রা জ নী তি

২৫ অক্টোবরের পর বিএনপি কি আন্দোলনে না নির্বাচনে?

দেশ গভীর সঙ্কটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্বেষপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থার কারণে ২৫ অক্টোবরের পর দেশে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন জনসভায় বক্তৃতা দিয়ে বিরোধী দলের কঠোর সমালোচনা করছেন এবং আগামী নির্বাচনে আবারো নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে সরকারের সমালোচনা করছেন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে আসছেন। শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না এবং একদলীয় নির্বাচনও হতে দেবে না। গত ৫ অক্টোবর সিলেটের জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বেগম জিয়া একদলীয় নির্বাচন রুখতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সংগ্রাম কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সংসদ চলাকালে নির্দলীয় সরকারের বিল এনে তা পাস করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। না হলে ২৫ অক্টোবরের পর কঠোর আন্দোলন হবে। হয় নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, না হয় রাজপথে দেখা হবে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ৫ অক্টোবর রংপুরে বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই দলের অনড় অবস্থান ২৫ অক্টোবরের পর দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে তা কেউ জানে না। এরশাদ আরো বলেছেন, সরকার যত কৌশল করে নির্বাচন করুক না কেন তা দেশবাসীর কাছে শুধু নয়, বিশ্বের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে অথর্ব বলে আখ্যায়িত করে এরশাদ বলেছেন, এই কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এরশাদ এটাও জানিয়েছেন যে, তিনি আর মহাজোটে নেই। অবশ্য এরশাদ অনেক দিন থেকেই মহাজোটে না থাকার কথা বলে আসলেও মহাজোট ছাড়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা তিনি এখন পর্যন্ত দেননি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, কৌশলগত কারণেই এরশাদ মহাজোট ছাড়ার কথা বলছেন। হয়তো বিএনপিকে বাদ দিয়ে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তখন জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে বেরিয়ে এসে আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। যদিও বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে যাবে না বলে এরশাদ একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। তবে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এটা এরশাদের শেষ কথা নয়। বিএনপিকে বাদ দিয়ে দেশে নির্বাচন হলে এরশাদ শেষ পর্যন্ত সে নির্বাচন থেকে দূরে থাকবেন না। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি যেসব উদ্যোগ দেখা গিয়েছিলো বাস্তবে সেগুলো কোনো কাজ দিচ্ছে বলে মনে হয় না। শুরুতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বিএনপি কিছুটা অনমনীয় মনোভাব নিয়ে থাকলেও পরে অবস্থান পরিবর্তন করেছে। তবে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বিএনপির প্রবল আপত্তি রয়েছে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এ নিয়ে একটি সমাধানে উপনীত হওয়ার আশা বিএনপির ছিল। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের চাপে সরকার আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে এবং নির্দলীয় সরকারের দাবিও আদায় করা যাবে বলে বিএনপি এতদিন মনে করলেও এখন সম্ভবত তারা বুঝতে পারছে যে, সরকার একটুুও ছাড় না দেয়ার মনোভাব নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে যে, সরকার সংবিধান অনুসরণ করেই নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে তাদের বাদ দিয়েই নির্বাচনের প্রস্ত্তুতি সরকার নেবে। বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করলে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। কিন্তু সরকার তথা আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী মহল নাকি মনে করছেন যে, নির্বাচনে যদি বিএনপি ছাড়া অন্য কয়েকটি দল এবং ৫০ শতাংশের বেশি ভোটার ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয় তাহলে সেই নির্বাচন কারো কারো কাছে অগ্রহণযোগ্য হলেও অবৈধ বলা যাবে না। সম্ভবত এই হিসাব থেকেই সরকার বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য কোনো ছাড় না দিয়ে অন্যান্য দলকে নির্বাচনমুখী করার জন্য সচেষ্ট হবে এবং নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ-পরিকল্পনা নেবে। বিএনপি নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিলেও বাস্তবে নির্বাচন প্রতিহত করার শক্তি বা ক্ষমতা বিএনপির আছে বলে সরকার মনে করে না। অতীতেও দেখা গেছে সরকার চাইলে কোনোভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে। বর্জন বা প্রতিরোধের ডাক দিয়ে নির্বাচন ঠেকানোর অভিজ্ঞতা আমাদের দেশে নেই। এরশাদ আমলেও প্রধান সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে প্রতিহত করার ডাক দিলেও বাস্তবে নির্বাচন হয়েছিল, যদিও সেই সংসদ মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। ১৯৯৬ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে খালেদা জিয়ার আমলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নিয়ে নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিয়েছিল। সেই নির্বাচনও হয়েছিল। তবে সংসদ হয়েছিল অত্যন্ত স্বল্পায়ু। এবারও সরকার ওইরকম একটি প্রশ্নবিদ্ধ, বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকেই যাবে কিনা সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। এরশাদ ও খালেদা জিয়ার মতো ভুল পথে শেখ হাসিনা হাঁটবেন বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করেন না। ২৫ অক্টোবরের পর দেশে আসলে কি হবে সেটা কারো কাছেই পরিষ্কার নয়। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও আগামী নির্বাচন এবং নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে তেমন কিছু জানেন না। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, এ ব্যাপারে যা কিছু করার প্রধানমন্ত্রী এককভাবেই করছেন। বিরোধী দলের সাথে সমঝোতা হবে কি না, নির্বাচনের সময় সরকার প্রধান শেখ হাসিনাই থাকবেন কি না, জাতীয় সংসদ বহাল থাকবে, না ভেঙ্গে দেয়া হবে- এই বিষয়গুলো এখন পর্যন্ত অমীমাংসিতই রয়েছে। এগুলো নিয়ে সরকার পক্ষ থেকে পরিষ্কার কিছুই বলা হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে যা বলছেন তার মর্মকথা হলো, দেশে নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন হবে। নির্বাচনে বিএনপি এলে ভালো, না এলে নির্বাচন বন্ধ থাকবে না। রাজনীতি সচেতন মহলে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে সেটা হলো, বিএনপি আসলে কি করবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় না হলে বিএনপি কি সত্যি নির্বাচনে যাবে না ? সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করার মতো আন্দোলন গড়ে তোলার শক্তি-সামর্থ্য বিএনপির আছে কি? ২৫ অক্টোবরের পর দেশ অচল করার হুমকি বিএনপির পক্ষ থেকে দেয় হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর খুলনার জনসভায় দেয়া ভাষণে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ের আন্দোলন ও গণতন্ত্র রক্ষায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার, বেসামরিক প্রশাসনসহ সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। বেগম জিয়ার এই আহ্বান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চেয়ে বেগম জিয়া দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন কি না সেই প্রশ্নও উঠেছে। রাজনৈতিক ঝগড়া-বিবাদে সেনাবাহিনীকে টেনে আনা কোনো বিবেচনাতেই সমীচীন নয়। রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষায় নামতে হলে দলীয় সাংগঠনিক শক্তির জোরেই নামতে হয়। প্রশাসনকে দলীয়করণ তথা রাজনীতিকীকরণের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার তারা