হক সাহেব থেকে শেখ সাহেব এবং শেখ হাসিনা (২)

হক সাহেব থেকে শেখ সাহেব এবং শেখ হাসিনা পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাঙালির জাতিসত্তা এবং জাতিপরিচয় নির্ধারিত হওয়ার একটা চূড়ান্ত সংগ্রামের দিকে দেশ এখন এগিয়ে চলেছে। আর আমাদের জন্য ইতিহাসের সবচাইতে বড় শিক্ষা এই যে, বড় বড় পণ্ডিতেরা ইতিহাস লেখেন, ইতিহাস তৈরি করতে পারেন না। ইতিহাস তৈরি করে সাধারণ মানুষ এবং তাদের সেই সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন ওই সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে উঠে আসা নেতা বা নেত্রী। বালাদেশে বাঙালির জাতিসত্তা ও জাতিপরিচয় নির্ধারণে আজ যে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এক সাবেক গৃহবধূ। নেতৃত্ব দিতে পারছেন না কোনো বিদ্যাদিগগজ আইনজীবী, কোনো অর্ধ নোবেলজয়ী বা অর্থনীতির জাদুকর। বরং তারা ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে উল্টো স্রোতে অবস্থান নিয়ে শুধু নিজেদের নয়, দেশেরও ক্ষতি করছেন। তথাকথিত এলিট কুল-চূড়ামণিদের এই ভূমিকা হক সাহেবের আমলে ছিল, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আমলে ছিল, শেখ হাসিনার বর্তমান আমলেও আছে। অবিভক্ত বাংলায় ফজলুল হক যখন প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টির নেতা এবং প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী (বাংলা ও পাঞ্জাবের সরকার প্রধানকে তখন মুখ্যমন্ত্রী নয়, প্রধানমন্ত্রী বলা হতো), তখন তিনি থাকতেন কলকাতার ঝাউতলা রোডে। ফজলুল হক ছিলেন বাঙালি মুসলিম নব্য মধ্যবিত্তের জন্মদাতা (Father of the newborn Bangali muslim middle class) এই নবোদ্ভিন্ন মুসলিম মধ্যবিত্তই পিতাকে অস্বীকার করে প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক জিন্না নেতৃত্বের অনুগামী হয় এবং হক সাহেবকে হিন্দুর দালাল, ‘ঝাউতলার লাউওয়ালা’ বলে গালি দিয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বেলায় এর অন্যথা হয়নি। হক সাহেব যদি বাঙালি মুসলমানদের জন্য শিক্ষার প্রসার এবং চাকরি-বাকরির সুবিধা সৃষ্টি দ্বারা তাদের মধ্যবিত্তকে জন্মদান করে থাকেন, তাহলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলায় তার স্বল্পকালীন প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তকে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু ও অবাঙালি ব্যবসায়ীদের অসম প্রতিযোগিতার মুখে ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিল্পে প্রতিষ্ঠা লাভে সুযোগ করে দিয়ে আরো এগিয়ে দেন। অনেকে মনে করেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃত্ব থেকে মুসলিম লীগের অবাঙালি হাই কমান্ড দ্বারা বিতাড়িত হওয়ার একটি বড় কারণ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হলে মুসলিম লীগের পৃষ্ঠপোষক আদমজি, ইস্পাহানি প্রমুখ বাংলায় বাইরের বড় বড় মুসলিম ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা এসে এই প্রদেশটিতে তাদের অর্থনৈতিক কলোনি প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না এই আশঙ্কা তারা করেছিলেন। তারা ধরে নিয়েছিলেন, সোহরাওয়ার্দী বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তদের মধ্য থেকে পাল্টা ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি গোষ্ঠী গড়ে তুলবেন। উর্দু ভাষী ঢাকায় নবাব পরিবারের খাজা নাজিমউদ্দীনকে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী করা হলে এই ভয় তাদের থাকবে না। তিনি বাঙালির স্বার্থরক্ষায় লড়াই করতে নামবেন না। পাকিস্তান অর্জনের সংগ্রামে সবচাইতে সফল নেতা ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পাকিস্তান ইস্যুতে অনুষ্ঠিত ১৯৪৬ সালের ভারতব্যাপী নির্বাচনে তার নেতৃত্বেই অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ নিরঙ্কুশ বিজয়ের অধিকারী