গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও দুর্বলতা :আমেরিকা ও বাংলাদেশ

আমাদের দেশের গণতন্ত্র শুধুই নির্বাচন সর্বস্ব—এমন অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। বিশ্বের যত প্রকার শাসন ব্যবস্থা রহিয়াছে, তাহার ভিতরে গণতন্ত্রই এখন অব্দি সর্বাপেক্ষা গণমানুষের স্বার্থপন্থী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং তাহার চর্চা আমরা সানন্দেই বাছিয়া লইয়াছি আমজনতার সার্বিক উন্নয়ন-উন্নতির অভিপ্রায়ে। কিন্তু গণতন্ত্র শুধুমাত্র নির্বাচন সর্বস্ব হইয়া উঠিলে বিপদ বটে। নিশ্চয়ই ‘নির্বাচন’ কার্যক্রম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাত্ত্বিকভাবে বলা যায়, জনগণের প্রতি ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলির দায়বদ্ধতার পরীক্ষা দিতে হয় সুষ্ঠু ‘নির্বাচন’ ব্যবস্থার ভিতর দিয়াই। সুতরাং গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখিতে তাহা অপরিহার্য বটে। কিন্তু গণতন্ত্র টিকিয়া থাকে যেই তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর— নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগ—তাহাদের ভিতরে বিদ্যমান ভারসাম্য বিঘ্নিত হইলেই ঘটে মূল বিপদ। বলা যায়, তিন স্তম্ভের ভিতরকার সুষ্ঠু সুন্দর ভারসাম্যই হইল গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্যের মুখেই এইবার আমরা কালিমালিপ্ত হইতে দেখিলাম আমেরিকায়। সমপ্রতি মার্কিন কংগ্রেস বাজেটের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছিতে ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারে আংশিক অচলাবস্থা দেখা দিয়াছে। এই অবস্থায় মার্কিন সরকার যে বাজেট শূন্যতার মুখে পড়িয়াছে তাহা উত্তরণে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের নেতারা বৈঠকে বসিয়াছিলেন বটে। কিন্তু কোনো পক্ষই নিজেদের অবস্থান হইতে সরিয়া আসিতে রাজি হন নাই। কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা বলিয়াছেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা যদি চিকিত্সা বীমার বিলটি এক বত্সরের জন্য স্থগিত করেন তাহা হইলেই শুধু তাহারা সরকারের বাজেট প্রস্তাব পাস করিতে সম্মত হইবেন। কী অদ্ভুত! তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিকদের মতো তাহারাও একপর্যায়ে একে-অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়াছেন উভয়পক্ষের অসহিষ্ণুতার দিকে। রিপাবলিকানরা বলিতেছেন, ডেমোক্রেটরা আলোচনা চাহে না। অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি কংগ্রেসের ডেমোক্রেট সদস্যরা জানাইয়াছেন—চিকিত্সা বীমার ব্যাপারে তাহারা আপস করিবেন না। এ অবস্থায় ঋণ সিলিং বৃদ্ধি না করিলে আগামী ১৭ অক্টোবর হইতে সরকারের নগদ অর্থ নি:শেষ হইয়া যাইবে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এমন হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করিয়াছেন যে, চলমান অচলাবস্থা অব্যাহত থাকিলে দেশ দেউলিয়া হইয়া যাইতে পারে। তাহার পরও সঙ্কট মিটে নাই। যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য লইয়া প্রশংসার অনেক হেতু রহিয়াছে। ইহার বিপরীতে প্রশ্ন জাগে, গণতন্ত্রের ভিতরে কীভাবে সৃষ্টি হইতে পারে এইরূপ গহীন খাদ—যাহা পুরো ব্যবস্থাকেই অচলায়তনে পরিণত করে? যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভে রহিয়াছে কংগ্রেস, সিনেট ও প্রেসিডেন্ট। মূলত তাহাদের ভিতরে ভারসাম্যের বিচ্যুতি ঘটিলেই দেখা দিতে পারে যেকোনো বিপর্যয়। এবং তাহাই এইবার ঘটিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রে। এই অচলাবস্থার কারণে প্রায় আট লাখের অধিক কর্মচারীকে বিনা বেতনে ছুটি দিতে হইয়াছে। গণতন্ত্রের মহান চিন্তকেরা গণতন্ত্র বলিতে বুঝাইয়াছিলেন জনগণের রাষ্ট্র, জনগণের সরকার, জনগণের শাসন ব্যবস্থা, জনগণের অর্থনীতি, জনগণের সংস্কৃতি। কেবল সমাজের উপরের স্তরের শতকরা পাঁচভাগ ধনী লোকের জন্য গণতন্ত্রের ধারণাকে সীমাবদ্ধ রাখেন নাই, তাহারা শতকরা একশভাগ লোকের জন্যই গণতন্ত্রের কথা ভাবিয়াছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়াছে, অনেক দেশেই গণতন্ত্র সীমাবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে সমাজের উপরের স্তরের কিছু মানুষের স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসাবে। যাহারা গণতন্ত্রের প্রবক্তা সংস্কারক তাহারা নিশ্চয়ই ইহার ভিতরে বিদ্যমান স্তম্ভের ভারসাম্য ঠিক রাখিবার জন্যই গণতন্ত্রের ধ্বজা ঊর্ধ্বে তুলিয়াছিলেন। কিন্তু সেই ভারসাম্য বিচ্যুতির যে দৃষ্টান্ত আমরা সমপ্রতি দেখিতে পাইতেছি তাহাকে কি বলা যায় গণতন্ত্রের অন্তস্থ গভীর দুর্বলতা? নাকি ইহা এমন এক সঙ্কট যাহা পুষ্পের ভিতরে লুক্কায়িত বিষ অনুসন্ধান করিবার দূরভিসন্ধি? প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপের পাশাপাশি একটি অপ্রাতিষ্ঠাতিক রূপও রহিয়াছে। তাহা মানসিক। গণতন্ত্রকে মনের গভীরে পরিগ্রহ করিতে হয়, তাহাকে মননে লালন করিতে হয়, তাহার সৌন্দর্যের অনুরাগী হইতে হয়; নয়তো তাহার ভারসাম্য নষ্ট করিবার চেষ্টা বিরলদৃষ্ট হইবে না। কী যুক্তরাষ্ট্র, কী বাংলাদেশ বা তৃতীয় বিশ্বের অন্য কোনো দেশ—সকল দেশের জন্যই ইহা বড় সত্য।