রাতারগুল জলাবন ও পর্যটনবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৫৭
বনবিভাগ ১৯৭৩ সালেই রাতারগুল জলাবনকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করিয়াছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বত্সর হইলো, ইহা সবিশেষ আকর্ষণীয় পর্যটনস্থলে পরিণত হইয়াছে। বিশেষ করিয়া দেশের একমাত্র জলাবন বা সোয়াম্প ফরেস্ট হওয়ায় রাতারগুল পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়িয়াছে। জলমগ্ন হিজল ও করাচ বৃক্ষ জলে ফেলে ঘন ছায়া; নির্জনতা ও নিবিড়তায় আচ্ছন্ন বনটি রহস্যঘেরা এক ইন্দ্রজাল বিস্তার করিয়া তাহার প্রাণী ও মত্স্যকূল লইয়া আপনমনে ছিল এতদিন। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপ্রেমী মানুষ আজ সেই ইন্দ্রজালের রহস্য ভেদ করিতে চাহে। ইহার ভালো ও মন্দ দুই দিকই রহিয়াছে। মানুষ তাহার ভ্রমণসুধার নয়া এক স্বাদ পাইতেছে রাতারগুলের নিকট হইতে। আবার এই মানুষই বিনষ্ট করিতেছে রাতারগুলের আপন অনন্য বৈশিষ্ট্যকে। আর বনবিভাগও যেন মানুষের এই চাহিদার প্রতি সাড়া দিয়া সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়াছে, যাহার সিংহভাগই ব্যয় হইবে পূর্ত বা অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে, যাহাতে পর্যটকরা সহজে রাতারগুলে পৌঁছাইতে পারে।
বনরক্ষা ও পর্যটনকেন্দ্র গড়িয়া তোলা— এই দুইটি প্রায় বিপরীত দুই প্রকল্প। পর্যটনে মন দিলে বনের বা প্রাকৃতিক ভূমিটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট হইবে। নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখিতে চাহিলে বনকে তাহার মতোই থাকিতে দিতে হইবে। অবকাঠামো নির্মাণ করিয়া যাইবার পথ প্রশস্ত করিয়া দিলে জনবহুল বাংলাদেশের মানুষের জনস্রোত ধাবিত হইবে প্রাকৃতিক কেন্দ্রটিতে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পর্যটকদেরও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংক্রান্ত সচেতনতা তেমন গড়ে উঠে নাই। বিশেষত রাতারগুলেই মানুষ ইঞ্জিন নৌকা নিয়া ঢুকিয়া পড়িতেছে, সংরক্ষিত বনটিতে বর্জ্য নিক্ষেপ করিতেছে, নিরবে সৌন্দর্য উপভোগের পরিবর্তে নিজেরা কোলাহল করিতেছে। মানুষের এইসব কার্যকলাপে ভীত হইয়া বহুদিন ধরিয়া বনে বাস করা পশু ও পাখিরা দূরে পালাইয়া যাইতেছে। পর্যটকদের প্রতাপে লাউয়াছড়া প্রাকৃতিক বনটি ইতোমধ্যেই তাহার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারাইয়া ফেলিয়াছে। বনবিভাগেরই দেখাইয়া দেয়া পথে লাউয়াছড়ায় আসে পিকনিক পার্টি, বাজে সংগীতনিনাদ, বসে খেলাধুলার আসর। হাওরগুলিকেও পর্যটনকেন্দ্র বানাইতে বনবিভাগ বেশ তত্পর। অথচ সুন্দরবন, লাউয়াছড়া, মধুপুর বা রাতারগুল বনে কাঠদস্যুতা ঠেকাইতে বনবিভাগ মোটামুটি ব্যর্থ। উপরন্তু বনায়নের নামে এইসকল বনে বনবিভাগ এমন সব দ্রুতবর্ধিষ্ণু বিদেশি গাছ লাগাইয়াছে যাহাকে জঙ্গল না বলিয়া জঞ্জাল বলা যাইতে পারে। বনবিভাগের প্রাথমিক দায়িত্ব হওয়া উচিত বনের সুরক্ষা দেওয়া এবং সেই কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অধিকতর দৃঢ় করা।
কিন্তু ভ্রমণপিপাসু মানুষ কি বনে ভ্রমণ করিতে যাইবে না? অভ্যন্তরীণ পর্যটন শিল্পের বিকাশও কি এই মুহূর্তে রোধ করিতে হইবে? আমরা মনে করি বনরক্ষা ও পর্যটনের একটি সমন্বয় করিতে হইবে। যেমন, পরিবেশবিদদের অনেকে মনে করিতেছেন রাতারগুল বনকে কেন্দ্র ও প্রান্ত, এই দুই ভাগে ভাগ করিয়া, প্রান্তকে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য উন্মুক্ত রাখিয়া কেন্দ্রকে পর্যটনের আওতামুক্ত করিবার ব্যবস্থা করা যাইতে পারে। ইঞ্জিনচালিত নৌকাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করিতে হইবে যাহাতে ইহার শব্দ ও পোড়া তৈল জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকির সৃষ্টি না করিতে পারে। প্রবেশপথে সাইনবোর্ডের মাধ্যমে ও মৌখিকভাবে মানুষকে পানির বোতল ও খাবারের প্যাকেট বহন করিতে এবং কোলাহল সৃষ্টিতে নিরুত্সাহিত করা যাইতে পারে। বনবিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবিদ এবং ট্রাভেল এজেন্টদের লইয়া একটি যৌথ কমিটি গঠন করিয়া সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করা যাইতে পারে এবং নিয়মিতভাবে এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরীক্ষা করা যাইতে পারে। এমনকি সাংবাদিক ও ভ্রমণলেখকদেরও রাতারগুল জলাবন লইয়া ফ্যান্টাসি রচনা করিবার পরিবর্তে এই বনটিকে কীভাবে রক্ষা করা যায় সেই দিকে আলোকপাত করিয়া প্রতিবেদন-নিবন্ধ লিখিতে হইবে। কেননা বনকে নিয়া পর্যটন ভাবনার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হইবার প্রয়োজন রহিয়াছে।