[ রা জ নী তি ]

নির্বাচন নাকি আন্দোলন : কোন পথে দেশ

রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। সম্প্রতি দেশের প্রধান দুই দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের বক্তব্যতে এ কথাই অনুমান করা যায়। নির্বাচন নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতারা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়েছেন। বিশেষ করে নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় নেতার পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ইতিমধ্যেই সাধারণ জনগণকে শঙ্কিত করে তুলেছে। জনগণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপলব্ধি করতে পারছে না কীভাবে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যথাযথ পরিবেশ তৈরি হবে। অর্থাত্ নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে হবে নাকি দেশ আন্দোলনের দিকে যাবে। তবে এতটুকু নিশ্চিত করে বলা যায় যে, যেমনই হোক, নির্বাচন হবে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতাদের বক্তব্য শুনে এটি ধারণা করা যায় যে, যেকোনো উপায়েই হোক দেশে যথাসময়ে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। ইতিমধ্যেই জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে করার জন্য জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক প্রেরণের অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিপূর্বে বিদ্যমান রাজনৈতিক সমস্যা নিরসনে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার কাছে টেলিফোন করে পারস্পরিক সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এমনকি এ টেলিফোনের আগে জাতিসংঘের প্রতিনিধি ফার্নান্দেজ তারানকো বাংলাদেশে এসে সরকারি ও বিরোধী দলীয় শীর্ষনেতার সঙ্গে বৈঠক করে সংলাপের তাগিদ দিয়েছেন। আজ পর্যন্ত দু’পক্ষের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়নি এবং নির্বাচন প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতিও হয়নি। সরকার আশাবাদী ছিল বিএনপি সংসদে এসে সংবিধানের আলোকে একটি পন্থা নির্ধারণ করে নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে প্রস্তাবনা অথবা রূপরেখা প্রদান করবে। কিন্তু বিরোধী দল এমন কোনো সম্ভাবনার জালে এখন পর্যন্ত পা ফেলেনি। বরং সরকারকে বারবার অভিযোগ করে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া রাজপথের জনসভায় সরকার পতনের হুমকি এবং সর্বশেষ ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিয়েছেন। বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া গত ২৯ সেপ্টেম্বর খুলনার জনসভায় বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না; করতেও দেবে না। একই সঙ্গে তিনি দেশ বাঁচানোর জন্য আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানোর কথাও বলেছেন। তার এই বক্তব্য দ্ব্যর্থবোধক এবং এতে গণতান্ত্রিক ইতিবাচক অর্থ লক্ষ্য করা যায় না। কারণ নির্বাচিত হোক আর অনির্বাচিত হোক-সরকারকে সরানোর সাধারণত দুটি পদ্ধতি বিদ্যমান আছে। যথা- এক. গণআন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা, দুই. নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে পরাজিত করা। এখন প্রশ্ন হলো বিএনপি কোনিট বেছে নেবে- নির্বাচন না আন্দোলন? আবার আন্দোলনেরও দুটি দিক আছে। এক. সরকারকে চাপে রেখে যতটা সম্ভব দাবি আদায় করা, দুই. সর্বাত্মক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পদত্যাগ। এক্ষেত্রে ধরা যাক, বিরোধী দল আন্দোলন করে সরকারকে সরিয়েই দিল। তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কে নেবে অর্থাত্ সরকার পরিচালিত হবে কীভাবে? সরকার পতনের সাথে সাথে বিএনপি নিশ্চয়ই সরকারি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে না কিংবা আওয়ামী লীগও থাকবে না। সেক্ষেত্রে সাংবিধানিক শূন্যতার পরিবেশ সৃষ্টির ফলে অন্য কোনো অগণতান্ত্রিক কিংবা অসাংবিধানিক সরকার ক্ষমতায় আসার সুযোগ থেকে যাবে। কাজেই আন্দোলন সংগ্রামের বিষয়েও বিরোধী দলকে সচেতন থাকতে হবে গণতন্ত্রের স্বার্থে। তবে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না প্রশ্নে নানাবিধ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও তাদের ইদানীংকালের কর্মকাণ্ডে মনে হয়েছে যে, তারা নির্বাচনে যাবে। কারণ খালেদা জিয়া তার জনসভায় নির্দলীয় সরকারের দাবির পাশাপাশি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে কি কি করবে সে প্রতিশ্রুতিও দিয়ে যাচ্ছেন। কাজেই বিএনপি নেতৃবৃন্দের মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে দ্বিমত থাকলেও বিভিন্ন অঞ্চলে বিরোধী দলের জনসভা, নেতাকর্মীদের আচার-আচরণ, তাদের বিগত স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচনের ফলাফলে জনপ্রিয়তার প্রমাণ প্রভৃতি বিবেচনায় বলা যায় যে, তারা সহজে নির্বাচন বর্জন করবে না। নির্বাচনে অংশগ্রহণের শর্ত হিসেবে ‘প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন না করা’ এবং ‘সংসদ ভেঙে নির্বাচনে সমতল পরিবেশ তৈরির’ বিষয়টিই বিরোধী দল গুরুত্ব দেবে বলে মনে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা যায় যে, ভেতরে ভেতরে তারা নির্বাচনের প্রস্তুতিই নিচ্ছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির প্রার্থী বাছাইয়ের খবর এসেছে। কেউ কেউ রঙিন পোস্টারের মাধ্যমে নিজেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করে দিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছে। যদিও নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিও এর সাথে বিদ্যমান