শিক্ষাবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাবিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে দেশে একটি শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক। শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কিছু যৌক্তিকতা তুলে ধরা হলো— এক. বাংলাদেশে বর্তমানে সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি কিছু বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিত্সা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ভেটেরিনারি ও এনিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। এ সকল বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোর দ্রুত বিকাশ হচ্ছে । দুই. জ্ঞানের ক্ষেত্র হিসেবে একদিকে শিক্ষার রয়েছে বিশাল ভূমিকা আবার অন্যদিকে অন্যান্য ক্ষেত্রের বিকাশ শিক্ষার উন্নয়নের সাথে জড়িত। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শিক্ষা যেমন অন্য সকল বিভাগে দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ করে একইভাবে শিক্ষা নিজেই কর্মসংস্থানের এক বিশাল ক্ষেত্র। বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রটি পৃথিবীর অনেক দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রের তুলনায় বৃহত্। যেমন— বাংলাদেশে মোট ৭৮৬৮৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৩৯৫২৮১ জন শিক্ষক, ১৯০৭০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট ২২৩৫৫৫ জন শিক্ষক, কলেজ পর্যায়ে ৩৪৭৫টি প্রতিষ্ঠানে মোট ৯৫৬২০ জন শিক্ষক, মাদ্রাসা পর্যায়ে ৯৩৩০টি প্রতিষ্ঠানে মোট ১০৭১৭৭ জন শিক্ষক রয়েছেন। দেশে প্রাথমিক ও প্রাথমিক উত্তর স্তরে মোট ১১৪১১৪টি প্রতিষ্ঠানে মোট ৮৬৭৭৬৪ জন শিক্ষক রয়েছে ( সূত্র: ব্যানবেইস ২০১১)। ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত স্কুলের শিক্ষকতায় এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক , মাদ্রাসা শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার প্রশাসনিক, ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কাজের সাথে জড়িত রয়েছে আরও অনেক জনশক্তি। তিন. শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশের একটি ধারা রয়েছে। যেমন : ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে মোট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৭৭৯১টি যা ১৯৯০ সালে ১০৪৪৮টি, ২০১১ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯০৭০টি তে। আবার ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ২৮১০৬টি, ১৯৯০ সালে ৩৭৬৫৫টি, ২০১১ সালে এ সংখ্যা হয়েছে ৭৮৬৮৫টি। ১৯৯০ সালে মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল ৪৮৭৩টি, ২০১১ সালে হয়েছে ৯৩৩০টি (সূত্র: ব্যানবেইস ২০১১ ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট)। শিক্ষার বিভিন্ন সূচকের উন্নয়নের সাথে এ ক্ষেত্র বিকশিত হতেই থাকবে। কেননা ‘সবার জন্য শিক্ষা’ নিশ্চিতকরণে এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরাও অঙ্গীকারাবদ্ধ। চার. সম্প্রতি বাংলাদেশে শিক্ষার উন্নয়নে নেয়া হয়েছে নানামুখী পদক্ষেপ। যার ফল ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছি। এখন আমাদের নজর দেয়া উচিত গুণগত শিক্ষার দিকে। আর গুণগত শিক্ষার প্রধান নিয়ামকসমূহ হচ্ছে— উপযুক্ত শিক্ষার্থী, শিখন পরিবেশ, মানসম্পন্ন বিষয়বস্তু, যথাযথ শিক্ষণ পদ্ধতি ও কৌশল, যোগ্য শিক্ষক ও মানসম্পন্ন ফলাফল। এর প্রত্যেকটি নিয়ামকই শিক্ষক শিক্ষার সাথে জড়িত। কাজেই শিক্ষক শিক্ষাকে উন্নত করতে পারলেই গুণগত শিক্ষা অর্জন সহজতর হবে। তাই উল্লেখিত ৮৬৭৭৬৪ জন শিক্ষককে গুণগত শিক্ষার উপযোগী করে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউনিভার্সিটি অব এডুকেশন। পাঁচ. বর্তমানে বাংলাদেশে ৫৪টি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ১৪টি সরকারি ও প্রায় একশ’টি বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, ৫টি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ০১টি মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট রয়েছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য কোন প্রতিষ্ঠান নেই। শিক্ষকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নেই। তবে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইসস্টিটিউট এবং বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন এন্ড ডেভেলপমেণ্ট শিক্ষা বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা করে থাকে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট চালু করা হয়েছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর ব্যতীত বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ব্যাপ্তি কম। অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক শিক্ষা বিষয়ক কিছু গবেষণা হচ্ছে। তাই শিক্ষা বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা ও শিক্ষায় উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমের প্রসঙ্গ আসা মাত্রই শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা চলে আসে। ছয়. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ঢাকাতে শিক্ষা বিষয়ে অনার্স কোর্স আছে। আরও ৫/৬টি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষা বিষয়ে অনার্স কোর্স চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। শিক্ষা বিষয়ে অনার্স এবং টিচার্স ট্রেনিং কলেজসমূহে পরিচালিত বি.্এড ও এম.এড. প্রোগ্রামের একাডেমিক মান বজায় রাখা ও শিক্ষা বিষয়কে স্বাধীন বিষয় হিসেবে পরিচালনা করতে হলে শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন জরুরি। সাত. আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানে ২০০২ সালে ইউনিভার্সিটি অব এডুকেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়াতে আছে ইন্দোনেশিয়া ইউনিভার্সিটি অব এডুকেশন, দক্ষিণ কোরিয়াতে আছে কোরিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব এডুকেশন, জাপানেও শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তাছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশেই শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় অথবা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি অব এডুকেশন রয়েছে। আট. শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে নানামুখী সমস্যা। এসকল সমস্যা অনুমানেরভিত্তিতে সমাধানের চেষ্টা করলে পুনঃ পুনঃ চেষ্টার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এ সকল সমস্যার যুতসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন গবেষণা। শিক্ষা বিষয়ক গবেষণার কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়। লেখক:সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ইমেইল: basharnsl@hotmail.com