দিবস

চাই সার্বজনীন মানসম্মত শিক্ষা

বরাবরের মতো এবারও আজ ৫ অক্টোবর বাংলাদেশসহ প্রায় ১৯১টি দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে— ‘A Call for Teachers’-এর অন্তর্নিহিত তাত্পর্য হলো সার্বজনিন মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষকতা একটি নিয়ামক শক্তি। ইউনেস্কো, আইএলও, ইউনিসেপ ও এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে পৃথিবীব্যাপী এ দিবসটি উদযাপন করছে। বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের কাছেও এ দিবসটি অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার। ১৯৯৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। শিক্ষকদের জন্য প্রণীত সনদ ও দলিলে শিক্ষকতাকে একটি সেবামূলক পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। শিক্ষার অগ্রগতিতে শিক্ষক সমাজের যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রায়োগিক গুণাবালীর প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শিক্ষকদের নিঃখরচায় চিকিত্সা ও স্বাস্থ্য সুবিধা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়, এ ছাড়াও শিক্ষকদের সাংগঠনিক ও শিক্ষা বিকাশমূলক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ ও সবেতনে ছুটি প্রদান এবং সকল শিক্ষকদের বার্ষিক ছুটি ভোগের অধিকার প্রদান নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। শিক্ষকদের বেতন ভাতা ও মর্যাদা প্রসেঙ্গ বলা হয়েছে ১। শিক্ষকদের মর্যাদাকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে প্রদেয় বেতন ভাতা নিশ্চিতকরণ, ২। সমাজের শিক্ষকতার গুরুত্ব প্রতিফলনে অন্যান্য পেশা সমমানের যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রদত্ত বেতনের সাথে অনুকূল, তুলনীয়ভাবে ও পরিবার পরিজনসহ যুক্তিসঙ্গত জীবন ধারণের মান বজায় রাখার নিশ্চয়তা বিধান সাপেক্ষে শিক্ষকদের বেতন ভাতা সুনির্ধারণ করা, ৩। প্রতিষ্ঠিত বেতন স্কেলের ভিত্তিতে শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন পরিশোধ, ৪। জীবন ধারণের ব্যয় বৃদ্ধি ও বর্ধিত উত্পাদনশীলতার কারণে ব্যয়র ঊর্ধ্বমুখী বিবেচনায় প্রয়োজন অনুসারে বেতন স্কেল পুনঃনির্ধারণ। উপরোক্ত সুপারিশমালার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে এর বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় শিক্ষকদের বেতন স্কেল খুবই কম। বর্তমান সরকার শিক্ষকদের মান উন্নয়নে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিলেও বেতন অবকাঠামো পরিবর্তনের কোন ব্যবস্থা নেননি। এ সরকারের শুরু থেকে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও এ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বায়নের যুগে ক্ষুধার্ত শিক্ষক দিয়ে তৃষ্ণার্ত শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। দেশের বিরাট জনশক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার মূল হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার উন্নয়ন পরিকল্পনা, সার্বিক প্রয়োগ ও সাম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের সার্বিক কল্যাণ অর্জিত হয়। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য উপাদানসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম, পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক, গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ ও উপযুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতি। এ সকল উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পর্যাপ্ত সংখ্যক সুশিক্ষক। সুশিক্ষককে অনেক গুণের অধিকারী হতে হয়। তাকে অবশ্যই মনে রাখতে হয় শিক্ষকতা কেবল চাকরি নয় বরং এটি একটি মহান পেশা। সর্বদা ন্যায়নীতির প্রশ্নে আপোষহীন মূর্ত প্রতীক। তিনি শিক্ষার্থীর মনন, মেধা, আত্মশক্তির বিকাশ, পরিশীলন, উন্নয়ন ও প্রসার সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি, বর্তমানে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। কতিপয় শিক্ষক নামধারী ব্যক্তির কারণে শিক্ষক জাতি লজ্জিত হচ্ছে। এর পিছনে বহুবিধ কারণও রয়েছে। শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিশ্চয়তা না থাকলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এ পেশায় আকৃষ্ট হতে চান না। শিক্ষকদের পারিবারিক চাহিদা পূরণের যৌক্তিক বেতন কাঠামো থাকলে একজন শিক্ষক কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনীর দিকে উত্সাহিত হবেন না। প্রাইভেট টিউশনী বা কোচিং শিক্ষকদের জন্য মর্যাদাকর কিছু নয়। বরং এ সকল কারণে অনেক সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন স্কেল নির্ধারণ হলে উন্নতর যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা এ পেশায় অংশগ্রহণে আগ্রহী হবে এবং সার্বজনীন মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে। লেখক: গবেষক ও জেনারেল সেক্রেটারী, বাংলাদেশ টিচার্স ফেডারেশন (এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল অধিভুক্ত।) Email:azad2069@gmail.com