হয়। এই বিরাট সাফল্যের এক বছর না যেতেই মুসলিম লীগের অবাঙালি কেন্দ্রীয় হাই কমান্ডের চক্রান্তে তিনি প্রাদেশিক মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির নেতৃত্ব থেকে বিতাড়িত হন, তার স্থলে বসানো হয় খাজা নাজিমুদ্দীনকে। এমনকি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরই তাকে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তাকে ‘ভারতের লেলিয়ে দেওয়া পাগলা কুত্তা’ বলে আখ্যা দেন। তখনও দেখা গেছে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তদের প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত অংশটি সোহরাওয়ার্দী-বিরোধিতায় মেতে উঠেছে এবং তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ শাসকেরা অবস্থান গ্রহণ করলেও তাদের সমর্থন জানিয়েছে। অবিভক্ত বাংলায় সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভায় তখনকার যেসব তরুণ নেতা ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডান হাত ও বাঁ হাত, যেমন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, তোফাজ্জল আলী, আব্দুল মালেক (৭১ এর তাবেদার গভর্নর) মন্ত্রিত্ব ও রাষ্ট্রদূতের চাকরির লোভে নাজিমউদ্দীনের ক্যাম্পে গিয়ে যোগ দিয়েছেন। অনেক বড় বড় বুদ্ধিজীবীর তখন পদস্খলন ঘটেছে। যেমন এখনও ঘটছে। বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের তখনকার একেবারে তরুণ প্রজন্ম, যারা দেশ ভাগের প্রাক্কালে আবুল হাশিমের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ও ছাত্রলীগের সাম্প্রদায়িকতা-বিমুখ প্রগতিশীল অংশ গড়ে তুলেছিল এবং অসাম্প্রদায়িক যুক্ত অথবা বৃহত্তর স্বাধীন বাংলা গঠনের দাবি তুলেছিল, মূলত:তাদের উদ্যোগেই পাকিস্তানে বাঙালির স্বার্থ ও স্বাধিকার অর্জনের চেতনা জেগে ওঠে, আন্দোলন গড়ে ওঠে, ১৯৪৯ সালে বাঙালি মুসলমান তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ ও অধিকার আদায়ের মূল লক্ষ্যে আওয়ামী-মুসলিম লীগ গঠিত হয়। মওলানা ভাসানী এই দলের প্রাদেশিক নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজনীতিতে আবার পুনর্বাসিত হন। তার এই রাজনৈতিক পুনর্বাসনে সাহায্য জোগান মুসলিম লীগের প্রগতিশীল একেবারে তরুণ অংশটি। যাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ভাসানী-মুজিব নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। তারা বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের তরুণ ও অগ্রসরমান অংশকে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় জাতীয়তার অবাস্তব ধারণা ও মোহ থেকে মুক্ত করেন এবং তাদের মধ্যে বাঙালির শাশ্বত জাতিসত্তা ও জাতি পরিচয়ের সেক্যুলার ধারণাটির প্রতিষ্ঠা ঘটান। পরে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এই জাতিসত্তার জন্য একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র (nationstate) প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সফল হয়। মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবকেও হক সাহেব ও সোহরাওয়ার্দীর মতো ভারতের চর, হিন্দুর দালাল ইত্যাদি অপবাদ সইতে হয়েছে এবং বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের তদানীন্তন প্রতিষ্ঠিত ও সুবিধাভোগী অংশ তথা এলিট ক্লাসের একটি বড় অংশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বিরোধিতা করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্কটি এই এলিট শ্রেণীর অংশই সৃষ্টি করেছে এবং জিইয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস- ঐতিহ্যের সংগ্রামী ধারার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের আবির্ভাব। দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক শূন্যাবস্থার সময় তার রাজনীতিতে আগমন একেবারেই একজন সাধারণ নেত্রী হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক মূলধন তার ছিল না। কিন্তু ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ নদীতে অনভিজ্ঞ হাতে নৌকার হাল ধরেও যে ভূমিকাটি তিনি পালন করেছেন ও করছেন তা অসাধারণ। এক্ষেত্রে হক সাহেব ও শেখ সাহেবের ভূমিকাকেও তিনি অনেক ক্ষেত্রে অতিক্রম করেছেন। সমসাময়িক ইতিহাস বা ইতিহাসবিদেরা হয়তো এই সত্যটি লক্ষ্য করছেন না বা লক্ষ্য করতে চাইছেন না। কিন্তু ভবিষ্যতের ইতিহাস এই স্বীকৃতি এই সত্যকে দেবে। হক সাহেব ও শেখ সাহেবের মতো শেখ হাসিনাকেও ‘ভারতের চর’, ‘ইসলামের শত্রু’ ইত্যাদি অপবাদ সইতে হচ্ছে। পার্থক্য এই যে, আগের দুই নেতা শুধু গালি শুনেছেন, কিন্তু তাদের প্রাণনাশের জন্য অনবরত চেষ্টা হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে মধ্যরাতের চক্রান্তে হত্যা করা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড ছুঁড়ে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে। তার প্রাণনাশের চেষ্টা হয়েছে একবার নয়, ছোট বড় মিলিয়ে নয়বার। এখনো তার জীবনের উপর হুমকি অব্যাহত রয়েছে। হক সাহেব রাজনীতি করা কালে চরিত্র হননের সম্মুখীন হয়েছেন, তার জীবন নাশের চেষ্টা করা হয়নি। বঙ্গবন্ধুও রাজনীতি করার সময় বারম্বার হত্যা প্রচেষ্টার সম্মুখীন হননি। সেনাবাহিনীর একাংশের সাহায্যে তাকে হত্যা করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বিরোধী দলেই থাকুন আর প্রধানমন্ত্রী পদেই থাকুন, তার জীবন নাশের চেষ্টা চলেছে বারবার। এখনো সেই চেষ্টা বন্ধ হয়নি। একজন সাধারণ স্তরের নেত্রী এই ধরনের ভয়াবহ হত্যা প্রচেষ্টার মুখে রাজনীতিতে টিকে থাকতেন কিনা সন্দেহ। শেখ হাসিনা টিকে আছেন। এখানেই তার নেতৃত্বের অসাধারণত্ব। এখানেই তিনি তার পূর্ববর্তী নেতাদের সাহস ও কৃতিত্বকে অতিক্রম করে গেছেন। স্বাধীনতার যুদ্ধে নেতৃত্বদানের সময় বঙ্গবন্ধু মিত্রহীন ছিলেন না। আমেরিকার মতো সুপার পাওয়ার, চীন, সউদি আরবের মতো দেশগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিলো সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের মতো সুপার পাওয়ার এবং ভারতের মতো বিরাট নিকট প্রতিবেশী। পূর্ব ইউরোপের তত্কালীন সমাজতন্ত্রী দেশগুলোও ছিলো। বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেমন সংকট ও সমস্যা সঙ্কুল, তেমনি শেখ হাসিনার পাশেও বঙ্গবন্ধুর মতো কোনো সুপার পাওয়ার ও বৃহত্ প্রতিবেশীর সুনিশ্চিত সমর্থন নেই। মিত্র সমাজতন্ত্রী পূর্ব ইউরোপও নেই। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরেই যে স্বাধীনতা-বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো এবং এলিট ক্লাসের একটি বড় অংশ (এখন সুশীল সমাজ নামে পরিচিত) বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হয়েছিল, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমনে ব্যর্থতা, গণতন্ত্র বিরোধী কার্যকলাপ ইত্যাদি নানা অভিযোগ তুলে বঙ্গবন্ধুর বিরাট রাজনৈতিক সাফল্যগুলো জনমানস থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল, সেই একই সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো (এখন সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উগ্র ও সন্ত্রাসী মৌলবাদী দল) এবং তাদের সঙ্গে এলিট ক্লাস বা সুশীল সমাজের এখনকার সুবিধাভোগী অংশটিই সময় বুঝে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছে এবং নিজেদের নিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক বলে দাবি করলেও তাদের বক্তব্য ও কার্যকলাপ দেশের গণতন্ত্র-বিরোধী ও মৌলবাদী জোটকেই সাহায্য জুগিয়ে চলেছে। বঙ্গবন্ধুর সরকার মাত্র তিন বছরের মধ্যে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলেছিলেন। বাংলাদেশকে জাতিসংঘ ও কমনওয়েলথের সদস্য করেছেন। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে কিউবার ক্যাস্ট্রো, যুগোস্লাভিয়ার টিটো ও ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে মিলে বঙ্গবন্ধু ওই আন্দোলনে শীর্ষ স্থানীয় নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। তার এই বিরাট সাফল্যগুলোকে ধামাচাপা দিয়ে দেশের এবং বিদেশের অশুভ চক্রগুলো সন্ত্রাস ও দুর্নীতি রাতারাতি দমন করতে না পারা, রক্ষী বাহিনী গঠন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ ইত্যাদি নানা সত্য-মিথ্যা প্রচার চালিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা চালায়। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, সেই একই অশুভ স্বাধীনতা-বিরোধী চক্র, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী দল এবং তথাকথিত একটি সুশীল সমাজ বর্তমানেও হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সকলেই স্বীকার করেন, দেশে গুড গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠায় হাসিনা সরকার এখনো সম্পূর্ণ সফল হয়নি এবং এই ব্যাপারে ক্ষমতায় থাকার মাত্র এক মেয়াদে সফল হওয়াও যায় না। কিন্তু জাতীয় জীবনের মৌলিক সমস্যা সমাধানে হাসিনা সরকারের সাফল্য অতুলনীয়, যা অতীতে কোনো সরকার পারেননি। এই অসাধারণ সাফল্যগুলোর মধ্যে রয়েছে শতাব্দিকালের খাদ্যাভাবের দেশটিকে খাদ্য উত্পাদনে উদ্বুদ্ধ করা। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে বর্ণিত ১১৭৬ সালের দুর্ভিক্ষ থেকে শুরু করে কয়েক বছর আগেও ছিল বাংলাদেশ চরম খাদ্যাভাবগ্রস্ত দেশ। সে দেশ এখন বিদেশে খাদ্য রফতানি করে। বাংলাদেশ কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছে, শিল্পোন্নতির হার ভারতকে ছাড়িয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে হার মানিয়েছে। মাথাপিছু আয়, জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। বিদ্যুত্ সঙ্কট স্থায়ী সমাধানের পথে। হাসিনা সরকারের সবচাইতে বড় সাফল্য ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করা এবং ইতিমধ্যেই অনেকের দণ্ডাদেশ ঘোষিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব তিনি দেশটি স্বাধীন করেছেন এবং তার কন্যার কৃতিত্ব সেই স্বাধীনতা ও মানবতার শত্রুদের হাজারো বাধা-বিপত্তির মুখে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে একাত্তরের স্বাধীনতার নড়ে যাওয়া ভিত্তিকে শক্ত করা। এই ভিত্তি ধ্বংস হলে বাঙালির সেক্যুলার জাতিসত্তা এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যত্ ধ্বংস হবে। এজন্যেই আজকের আলোচনার শুরুতেই আমি বলেছি, ৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের যে জোটবদ্ধ যুদ্ধযাত্রা এবং তথাকথিত নিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক সুশীল সমাজের একটা বড় অংশের দ্বারা নানা বিতর্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি দ্বারা ওই যুদ্ধযাত্রাকেই প্রচ্ছন্ন সমর্থন দানের যে চেষ্টা, তা প্রকৃতপক্ষে আমাদের জাতিসত্তা ও জাতি পরিচয় নির্ধারণের শতাব্দিকালের সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়। এই যুদ্ধেই নির্ধারিত হবে বাঙালির হাজার বছরের লোকায়ত সংস্কৃতি ও জাতি পরিচয় স্থায়ী হবে, না, বাংলাদেশি জাতীয়তার এক তালেবানি চেহারার জাতি পরিচয় বাঙালির ঘাড়ে চেপে বসবে? এই যুদ্ধে এই মুহূর্তে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক শিবিরে শেখ হাসিনার বিকল্প আর কোনো নেতৃত্ব নেই। এই নেতৃত্বকে যারা নিরপেক্ষতার মুখোশের আড়ালে সাবোটাজ করতে চান তারা গণতন্ত্র অথবা দেশ ও জাতি কারোই মিত্র নন। এই আসন্ন যুদ্ধে হাসিনা যদি জয়ী হন, তাহলে হক সাহেব থেকে শেখ সাহেব পর্যন্ত প্রসারিত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাই শুধু শক্তিশালী হবে না, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তা বিরাট শুভ প্রভাব বিস্তার করবে। ইতিহাসে শেখ হাসিনার আসনটি পাকাপোক্ত হবে। (সমাপ্ত)। লন্ডন ৫ অক্টোবর, শনিবার, ২০১৩