বেগম জিয়ার এই আহ্বানে স্বস্তিবোধ করতে পারেন না। সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে আন্দোলন সফল করতে চাইলে তার ফল যে ভালো হবে না এটা সংশ্লিষ্ট সবাইকে বুঝতে হবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বিএনপি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর থেকেই বলে আসছে। সরকারকে একাধিকবার সময়সীমাও বেঁধে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলা বিএনপির পক্ষে সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় যে, ২৫ অক্টোবরের পর জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব পুনর্বন্টন করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে দলের ভিতরে বিভেদ-অনৈক্য কমবে না বাড়বে সে প্রশ্নও দেখা দেয়া স্বাভাবিক। কেউ কেউ মনে করেন এতে দলের অভ্যন্তরে জটিলতা বাড়বে। যাদের নতুন করে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে তারা সবার কাছ থেকে সমান সহযোগিতা না পেলে কর্মী-সমর্থকদের সংগঠিত করে আন্দোলনে নামানো সহজ হবে না। এর ফলে আন্দোলনে গতিবেগ সৃষ্টি হওয়ার পরিবর্তে ভাটার টান দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনে হাঁক-ডাক যতটা দিয়ে থাকে জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য ততটা তত্পরতা দেখায় না। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে যেসব দুর্নাম-অপবাদ কুড়িয়েছিল সেগুলোর পুনরাবৃত্তি যে আবার ক্ষমতায় গেলে ঘটবে না তার কোনো নিশ্চয়তা বিএনপির বর্তমান কর্মকাণ্ড থেকে মানুষ খুঁজে পায় না। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যেসব কারণে মানুষ ক্ষুব্ধ তার সবকিছুই বিএনপি সরকারের আমলেও ছিলো। সন্ত্রাস-দুর্নীতিমুক্ত দল ও সরকার বিএনপি উপহার দিতে পারবে এমন আস্থা মানুষের মনে নেই। বিরোধী দল হিসেবেও বিএনপির পারফরমেন্সে মানুষ খুশি নয়। টানা সংসদ বর্জনের ধারা অব্যাহত রেখে বিএনপি তাদের নীতিহীন অবস্থানের চিত্রই মানুষের সামনে তুলে ধরেছে। দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার রীতি না থাকায় দলের মধ্যে সাংগঠনিক শৃংখলা বলে কিছুই নেই। দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক রীতিনীতির লেশমাত্র নেই। বেগম জিয়া কাদের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন সেটা কারো কাছেই স্পষ্ট নয়। পুত্র তারেক রহমান লন্ডনে বসেই যে দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা পালন করেন সেটা বুঝতে অবশ্য কারো কষ্ট হয় না। বিএনপির নেতৃত্বের ভেতরে যে সঙ্কট চলছে সেটা বোঝা যায় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্য থেকেই। গত ২৬ সেপ্টেম্বর এক সভায় গয়েশ্বর চন্দ্র বলেছেন, বিএনপির নেতাদের অনেকেই সরকারের সঙ্গে আছেন। সুযোগ পেলে অতীতের মত তারা আবারো বেঈমানী করবে না তার গ্যারান্টি কোথায়? তিনি বলেন, এক এগারোর সময় খালেদা জিয় কারাগারে যাওয়ার আগে বিএনপির তত্কালীন মহাসচিব যাদের সামনে খালেদা জিয়াকে বিএনপির রাজনীতি থেকে মাইনাস করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তারা এখন কোথায়? তারাই এখন খালেদা জিয়ার বিশ্বস্ত, দক্ষিণহস্ত সেজে বসেছেন। জনগণ সরকারের সঙ্গে নেই, তারপরও এ সরকার আছে এবং দাপটের সঙ্গেই আছে। এর কারণ কিছু নেতা একদিকে বিএনপির সঙ্গে রাজপথে আন্দোলন করছেন, অন্যদিকে সরকারের সঙ্গেও অদৃশ্যভাবে আছেন। এ কারণেই এখনো সরকারের পতন হচ্ছে না। এদের কারণেই সরকার এত আস্ফাালনের সুযোগ পাচ্ছে। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মনে করেন- বিএনপি নেতারা আন্দোলন রেখে মনোনয়ন পাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছেন। নির্বাচন হবে কি হবে না, দেশ ঠিক পথে যাবে কি না তার ঠিক নেই। অথচ অনেকেই আন্দোলন বাদ দিয়ে মনোনয়ন নিয়ে ব্যস্ত। ২৫ অক্টোবরের পর পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে সেটা কি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্য থেকে কিছুটা অনুমান করা যায় না? লেখক:সাংবাদিক bibhu54@yahoo.com