আইন

সংশোধিত শ্রম আইনে শুভঙ্করের ফাঁকি

সাম্প্রতিককালে রানা প্লাজার মর্মান্তিক দুর্ঘটনা দেশে-বিদেশে যে ব্যাপক আলোড়ন তোলে তার প্রেক্ষিতে সরকার শ্রম আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর ২২ জুলাই গেজেট আকারে ‘শ্রম আইন (সংশোধন)- ২০১৩’ প্রকাশ করে সরকার, যাতে দেশীয় কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য অধিকতর শ্রমিক সুবিধা প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পোশাকশিল্পের জন্য এমন কিছু বিশেষ আইনী ধারা [২৩২(৩)] রাখা হয়েছে, যাতে বিদেশি ক্রেতাদের ইচ্ছার প্রতিফলনের সুযোগ রয়েছে। সংশোধনীটির সবচেয়ে যুগান্তকারী পদক্ষেপটিই হচ্ছে ২৩২ ধারাটির সংশোধন, যার মাধ্যমে যেকোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানকে তার নিট মুনাফার ৫ শতাংশ ওই কোম্পানিতে কর্মরত সকল শ্রমিকের মধ্যে বিতরণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর এখানেই ঘটেছে শুভঙ্করের ফাঁকি। একদিকে দেশীয় পোশাক শিল্পের জন্য বিদেশি ক্রেতাদের ইচ্ছের প্রতিফলনের সুযোগ রাখা হয়েছে, অপরদিকে বিদেশিদের সরাসরি বিনিয়োগকৃত কোম্পানির জন্য এক্ষেত্রে আইনী জটিলতা তৈরির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে শুভঙ্করের ফাঁকির সুযোগ রাখা হয়েছে, যা দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বৈষম্যমূলক বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরি করেছে। অথচ বিদেশি বিনিয়োগকৃত এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত বিনিয়োগ করে থাকে তেল-গ্যাস, কয়লা, ব্যাংক, বিদ্যুত্, সার, সিমেন্ট-জাতীয় উচ্চ লাভজনক খাতসমূহে। এসব খাতের বিদেশি কোম্পানিগুলোকে মুনাফা বিতরণের বাধ্যবাধকতা অব্যাহতি দিয়ে ২৩২(৩) ধারায় বিশেষ রেয়াত প্রদান করার মাধ্যমে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্র তার মূল অর্থনৈতিক খাতে হারাচ্ছে কিছু পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ। কেননা, বিদেশি কোম্পানিদের জন্যও নিট মুনাফার ৫ শতাংশ দেশীয় শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ করার সম-আইন প্রণীত হলে এই অর্থ দেশীয় অর্থনীতিতেই যুক্ত হতে পারতো, যা এখন বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যয়িত হবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানসমূহের লভ্যাংশ প্রত্যর্পণের আকারে। বিপরীতে, দেশীয় শিল্পের জন্য এই লভ্যাংশ বিতরণ বাধ্যতামূলক করে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশীয় শিল্পবিকাশে প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এই অসমতাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় একদিকে এতে যেমন দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তা বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার কিছু অংশ, যা রাষ্ট্র নিজের অর্থনীতিতেই রেখে দেয়ার সুযোগ পেতো, সেই সুযোগ হারাবে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ কিংবা নৈতিকতার মানদণ্ড—উভয় বিচারেই রাষ্ট্রের উচিত উচ্চ লাভজনক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এসব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ধরনের শ্রমিক-সুবিধা প্রদানে বাধ্য করার পরেই দেশীয় উদ্যোক্তাদের এ ব্যাপারে বাধ্য করা। বিদেশিরা নিজেদের সরাসরি বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা পরোক্ষভাবে ছিনিয়ে নিচ্ছে, অথচ তাদের মুখেই শোনা যাচ্ছে দেশীয় পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার উপদেশ। সরকারের উচিত শ্রম আইনের এ ধরনের ধারাসমূহের জটিলতা পরিহার করা, কিংবা এই ধারায় বর্ণিত উদ্দেশ্যপূরণকল্পে বিশেষ শিল্পখাতসমূহের জন্য অবিলম্বে শ্রমিকবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করা। লেখক :সাংবাদিক, গবেষক