ারের তলে মাথা পেতে দিয়ে দ্বিখণ্ডিত হওয়া রাজা প্রথম চার্লসের সেই একই পার্লামেন্ট প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুনকে যুদ্ধযাত্রায় থামিয়ে দিয়ে ব্রিটিশ জাতি আরেকবার প্রমাণ করল আধুনিক সভ্যতায় তার অবদান উল্লেখযোগ্যই বটে। ধীরগতি আর অনড় অবস্থানের কারণে চীনও ধন্যবাদের দাবিদার। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কৌশলীভূমিকায় অবতীর্ণ বারাক ওবামাও যুদ্ধযাত্রায় ক্ষ্যান্ত দেয়ায় পৃথিবী আপাতত হাঁফ ছাড়ল অসংখ্য প্রাণহানী আর স্থিত অর্থনৈতিক মন্দার অধগতির হাত থেকে। ইতিমধ্যে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেয়ায় পৃথিবী সত্যি খুশি।
২১ আগস্ট ২০১৩ সিরিয়ায় রাসায়নিক গ্যাস নিক্ষেপে নারী ও শিশুসহ প্রায় দেড় হাজার নিরীহ লোকের প্রাণহানী ঘটাল কারা? নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ঘাতকদের বিচার দাবি করে পৃথিবী। অন্যদিকে বাশার আল আসাদের উচিত ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সারিতে নিজেকে শামিল করা। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণে এটাই তার সুযোগ।
যুদ্ধ কী জিনিস তা পরপর দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং ইরাক আফগান ও বসনীয় যুদ্ধ আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পৃথিবী কিছুতেই আর যুদ্ধ চায় না—শান্তি চায়। সে শান্তির কাঙাল। সাম্প্রতিক বিশ্ব ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে পৃথিবী আবার সোভিয়েত যুগের ভারসাম্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ভারসাম্যের পৃথিবীর দেশে দেশে শান্তি ফিরে আসতে বাধ্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ শক্তিধর বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত রেখেও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য স্থির করার ক্ষমতা রাখেন একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। এভাবেই পৃথিবীর আধুনিক কুরুক্ষেত্রটি সিক্ত হতে পারে শান্তির বরিষণে। মনে রাখতে হবে শান্তি ও নিরাপত্তার সমঅধিকার আছে পৃথিবীর প্রতিটি দেশ জাতি ও জনগোষ্ঠীর। আমেরিকা আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্টদ্বয়ের কাছে পৃথিবীর প্রত্যাশা অনেক এবং অশেষ। সিরিয়া সংকট উত্তরণ ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ আলোচনার প্রস্তাবে বিশ্বের প্রায় সাতশ’ কোটি মানুষের চোখে-মুখে দেখা দিয়েছে আলোর ঝিলিক। এই ঝিলিককে প্রশান্তিতে রূপদান করাটাই বড় কথা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দ্বিতীয়বারের মতো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কায়ে ভূষিত হতে পারেন যথার্থভাবে। নোবেল শান্তি কমিটি এভাবেই এই পুরস্কারকে অধিকতর মর্যাদাশীল করে তুলতে পারেন সহজেই। ঐতিহাসিক দায়িত্বপালনে কাউকে না কাউকে ঝুঁকি নিতেই হয়। ইতিহাস বিনির্মাণে এগিয়ে আসতে হয় সাহসী বীর হয়ে। শান্তির জ্যোত্স্নায় প্লাবিত হোক পৃথিবী নামক আমাদের এই গ্রহটি।
লেখক: কবি