সুখের সন্ধানে

আমরা সবাই সুখের অষ্ট্রেলিয়ায় ছুটছি। একজন দিনমজুর থেকে শুরু করে বিত্তশালী; সুখী হবার জন্য সবার প্রচেষ্টার যেনো অন্ত নেই। কিন্তু চাইলেই কি সবাই সুখী হতে পারে? কিংবদন্তী শিল্পী মান্না দে তার একটি গানে যথার্থই বলেছেন, ‘সবাইতো সুখী হতে চায়, কেউ সুখী হয় কেউ হয় না। সম্প্রতি সুখকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য কিছু সূচক নির্ধারণ করে বিভিন্ন জরিপ চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো ইউরোপ ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান The Organization for Economic Co-operation and Development (OECD) পরিচালিত বেটার লাইফ ইনডেক্স জরিপ। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে করা এই জরিপের তথ্যানুযায়ী সবচেয়ে সুখী দেশ হিসাবে টানা তৃতীয়বারের মত নির্বাচিত হয়ে হ্যাটট্রিক করেছেন অষ্ট্রেলিয়া। মাথাপিছু আয়, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার মান ইত্যাদি বিবেচনা করে সুখের মানদণ্ড স্থির করা হয়েছে এই জরিপে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অষ্ট্রেলিয়া উন্নত দেশগুলোর মধ্যে বেশ এগিয়ে আছে। অষ্ট্রেলিয়ায় বেকাত্বের হার হলো ৫.৫% অথচ আমেরিকায় ৭.৫% এবং ইউরোজোনে ১২.১%। দক্ষতার সাথে অষ্ট্রেলিয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার বিক্ষুব্ধ সাগর পাড়ি দিতে সমর্থ হলেও এজন্য অষ্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। উচ্চ সুদের হার এবং রিয়েল এস্টেট বাজারে ধস নামার কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায়, অনেকেই তাদের স্বপ্নে বাড়ি তুলে দিয়েছেন ব্যাংকের হাতে। যার পরিণামে ভেঙ্গে গেছে বহু সাজানো সংসার। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা হয়েছেন সর্বস্বান্ত। মাত্র ছ’বছর আগে অর্থাত্ ২০০৫ সালে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের “World Happiness Survey” অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। অবাক করা কথাই বটে! অথচ ২০১২ সালের “World Happiness Report”-মতে সুখী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্থান হচ্ছে ১০৪তম। এই রিপোর্টে এমনকি ইরাক ও পাকিস্তানও বাংলাদেশের উপরে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশে দুর্নীতি, দারিদ্র্য, অপরাধ ও জনসংখ্যার চাপ রয়েছে একথা সত্যি। কিন্তু যেখানে ২০০৫ সালের জরিপে বাংলাদেশ সবচেয়ে সুখী দেশে বলে চিহ্নিত হলো, সেই দেশ মাত্র সাত বছরে তালিকার এতো নিচে নেমে আসে কি করে? এবার অন্য একটি জরিপের কথা ধরা যাক। যুক্তরাজ্যের নিউ ইকনমিক্স ফাউন্ডেশন ২০০৬ সাল থেকে ‘হ্যাপি প্ল্যানেট ইনডেক্স’ প্রকাশ করে আসছে। ২০১২ সালে প্রকাশিত তালিকায় সুখী দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬১ দেশের মধ্যে ১১তম। প্রথম স্থান রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ কোষ্টারিকা। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সমস্যায় জর্জরিত আফগানিস্তানের স্থান ১০৯তম এবং আমেরিকার ১০৫তম। এদিকে ২০১০ সালে ভুটানের সাধারণ মানুষের উপর চালানো একটি জরিপে বলা হয়েছে সেখানকার ৪১ শতাংশ মানুষ সুখী। ‘গড় জাতীয় সুখ’-এর মানদণ্ডে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে ভুটান। এই ফলাফল দেখে জরিপ বিশেষজ্ঞদের আক্কেলগুড়ুম হবার দশা। ভুটান পৃথিবীর একটি অন্যতম দরিদ্র দেশ। অথচ ওই দেশের মাটিতে বসত গেড়েছে সুখ। জরিপে জানা যায়, ভুটানের মানুষের কাছে অপার্থিব এবং আধ্যাত্মিক সুখ অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। মোটামুটিভাবে বিভিন্ন জরিপে ব্যবহূত সুখের সূচকগুলো প্রায় একই রকম হলেও জরিপ থেকে বেরিয়ে আসছে অদ্ভুত ফলাফল, যা দেখে হিসাব মেলানো সত্যিই মুশকিল। ‘বেটার লাইফ ইনডেক্স’ জরিপের ফলাফল দেখে অষ্ট্রেলিয়ার একজন স্থায়ী বাসিন্দা হিসাবে ভালই লেগেছে। বিশ্বের একটি অন্যতম সুখী দেশে থাকতে কার না ভালো লাগে? এই জরিপের ফলাফল দেখে অনুন্নত দেশের অনেকেই হয়তো সুখের সন্ধানে অষ্ট্রেলিয়াসহ তালিকার শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর দিকে ছুটবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অষ্ট্রেলিয়ার মানুষ কি আসলেই সুখী? সুখ হলো আপেক্ষিক। দরিদ্রতম দেশের একটি হলেও বাংলাদেশের মানুষ অল্প আয়ে যেরকম তুষ্ট থাকেন, বড় আকারের ব্যাংক ব্যালেন্স নিয়েও উন্নত দেশের অনেকে তেমন তৃপ্ত নন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো নিরাপত্তা। বাড়ি থেকে বেরুবার পর নিরাপদে ঘরে ফিরবেন এমন