রয়েছে। এদিকে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণমূলক রায়ে জাতীয় সংসদে বাতিলকৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করবে না তা সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে সরকার । প্রধানমন্ত্রী, নির্বাচন কমিশনার ও জাতীয় সংসদের স্পিকার যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আবার মজার বিষয় হলো, খালেদা জিয়া একদিকে বলছেন নির্বাচন প্রতিহত করা হবে, অন্যদিকে বলছেন নির্বাচনে বিজয়ী হলে নতুন ধরনের সরকার গঠন করবেন। তিনি ধারাবাহিক হুমকি দিয়ে চলেছেন একথা বলে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। উল্লেখ্য যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারে দাবিতে বিএনপি এবং এর শরিক দলগুলো বিগত তিন বছরের বেশি সময় ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের সেই আন্দোলন সরকারকে বিন্দুমাত্র নড়চড় করাতে পারেনি। বর্তমানে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে যে, বিরোধী দলের হুমকি, আল্টিমেটাম ও অসাংবিধানিক দাবির প্রতি সরকারের কোনো ভয় নেই। কারণ ইতিমধ্যেই দেশের তিন বাহিনীর প্রধানগণ গণতন্ত্র ও সংবিধানের পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেছেন ( ভোরের কাগজ, ২ অক্টোবর ২০১৩)। বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে এবং নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে যত আলোচনা-সমালোচনা হয় অন্য কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে খুব একটা হয় না। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে অনিশ্চয়তা এবং সরকার পরিবর্তনে মসৃণ পথ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় এখনও স্বপ্নই থেকে গেছে। বর্তমানে নির্দলীয় সরকার নিয়ে বিএনপির যে আন্দোলন সেটি যে এর মধ্যে দিয়েই শেষ কিংবা এ আমলেই শেষ হবে তা নয়। পরবর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে যে এমন কোনো আন্দোলন হবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার পদ্ধতি সংবিধানে উল্লেখ থাকলেই যে সকল সমস্যার সমাধান হবে সেটিও নির্দিষ্ট নয়। ইতিপূর্বে এমন নজির আমরা লক্ষ্য করতে পারিনি। কারণ কে নির্দলীয় সরকারের প্রধান হবে সে বিতর্কও বাংলাদশে নতুন কিছু নয়। গত ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বলেন, গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে তা নিয়েও চিন্তা-ভাবনা চলছে। খুব শিগগিরই জাতির সামনে তুলে ধরার ঘোষণা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের তথ্য মতে দু-চারদিনের মধ্যে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তা পরিষ্কার করবেন (যুগান্তর ২ অক্টোবর ২০১৩)। যদিও গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে সংসদে এসে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়ার জন্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমি যেকোনো ত্যাগস্বীকার করতে প্রস্তুত।’ প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশেষ করে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। এমতাবস্থায় বিরোধী দলের উচিত হবে গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করা। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ছাড়ের পরিমাণ নিয়েও তারা কথা বলতে পারে। এতে জনগণের কাছে বিরোধী দলের অবস্থান আরো বেশি পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। নির্বাচন ঠেকানো কিংবা বানচালের ফর্মুলা হাতে না নিয়ে গণতন্ত্রের স্বার্থে ইতিবাচক পদক্ষেপে এগিয়ে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তবে এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ‘যেকোনো ত্যাগস্বীকারের’ বিষয়টি স্বেচ্ছায় পরিষ্কার করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, তিনি যেকোনো মূল্যে দেশে একটি নির্বাচন চান। তবে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো একতরফা নির্বাচন নাকি সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন। এক্ষেত্রে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা জরুরি। ক্ষমতাসীনরা সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংসদ বহাল রেখে যে নির্বাচনের কথা বলছে সেটি যেমন বিরোধী দলের কাছে কাম্য নয় তেমনি বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনের কিংবা নির্বাচন ঠেকিয়ে দেয়ার প্রবণতাও জনগণের কাছে কাম্য নয়। বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে যে ‘এক-পা আগানো এবং দু-পা পেছানো’ মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা সমাধান করার বেশিরভাগ দায়িত্ব সরকারের। কারণ প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণেই অবাধ নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত হতে পারে। তবে বিরোধী দলের নমনীয়তাও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই ভুলে যাননি যে, বিগত ১৯৯৬ ও ২০০৭ সালে ক্ষমতাসীনদের একগুঁয়েমির কারণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এবারও সে রকমই আরেকটি পরিবেশ তৈরি হোক সেটি দেশের মানুষ চায় না। সাধারণ জনগণ ‘দেশ অচল করা আন্দোলন’ কিংবা ‘একতরফা নির্বাচন’ কোনোটিই মানবে না। তারা চায় সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। আর রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী মানসিকতাই দেশে গণতান্ত্রিক যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে। লেখক:সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ই-মেইল : sultanmahmud.rana@gmail.com