ভুল চিকিত্সার পোস্টমর্টেম

গত শুক্রবার টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের নবজাতক বিশেষ সেবা ইউনিটে সকাল পৌনে দশটা হইতে পৌনে বারোটা পর্যন্ত মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে চিকিত্সাধীন চার নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। মৃত শিশুদের বয়স হইয়াছিল এক হইতে নয়দিন। জন্মের সময় হইতে তাহারা জ্বর, ঠান্ডা ও জন্ডিসে ভুগিতেছিল। জন্মগতভাবে তাহাদের ওজনও ছিল কম। আবার তাহারা শ্বাসকষ্ট, ইনফেকশনসহ বিভিন্ন রোগেও আক্রান্ত ছিল বলিয়া জানা যায়। শিশুদের আত্মীয়-স্বজনদের অভিযোগ হইল, তাহাদের সোনামণিরা ভুল চিকিত্সায় ও অবহেলায় মারা গিয়াছে। এইজন্য তাহারা বিক্ষুব্ধ হইয়া ওঠে। আবার মেয়াদোত্তীর্ণ ইনজেকশন পুশ করায় তাহাদের মৃত্যু হইয়াছে এমন অভিযোগও উঠিয়াছে। পক্ষান্তরে সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকরা বলিতেছেন যে, শিশুদের মৃত্যু স্বাভাবিক এবং চিকিত্সায় কোন ত্রুটি ছিল না। উল্লেখ্য, এই হাসপাতালটির নবজাতক বিশেষ সেবা ইউনিটে ঐ দিন মোট ৪৬ জন রোগী চিকিত্সাধীন ছিল। তন্মধ্যে চারজন রোগীর মৃত্যু দুঃখজনক হইলেও, অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যেহেতু মাত্র দুই ঘন্টার ব্যবধানে ঐ শিশুদের মৃত্যু হইয়াছে, তাই স্বভাবতই তাহা মিডিয়ায় খবর হইয়াছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর নির্দেশে এই ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছে। কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হইলে বিষয়টি সম্পর্কে বিশদ জানা যাইবে বলিয়া আশা করা যায়। তবে ইদানিং রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ভুল চিকিত্সায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগের হার বাড়িতেছে। এইজন্য প্রায়শ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ভাঙচুর, ডাক্তার-নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলাসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিতেছে যাহা রীতিমত উদ্বেগজনক। ইহাতে আমাদের চিকিত্সা ব্যবস্থা হুমকির মধ্যে পড়িতেছে। তাই ভুল চিকিত্সা কি ও কেন সেই ব্যাপারে আমাদের সম্যক আলোচনা করা দরকার। কেননা সচেতনতাও অনেক সময় এই ধরনের পরিস্থিতি হইতে আমাদের পরিত্রাণ দিতে পারে। সাধারণত কোন চিকিত্সকই চাহেন না বিনাকারণে ও বিনাচিকিত্সায় কোন রোগীর মুত্যু হউক। কেননা রোগীকে সুস্থ করিয়া তোলাই তাহাদের কাজ ও জীবন সাধনা। তাহার পরও ভুল চিকিত্সার অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে এন্তার। প্রথমত অসতর্কতা বা অসাবধানতাবশত চিকিত্সায় কোনরূপ ভুল হইতে পারে। দ্বিতীয়ত ভুল হইতে পারে ডায়াগনসিসে। একেকজন ডাক্তার একেকভাবে রোগ সম্পর্কে প্রাপ্ত রিপোর্ট বা অন্যান্য তথ্য ব্যাখ্যা করিবার কারণে প্রেসক্রিপশন ভিন্ন হইতে পারে। ইহাতে কাহারও সুস্থতার বদলে আরও অসুস্থতারও কারণ হইয়া দাঁড়াইতে পারে। দেখা যায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক বাংলাদেশী ডাক্তার যাহাকে রোগী সাব্যস্ত করিলেন, তিনি কলিকাতায় বা ব্যাঙ্গালোরের কোন ডাক্তারের নিকট দিব্যি সুস্থ আছেন বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছেন। আবার সিঙ্গাপুর বা আমেরিকার ডাক্তারের নিকট ব্যাঙ্গালোরের কোন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনও মনঃপুত না হইতে পারে। অর্থাত্ চিকিত্সার ব্যাখ্যা ডাক্তারদের শাস্ত্রীয় জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার আলোকে বদলাইয়া যাইতে পারে। আর ইহাতে কাহারও অসুবিধা হইলে তাহাকে কি ভুল চিকিত্সা বলা যায়? তৃতীয়ত অনেক সময় ভেজাল ঔষুধের কারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এইজন্য চিকিত্সকদের দায়ী করিবার কোন অবকাশ নাই। আজকাল কোন পণ্যটা মেয়াদোত্তীর্ণ আর কোনটার মেয়াদ আছে তাহা নির্ণয় করাও কঠিন। কেননা পণ্যের গায়ে মেয়াদের কথা লিখা থাকিলেও তাহার মধ্যেও অনিয়ম হইতে পারে। তাই ভুল চিকিত্সায় অনেক সময় চিকিত্সক বা নার্সকে এককভাবে দোষারোপ করিবার সুযোগ থাকে না। তাহাছাড়া অন্যান্য বিজ্ঞানের তুলনায় চিকিত্সা বিজ্ঞানকে বলা হয় লেস ডেভেলপড বা কম উন্নত। কুল্লু নাফসিন জায়িকাতুল মাউত বা জন্মিলেই মরিতে হইবে এই চিরাচরিত বিধানের কারণে চিকিত্সা বিজ্ঞান এক অর্থে কখনই চরম উত্কৃষ্টতার যুগে পৌঁছিতে পারিবে না। অতএব যে ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ই কঠিন, সেখানে ভুল চিকিত্সার প্রশ্ন অবান্তর। তাহার পরও ভুল চিকিত্সা হয় এবং সেই ক্ষেত্রে তদন্ত সাপেক্ষেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অহেতুক গুজব, আতঙ্ক বা উত্তেজনা সৃষ্টি করিয়া হাসপাতাল ভাঙ্চুরের মাধ্যমে নিজের পায়ে নিজের কুড়াল না মারাই সমীচীন।