নিশ্চয়তা চান সবাই। কিন্তু তা বলে অষ্ট্রেলিয়ায় বসবাস করলেই যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যাবে এমন গ্যারান্টিও দেয়া যায় না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল হলে উন্নত দেশের শহরগুলো যে কতোটা অরক্ষিত হতে পারে তা হ্যারিকেন ক্যাটরিনা বিধ্বস্ত আমেরিকার নিউ অরলিন্স শহরে সংঘটিত ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। অষ্ট্রেলিয়ার শহরগুলোতেও ক্রাইম হচ্ছে, তবে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর দক্ষতার জন্য তা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। পরিসংখ্যান দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী অষ্ট্রেলিয়ায় প্রতি আট মিনিটে একটি করে গাড়ি চুরি হয়, আর প্রতি দেড় মিনিটে গাড়ির ভেতর থেকে কোনো না কোনো মূল্যবান সামগ্রী চুরি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রতি মিনিটে একটি বাড়িতে চুরি হচ্ছে। আমার গাড়িও একবার চোরের কবলে পড়েছিল। চোরের হাত থেকে সুরক্ষার জন্য প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে বিভিন্ন ধরনের এলার্ম সিস্টেম। কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে এলার্ম সিস্টেমকে বাড়ির মালিকের মোবাইল ফোনের সাথেও সংযুক্ত করা হচ্ছে। আর বাড়ির ইন্সিওরেন্সের কথা নাই বা বললাম। তবে এলার্ম থাকার পরও বাড়ি-ঘর সুরক্ষিত থাকছে না। এলার্ম উপড়ে ফেলে দিয়ে ঘরে চোর ঢুকছে। এছাড়া রাত গভীর হলে সিডনী শহরে মেট্রো ট্রেন কিংবা স্টেশনগুলো চলাচলের জন্য খুব একটা নিরাপদ থাকে না। সুখ নিয়ে করা জরিপের ফলাফল থেকে যে বিষয় বেরিয়ে আসছে তা হলো সম্পদ আর প্রাচুর্য দিয়ে আর যাই কেনা যাক না কেনো, সুখ কেনা যায় না। আর উন্নত দেশ হলেই যে সেই দেশের নাগরিকরা বেশি সুখী হবেন এ কথাও ঠিক নয়। উন্নত দেশের নাগরিকদের সুখী কিংবা অসুখী হবার কারণ অনুন্নত দেশের মানুষদের চেয়ে ভিন্নতর। টাকার মানের জন্য নাগরিকদের আয় বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি হলেও জীবনযাত্রার মান উঁচু হওয়ায় ওই সব দেশে দৈনন্দিন জীবনের খরচও অনেক বেশি। অষ্ট্রেলিয়ায় ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার সুযোগ খুবই কম। তাই আয়ের একটা বড় অংশ ট্যাক্স হিসাবে চলে যায় সরকারি তহবিলে। উন্নত দেশের সামর্থ্যবান প্রায় সবারই একটি ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি রয়েছে যা আবার ঋণের জন্য ব্যাংকের কাছে বন্ধক দেয়া। ফলে প্রতিমাসে আয়ের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যাংকে ঢালতে হয়। জীবিকা নির্বাহের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই কাজ করতে হয়। কাজের সময়ের তারতম্য থাকায় সপ্তাহের অধিকাংশ দিন একে অন্যের মুখোমুখি বসে সুখ-দুঃখের কথা বলবারও সময় হয় না। চাপের মধ্যে জীবনযাপন করতে গিয়ে পরিবারের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে যা মানুষকে ধীরে ধীরে অসুখী করে তুলতে পারে। সত্যিকার অর্থে প্রগাঢ় পারিবারিক বন্ধন, সু-স্বাস্থ্য, সুন্দর কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পারিবারিক জীবনে ভাঙ্গন, একাকিত্ব, প্রিয়জনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার ভয় মানুষকে খুব সহজেই অসুখী করে তোলে। সুখ নিয়ে সব সময় হা-হুতাশ করলে সুখী হওয়া যায় না। নিজের চেয়ে অসচ্ছল কিংবা বিপদগ্রস্ত কারো দিকে তাকালে নিজের সুখটা বড় হয়ে চোখে পড়ে, নিজেকে তখন সহজেই সুখী মনে হয়। একজন বিত্তশালী শিল্পপতির কথাই ধরা যাক যার গাড়ি, বাড়ি, সম্পদের প্রাচুর্য, বলতে গেলে সব কিছুই রয়েছে। আপতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ওই শিল্পপতির চেয়ে সুখী আর কে আছে! কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, যাদের রয়েছে সম্পদের পাহাড়, তাদের সম্পদ রক্ষার দুঃশ্চিন্তারও নেই শেষ। রাতে এক মুঠো নিশ্চিন্ত ঘুমের জন্য আঁকুপাকু করে তাদের মন। কিন্তু জীবনের কাছে প্রত্যাশা কম থাকে বলে একজন সাধারণ মানুষ দরিদ্র হলেও জীবনের ছোটখাট পাওয়ার মধ্যে তৃপ্তি খুঁজে পান, চলার পথের ক্ষুদ্র অর্জনগুলোকেও অনেক বেশি তারা কদর করেন। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে একজন রিক্সাচালক যখন তার বস্তিঘরে ঘুমাতে যান তখন কাল কি হবে সে নিয়ে তার তেমন কোনো ভাবনা থাকে না। কারণ বেঁচে থাকাটাই হলো তার জন্য বিশাল বোনাস। তাই বাংলাদেশ ও ভুটানের মানুষ উন্নত অনেক দেশের নাগরিকদের চেয়ে বেশি সুখী, জরিপে পাওয়া এ ধরনের তথ্য দেখে বিস্মিত হবার কারণ নেই। লেখক : সিডনী প্রবাসী প্রকৌশলী